কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তজুড়ে মানবপাচার ও অপহরণ বাণিজ্য এখন এক ভয়াবহ মরণনেশায় রূপ নিয়েছে। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় থাকায় এই চক্রের মূল হোতা বা রাঘববোয়ালরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও থামানো যাচ্ছে না এই অপরাধ প্রবনতা, যা স্থানীয় জনমনে চরম আতঙ্ক ও নাভিশ্বাস সৃষ্টি করেছে।
গত ২১ এপ্রিল উত্তর শিলখালী এলাকায় তিনজনকে গভীর পাহাড়ে পিটিয়ে ও জবাই করে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে, নিহতরাও অপহরণ ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়দের ধারণা,পাচার বা অপহরণের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
শুধুই এ হত্যাকান্ডের ঘটনা নই,এর আগেও এই পাহাড়ে কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। গভীর পাহাড়ে অপহরণকারীরা হত্যা করে পুঁতে রেখেছিল। যা র্যাব ও স্থানীয়দের সহায়তায় কক্সবাজার থেকে অপহৃত হওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। অপহৃত হয়েছিল বনবিভাগের ন্যাচারপার্কের দুই কর্মী। তবুও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাহারছড়া, টেকনাফ সদর,হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পাহাড়,নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগর এলাকা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তাছাড়াও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও পাহাড়ে নিয়মিত সাঁড়াশি অভিযান না হওয়ায় দিন দিন নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নৈকট্য এই ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ উন্নত জীবনের প্রলোভনে স্বেচ্ছায়,কেউ অপহৃত হয়ে আবার কেউ প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রপথে পাড়ি জমাচ্ছে অনিশ্চিত গন্তব্যে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে উন্নত জীবন ও বিবাহের আশায় রোহিঙ্গারা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছে, তেমনি বাদ পড়ছে না স্থানীয় বাঙালি যুবকেরাও।
সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ট্রলার ডুবির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জানা গেছে,গত ৪ এপ্রিল টেকনাফ উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাকালে ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরের কাছে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের মতে,ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং সাগরের প্রবল ঢেউয়ের কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ওই ট্রলার ডুবুর ঘটনায় গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি ও ৩ জন রোহিঙ্গা ছিলেন, যাদের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী,পেকুয়া এবং উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে। পরে তাদের কোস্টগার্ডের মাধ্যমে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। তবে ট্রলারে থাকা বাকি আড়াই শতাধিক যাত্রী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পাচারকারী চক্রের আরও ভয়াবহ তৎপরতা সামনে এসেছে। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া গ্রামের মো. আবদুল্লাহসহ পাঁচ যুবক গত ১ এপ্রিল পরিবারের কাউকে না জানিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাদের মধ্যে একজন টেকনাফ বাস স্টেশন ও অপরজন পাহাড়ে বন্দিদশা থেকে ভাগ্যক্রমে দালালদের কাছ থেকে ফিরে আসতে পারলেও বাকি তিনজন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় দালালদের হাতে বন্দী। ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়,বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে জনপ্রতি চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে দালাল চক্র। আবদুল্লাহর স্বজনরা টাকা জোগাড় করে তাকে মুক্ত করতে পারলেও বাকি দুইজন এখনো বন্দী অবস্থায় অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তারা ওই ডুবে যাওয়া ট্রলারটির ঠিক আগের ট্রলারে থাকায় প্রাণ রক্ষা পেলেও এখন দালালের হাতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
টেকনাফে সেনাবাহিনী,বিজিবি,র্যাব,পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও এপিবিএনসহ প্রায় সব বাহিনীর সরব উপস্থিতি রয়েছে। দেশের অন্য যেকোনো উপজেলার তুলনায় এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েকগুণ বেশি। অথচ জনমানুষের প্রশ্ন—এত বাহিনীর পাহাড়ায় কীভাবে প্রকাশ্যে ট্রলার বোঝাই করে মানুষ পাচার হচ্ছে? সচেতন মহলের দাবি, পাহাড়ে পাচারকারী ও অপহরণকারীদের শক্তিশালী আস্তানা থাকলেও সেখানে রহস্যজনক কারণে বড় ধরনের কোনো অভিযান হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে কিছু ‘চুনোপুঁটি’ দালাল ধরা পড়লেও মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় কঠোর নজরদারির পাশাপাশি পাহাড়ে বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার দাবি উঠেছে। সাধারণ মানুষের মতে,এই মরণখেলায় লিপ্ত রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে সমুদ্রপথে লাশের মিছিল আর পাহাড়ে অপহরণের আর্তনাদ থামানো সম্ভব হবে না।
