ধ্বংসস্তুপ থেকে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের ময়দানে

fec-image

ঠিক ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে ইরাক। তবে তাদের এই অর্জনের পেছনের গল্পটা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। দীর্ঘ ২০টি বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলার পর চূড়ান্ত টিকিট নির্ধারণী প্লে-অফের ভেন্যু ঠিক হয়েছিল মেক্সিকোর সিউদাদ দে মন্তেরেইতে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আকাশপথ বন্ধ থাকায় দলটির খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের মেক্সিকো পৌঁছানোর যাত্রাটাই ছিল এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।

ইরাক জাতীয় ফুটবল দলের সহকারী কোচ রেনে মেউলেনস্টিন সেই দুঃসহ অথচ রোমাঞ্চকর সফরের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, ফুটবলারদের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাড়ি বা বাসে করে দীর্ঘ আট ঘণ্টা জার্নি করে প্রথমে বাগদাদে জড়ো হতে হয়েছিল। সেখান থেকে ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা রাস্তা দিয়ে প্রায় ১৫ ঘণ্টা ভ্রমণ করে তারা পৌঁছান জর্ডানের রাজধানী আম্মানে, কারণ সেখান থেকে তখনো দু-একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু ছিল। এশিয়ার অন্যান্য লিগে খেলা বাকি ইরাকি ফুটবলাররাও নিজ দায়িত্বে আম্মানে এসে দলের সাথে যোগ দেন। ফিফার পক্ষ থেকে চার্টার্ড ফ্লাইটের ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে অপেক্ষা করতে হয় আরও নয় ঘণ্টা। এরপর লিসবন হয়ে দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দিয়ে যখন তারা মেক্সিকো পৌঁছান, ততক্ষণে তাদের শরীর ও মনের ওপর দিয়ে ধকল গেছে সাধ্যের অতীত।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তি কোচ স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে দীর্ঘদিন কাজ করা মেউলেনস্টিনের মতে, এটি ছিল খেলোয়াড়দের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। তবে সৌভাগ্যবশত ম্যাচের আগে কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায় দল এবং বলিভিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত টিকিট নিশ্চিত করে। গ্যালারিতে স্থানীয় মেক্সিকানদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রচুর ইরাকি সমর্থক দলটিকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। মেউলেনস্টিন মাঠের নামার আগে খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ১৯৮৬ সালে ইরাক যখন শেষবার বিশ্বকাপে খেলেছিল, সেই ভেন্যুটিও ছিল এই মেক্সিকো। ফলে ইতিহাস যেন নিজেই নিজের বৃত্ত পূরণ করছিল।

এই জয়ের পর বাগদাদের রাস্তায় তখন ভোররাত হলেও আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। মেউলেনস্টিনকে পাঠানো উদযাপনের ভিডিওগুলোতে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটা আনন্দের উপলক্ষ খুঁজছিল, যা তাদের নতুন করে বাঁচার শক্তি ও আশা জোগাবে। এর আগে ২০০৪ অলিম্পিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে হারানো কিংবা ২০০৭ সালে এশিয়ান কাপ জয়; সব বড় ব্যবধানের সাফল্যই ইরাক পেয়েছে দেশের চরম সংকটের সময়ে। দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের ক্ষত এখনো ইরাকের শহরগুলোতে দগদগে। দুবাই বা সৌদি আরবের মতো আধুনিক অবকাঠামো সেখানে নেই, তবে ফুটবলারদের সংস্কৃতি ও প্রাণশক্তি অতুলনীয়। অনুশীলনে যাওয়ার সময় বা বাসের ভেতর তাদের গান আর সুরের মূর্ছনা কোচিং স্টাফদের মুগ্ধ করে।

এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ের মতো শক্তিশালী দলের সাথে একই গ্রুপে পড়েছে ইরাক। কাগজ-কলমে একে ডেথ গ্রুপ মনে হলেও মেউলেনস্টিন ভয় পাচ্ছেন না। গত বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার কোচ গ্রাহাম আর্নল্ডের সহকারী হিসেবে তিনি ডেনমার্ক ও তিউনিসিয়াকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিলেন, এবার ইরাককে নিয়েও সেই একই ‘সারপ্রাইজ এলিমেন্ট’ কাজে লাগাতে চান তিনি। ইরাকি বংশোদ্ভূত ও স্থানীয় ফুটবলারদের এই মিশ্র দলটির সাথে যোগাযোগের জন্য তিনি নিজের কাতারে থাকার সময়ে শেখা আরবি ভাষাকেই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ইরাকের এই মিশন ছাড়াও মেউলেনস্টিনের ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। ২০০১ সালে ইউনাইটেডের একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর ২০০৭ সালে তিনি প্রথম দলের খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়নের দায়িত্ব পান। রোনালদোর খেলার ধরন বদলে দেওয়ার পেছনে মেউলেনস্টিনের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি রোনালদোকে কেবল পায়ের জাদু বা ড্রিবলিংয়ের দিকে নজর না দিয়ে মাঠের পজিশনিং ও গোল করার দক্ষতার দিকে মনোযোগ দিতে বলেন। ক্যারিংটনের অনুশীলন মাঠে রোনালদোর সেই রিবাউন্ড বোর্ডের খাঁচায় অতিরিক্ত সময় কাটানোর তাড়না এবং নিখুঁত হওয়ার জেদ আজও মেউলেনস্টিনের মনে দাগ কেটে আছে। ২০০৭-০৮ মৌসুমের শুরুতে রোনালদো যখন ৩০টি গোলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন, মেউলেনস্টিন তাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন সংখ্যাটা ৪০ করার জন্য। সেই মৌসুমে ৪২ গোল করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছিলেন রোনালদো।

২০০৮ সালে ফার্গুসন যখন মেউলেনস্টিনকে প্রথম দলের মূল কোচের দায়িত্ব দেন, তখন তিনটি ফ্লিপচার্ট কাগজে ইউনাইটেডের খেলার দর্শন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে আক্রমণভাগের ক্ষেত্রে গতি, শক্তি, ভেদনক্ষমতা এবং অনির্দেশ্যতার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছিল। মেউলেনস্টিন মনে করেন, ফার্গুসনের সেই ‘ওয়েল ডান’ শব্দ দুটিই ছিল ফুটবলারদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ এক যুগ ওল্ড ট্রাফোর্ডে কাটানোর পর আজও ফার্গুসনের সাথে মেউলেনস্টিনের সেই গভীর হৃদ্যতা রয়ে গেছে। এখনো মাঝেমধ্যে তারা একসাথে আড্ডা দেন, আইপ্যাডে কুইজ খেলেন কিংবা আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও সিনেমা নিয়ে গল্প করেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সেই সোনালি অধ্যায় পার করে এসে মেউলেনস্টিন এখন স্বপ্ন দেখছেন ইরাকের ফুটবলারদের নিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি রূপকথা লেখার।

সূত্র: গার্ডিয়ান

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইরাক, ফুটবল, বিশ্বকাপ
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন