parbattanews

ডা. আসমা সুলতানার সুইসাইডাল নোট

image_195_10499

ডেস্ক রিপোর্ট:

কক্সবাজারের আবাসিক কটেজ থেকে উদ্ধারকৃত চিকিৎসক ডা. আসমা সুলতানার মৃতদেহ তার অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রোববার বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশের কাছ থেকে ওই নারীর চাচা চাঁদপুর জেলার মতলব থানার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর মিয়া মৃতদেহটি গ্রহণ করেন। মৃতদেহ গ্রহণকালে তিনি জানান, রেজিস্ট্রারে পরিচয় ঠিক আছে। আসমা সুলতানা (৩০) তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর মিয়ার কন্যা। আসমার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার মাহাদি মাসুদ। তার ভাইঝি আসমা ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, আসমা আত্মহত্যা করতে পারে না। তিনি জানান, ৬ই ফেব্রুয়ারি আসমা বাড়ি থেকে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হয়। এরপর তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে খিলগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এরপর থেকে স্বামী এবং শ্বশুর পক্ষের কেউ যোগাযোগ করছেন না। বিষয়টি সন্দেহজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে মৃত্যু পথযাত্রী হওয়ার আগে আসমা তার হাতের লেখা দীর্ঘ চিঠিতে তার বুকে জমানো ক্ষোভ ও দুঃখের কথা লিখে গেছেন। এমন কি কষ্টের পাহাড় ভর করেছিল তার ওপর? যার জন্য তাকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হলো? কেনই বা আত্মহত্যার জন্য তিনি ওই কটেজটি বেছে নিলেন? সব প্রশ্নের উত্তর আছে ওই চিঠি।
আসমা ওই চিঠি লিখেছেন

