তেহরান শান্ত ও স্থিতিশীল : দাঙ্গার নেপথ্যে বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ


দেশের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী তৎপরতার খবর এলেও ইরানের রাজধানী তেহরানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। নগরজীবন স্বাভাবিকভাবেই চলছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত কিছু এজেন্ট সারা দেশে অস্থিরতা তৈরি করে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েও ব্যর্থ হয়েছে।
১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতা এবং যুদ্ধের শুরুতে ঘোষিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্থাৎ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যর্থতার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, তিনি ইরানের উপর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবেন। এই চাপের ফলে ইরানে মুদ্রার দাম বৃদ্ধি পায়, যার ফলে বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভে নামেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মঞ্চে এসে ইরানি জনগণকে ১২ দিনের যুদ্ধের মতো রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। এই মন্তব্যগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, ভেতর থেকে “ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন” পশ্চিমাদের এজেন্ডায় রয়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, দেশে সাম্প্রতিক দাঙ্গা ও সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরায়েলের সরাসরি ভূমিকা এখন স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, বিদেশি হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি করতে এবং দেশের ভেতরে গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে এই দুই পক্ষ পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতারা ইরানের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গাকারীরা সরকারি ও জনগণের সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চালানোর পর এসব মন্তব্য করেন লারিজানি। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে বলেছে, গত জুনে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানি জাতির প্রতি তাদের শত্রুতা পরিত্যাগ করেনি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় এবং তার পরেও ইসরায়েল নানা ধরনের হাইব্রিড যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কৌশল বদলালেও তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বদলায়নি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা জবাববিহীন থাকবে না। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, মার্কিন সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী ইরানে সহিংস দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অভিযোগকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ের সাবেক সিআইএ পরিচালক প্রকাশ্যে মোসাদ ও যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা ফাঁস করে দিয়েছেন।
আরাকচি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বিভ্রম হলো এই ধারণা যে, আগুন শেষ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগকারীকেই পোড়াবে না। বৃহস্পতিবার রাতে তেহরানে বাসসহ ৪২টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের ন্যায্য অর্থনৈতিক দাবির ভিত্তিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সামরিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে ১২ দিনের যুদ্ধে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়ার পর গত ছয় মাসে ইরানকে অস্থিতিশীল করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোপনে দেশে ঢুকিয়ে সুযোগমতো ব্যবহার করা।
অর্থনৈতিক বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এসব অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসী সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে জনগণের ওপর হামলা চালায়। একই সময়ে বিভিন্ন শহরে সহিংস তৎপরতা শুরু হয় ইরানের অপসারিত শাহের পুত্র রেজা পাহলভীর আহ্বানের পর, যা ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে অনুপ্রবেশকারী গোষ্ঠীগুলোকে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞে নামার ইঙ্গিত ছিল।
কর্মকর্তারা জানান, বাজারে পণ্যমূল্য ও সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা থেকে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মাধ্যমে সাম্প্রতিক ঘটনার সূচনা হলেও, ইসরায়েলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সেটিকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করতে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমেছে।
















