বান্দরবানের থানচি দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়ন। আলীকদম পর এবার দূর্গম রেমাক্রী এলাকায় কয়েক পাহাড়ি গ্রামাঞ্চলে হাম ও ডায়রিয়া দুটি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। যার কারনে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। একই সাথে হামের থাবায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে কুরুকপাতা ইউনিয়নের।
দূর্গম এই ইউনিয়নের আদা ম্রো, অংহলা খুমী, লাইথাং মেম্বার, রেমাক্রী বাজার, জাদি, কলাপাড়াসহ আরো কয়েকটি গ্রামে ডায়রিয়া প্রকোপ পড়েছে। মায়ানমার সীমান্তবর্তী লইক্রীতে হামের আক্রান্ত হচ্ছে। রোগের আক্রান্ত বাড়াতে স্থানীয় ফার্মেসিতে স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে। দিনদিন রোগী বাড়াতে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এলাকাবাসীদের।
থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সূত্রে জানা যায়, রেমাক্রী ও তিন্দু ইউনিয়নের সাতটি গ্রামে প্রায় ৫২ জন ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। গত এক সপ্তাহে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম লিটক্রে এলাকায় ৮৪ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি এলাকায় ডায়রিয়া পাশাপাশি হাম প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। তবে চিকিৎসা দিতে সেসব দূর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা রওনা দিয়েছে।
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মংসাচিং মারমা বলেন, রেমাক্রী বাজারের তিনটি ফার্মেসিতেই কলেরা স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, গত এক সপ্তাহে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী দুর্গম লিটক্রে এলাকায় ৮৪ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে জরুরি মেডিকেল টিম পাঠানো হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। একই সাথে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইনসহ মেডিকেল টিম পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আলীকদম উপজেলার করুকপাতা ইউনিয়নে ভয়াবহ হামের প্রার্দুভাব প্রকট আকার ধারণ করছে। এই র্পযন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭জন। এই হামের প্রার্দুভাব কারণে জুমচাষ করতে পারছে নাহ ম্রো জনগোষ্ঠীরা। যার কারণে এই বছর সেসব এলাকায় খাদ্য সংকটে আশঙ্কা করছেন সেসব জনগোষ্ঠীরা।
আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যমতে, এই পর্যন্ত হামের উপর্সগ নিয়ে বিভিন্নভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭৫ জন। তাদের মধ্যে ২৬৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৬৯ জন হামের রোগী ও অন্যান্য রোগী ভর্তি রয়েছে। তবে হামের উপর্সগ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছেন।
আলীকদম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর আলীকদম উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৫৫ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে জুমচাষ হয়ে থাকে। সদর ইউনিয়নে ১৬০ হেক্টর, চৈক্ষ্যং ইউনিয়নে ২৪০ হেক্টর এবং নয়াপাড়া ইউনিয়নে ২৫৫ হেক্টর জমিতে জুমচাষ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জুমচাষ হয়ে থাকে করুকপাতা ইউনিয়নে, যেখানে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমি জুমচাষের আওতায় রয়েছে। যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান উৎস।
করুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানিয়েছে, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। হাম রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো ঠিকমতো জুমচাষ করতে পারেনি। ফলে তারা ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটে পড়বে।
বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, সময়মতো জুমচাষ করতে না পারলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জুমচাষ আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, তাই নির্ধারিত সময়ে বপন ও নিয়মিত পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, করুকপাতা ইউনিয়নের প্রায় ৩২২টি পরিবারে হামের উপসর্গে কেউ না কেউ আক্রান্ত হয়েছে। রোগীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে অবস্থান করতে হওয়ায় তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, বিশেষ করে জুমচাষ ব্যাহত হচ্ছে। তবে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়া হবে।