“মাসুদ, সব কিছু তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাও তুমি? কাজী অফিসে গিয়ে ডিভোর্স দিয়ে আসিনি বলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাবে? ভয়, আমার নাম যতদিন তোমার নামের সঙ্গে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত দায়ভার নিতে হবে! তাই না? তোমাদের বাসা থেকে চলে আসার পর আমিতো একদম চুপই ছিলাম। তোমাকে বিরক্ত করিনি। কাউকে বিরক্ত করিনি। তোমার বাসায় কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তোমার আর তোমার মায়ের মনে কি চলছে জানতে চাইনি। তারপরও কেন এত তাড়াতাড়ি  ডিভোর্স দেয়ার জন্য তুমি পাগল হয়ে গেলে? আরেকবার প্রমাণ দিলে তুমি যা বল, কর ঠিক তার উল্টো। যে প্রমিজ রাখতে পারবে না, তাহলে কর কেন? নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে। সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপরও কিছু আর করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কারণ, তোমার জন্য, আমাদের জন্য যা কিছু করার চেষ্টা করেছি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সব শেষতো শেষ! আমিও সব শেষ করে দিচ্ছি। একেবারে চুপ হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে যাচ্ছ, আমার পক্ষ থেকে আমি হ্যাঁ বলে দিলাম। এখন তুমি যা ইচ্ছে  কর! আরেকটা বিয়ে কর! নো প্রবলেম। আমি বেঁচে থেকে তোমার ডিভোর্স লেটার গ্রহণ করার আর তোমার দ্বিতীয় বিয়ে দেখার সাহস ও মানসিক শক্তি কোনটাই আমার নেই। আব্বু- আম্মুকে আমি কিছুই বলতে পারিনি। বলবো বলবো বলে কিছু বলা হয়ে উঠেনি। বলতে ইচ্ছাও হয় না। তারা শুধু জানে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছ তুমি। তারা আমার কাছে জানতে চায়, আমি কি চাই? ডিভোর্স না সংসার? আমি ভাবি! আমি আসলে এখন আর কিছুই চাই না। আমার চাইতে ইচ্ছা হয় না। চাওয়া পাওয়ার এখন আর কোন অবকাশ নেই। আমার চাওয়া-পাওয়াগুলো যদি পূরণ হতো, তাহলে আজকে আমার এ অবস্থা হতো না। আজকে যা কিছু হচ্ছে এবং যা হয়েছে সব কিছুর পেছনে আমার এক্সপেকটেশন এবং না পাওয়াটাই হয়তো দায়ী। সো সব কিছুর জন্য আমিই দায়ী। তুমিও হয়তো পারছো না মাসুদ। সো তোমার ডিসিশন ডিভোর্স। টু স্টার্ট এ নিউ লাইফ। আই এপ্রিসিয়েট ইউর ডিসিশন। গো এহেইড। কিন্তু আমি আর পারছি না। সো মাই ডিসিশন ইস টু এন্ড মাই লাইফ। যা হয়েছে দ্যাট ইজ এনাফ ফর মি। নতুন করে আমার পক্ষে কিছু করা বা নতুন কোন চরম বাস্তবতার সম্মুখীন আমি হতে পারবো না। আমাকে তোমরা মাফ করো। তোমার উপর আমার প্রচ  বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাস একটা একটা করে ভেঙেছ। আর এজন্য এত অভিমান আর রাগ হয়েছে আমার। কেন যে আমার বিশ্বাস বারবার ভাঙার পরও তোমার উপর বিশ্বাস করি।  লাস্ট টাইম কখনও ডিভোর্স দিবে না এই কথাটা যখন বলেছিলে তখনও বিশ্বাস করেছিলাম। আর বিশ্বাস করেই ভুলটা করেছিলাম। তার ফল তার পর মুহূর্ত থেকেই সাফার করছি। ফল, তুমিই এখন ডিভোর্স দেয়ার জন্য উদগ্রীব। এই উদগ্রীবতা সেইদিন কেন দেখালে না? তাহলেতো বিয়েটাই হতো না। সেটা আরও ভাল ছিল মাসুদ!! তাতেতো তোমাদের আমার বাপের উপর প্রতিশোধ নেয়াটা কমপ্লিট হতো? বিয়ে করে বিভিন্ন প্রমিজ করে সেটা ভাঙা, তোমার মায়ের মেনটাল টর্চার সহ্য করা, তোমার জন্য তোমার মামির খোঁচা মারা কথা, তোমার মামাতো বোনের আমার এবসেন্সে আমাদের বেডরুমে ঘুমানো, তোমার আমার প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়া- এত কিছুর প্রয়োজন ছিল না! তাই না মাসুদ? এভাবে কেন আমার লাইফটা শেষ করে আমার বাপের উপর প্রতিশোধটা আমার উপর নিলে? ভাল খেলা দেখালে তুমি আর তোমার মা! এত কিছুর পরও আমি তোমাকে ভালবাসি কেন জানি না? তবে তোমার মতো ছেলের মনে ঢোকার আর কোন ইচ্ছা আমার নেই। তুমি আমার ভালবাসার যোগ্য না। তোমার ফ্যামিলি আমার সম্মানের যোগ্য না। যথেষ্ট সম্মান করেছি। বাট রিটার্ন আমি কিছুই পাইনি। আমি এখন আর কিছুই চাই না। না তোমার থেকে, না তোমার ফ্যামিলির থেকে। তোমরা খুবই ফেক। তোমরা ভিতরে এক, বাইরে আরেক। তবে তোমাদের উপর, বিশেষ করে তোমার উপর আমার আর কোন ক্ষোভ নেই। আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। যেমন তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অটল। তুমি তোমার প্রমিজ ভেঙেছ, সো আমি আমারটা ভাঙলাম। আমি বলেছিলাম, আমি এমন কোন ডিসিশন নেব না, যাতে তোমরা হেরাজ হও। বাট আই এম সরি মাসুদ। আমার এ ডিসিশনে সব দিক থেকে হার আমার।

পাঁচ পৃষ্ঠার চিরকুটে তিনি বলেন, আমি জানি কেউ আমার উপর হাসবে, কেউ বিরক্ত হবে, কেউ ঘৃণা করবে, কেউ কাঁদবে। আমার ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডরা কাঁদবে। আর তোমরা ঘৃণা করবে। ভীত হবে। থানায় জিডি করার জন্য দৌড়াবে। ভয়! জেলে যাওয়ার ভয়! বাট আমি চাই না তোমরা জেলে যাও! আমি চাই না আমার মৃত্যু নিয়ে কোন হল্লা হোক, মিডিয়া এটা পাবলিসিটি করুক। আর তোমাদের আরও অসম্মান হোক! তোমরা তোমাদের সম্মান নিয়ে থাক। আমাকে জীবিত মেরে ফেলেছো। সো আমার বডির মিসটেইন্স এর কি দরকার মাসুদ। আমি আমার এ পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। সব কিছুর জন্য আমিই দায়ী। কেন আমি তোমাকে ১০টা বছর পাগলের মতো ভালবেসেছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম তোমার প্রতিটি কথা। প্রতিটা ফিলিংস যেটা তুমি আমাকে (আমার জন্য) দেখাতে। কেন তোমাকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম! নিজের উপর আমার প্রচ  ঘৃণা, প্রচ  রকমের ঘৃণা। (এরপর ইংরেজিতে অস্পষ্ট ২টি লাইন)। আমার নিজের লাইফ এর ডিসিশন নেয়ার রাইট আমার আছে। সো তোমাকে কোন লাইভিলিটি নিতে হবে না। কি আশ্চর্য, আজকে আমি যে রুমে আসছি, ঠিক সে রুমটাই পেলাম, যেটাতে আমরা হানিমুন করেছিলাম। সবই ঠিক আছে, রুমের এ্যারেজমেন্টটা একটু চেন্‌জ হয়েছে, তখন এসেছিলাম তোমার সাথে। টু স্টার্ট মাই নিউ জার্নি উইথ ইউ। আর এখন তোমাকে ছাড়া… বিরক্ত আর অশান্তি শব্দগুলি ক্রমাগত কানে বাজে। আমি বিরক্তিকর, আমি অশান্তি বিয়ের আগে তোমাদের মাথায় এটা ছিল না। বিয়ে করে আমার লাইফটা কেন শেষ করলা?”

এদিকে পুলিশ কর্মকর্তা কক্সবাজার সদর থানার এসআই কামাল আব্বাস জানিয়েছেন, ময়না তদন্ত শেষে মৃতদেহটি অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এদিকে চিকিৎসক আসমা সুলতানা মা-বাবা ও ভাইকে নিয়ে থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসায়। বউবাজার সি ব্লকের সাততলা ভবনের পঞ্চম তলায় ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন আসমার বাবা। গত দুই বছর ধরে তারা সেখানে থাকছেন। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে আসমার বড় বোনের স্বামী ফরহাদ খান জানান, ২০১০ সালের ১০ই ডিসেম্বর আসমা ও মাসুদ বিয়ে করেন নিজেদের পছন্দের ভিত্তিতে। এ বিয়ে পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারেননি। এ কারণে আসমা মানসিকভাবে চাপের মধ্যে ছিলেন। তিনি জানান, আসমার বাবা তেজগাঁ  টিঅ্যান্ডটি অফিসে চাকরি করতেন। এ সূত্রে তারা ঢাকায় থাকেন। প্রসঙ্গত, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কক্সবাজার শহরের কলাতলির এলাকার বীচ সিটি রিসোর্ট নামের একটি আবাসিক হোটেলের ১১০ নম্বর কক্ষের দরজা ভেঙে মৃতদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় একটি চিরকুটে নিজে আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করছেন এ নারী পর্যটক। হোটেলের কর্তৃপক্ষ বলছে রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও এলাকার মোহাম্মদ আলমগীরের কন্যা আসমা উল সুলতানা (৩০) পরিচয়ে তিনি শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় কক্ষটি ভাড়া নেন। শনিবার বিকাল পর্যন্ত কক্ষটি বন্ধ দেখে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ দরজা ভেঙে মৃতদেহটি উদ্ধার করে।

Exit mobile version