parbattanews

নন্দী বাবু তোমার জ্বলুনীতে চন্দন লাগাও

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চারটি ব্যাটালিয়নের নাম ইসলামের চারজন বিখ্যাত খলিফা যারা হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, যাদেরকে একসাথে খোলাফায়ে রাশেদা বলা হয় তাদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশের মধ্যে কোন আলোচনা না থাকলেও প্রশ্ন তুলেছে ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দী।

চন্দন নন্দী নর্থইস্ট নিউজ নামে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত নিউজ পোর্টালে এ সংক্রান্ত একটি নিউজ করেছেন। যার শিরোনাম ‘Bangladesh Army’s new battalion has Umar, Abu Bakr, Ali and Usman companies’। রিপোর্টে চন্দন নন্দী এই নতুন নামকরণকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইসলামীকীকরণের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তার দাবি মতে, ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এমনকি হজব্রত শেষে ফিরে আসা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকারুজ্জামানের মুখে দাড়ি রাখা কেও তিনি সেনাবাহিনীতে ইসলামাইজেশনের ফ্রেমে বন্দী করেছেন।

চন্দন নন্দীকে প্রশ্ন করতে চাই, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক দুইজন সেনাপ্রধান জেনারেল জাসওয়ান সিং এবং জেনারেল বিক্রম সিং এর মুখে দাঁড়ি ছিল। এগুলো হিন্দুত্ববাদ নাকি শিখবাদের প্রতীক ছিল সে প্রশ্ন তিনি তখন তুলেছিলেন কি? তবে তার এই অভিযোগ নতুন নয়। তার অভিযোগের সাথে মিল পাওয়া যায় উৎখাতকৃত স্বৈরিনি শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এর একটি লেখার সাথে। ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল “Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh”.

আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জার্নালে লেখাটি (পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আলোচিত হয়) প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাথে সহ-লেখক হিসেবে ছিলেন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কার্ল জে. সিওভাকো (Carl J. Ciovacco), যিনি আমেরিকার ‘ওয়েস্ট পয়েন্ট’ সামরিক একাডেমির গ্র্যাজুয়েট এবং ইরাক ও সৌদি আরবে মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

উক্ত প্রবন্ধে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তাঁর সহ-লেখক দাবি করেন যে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। চারদলীয় জোট সরকারের (বিএনপি-জামায়াত আমল, ২০০১-২০০৬) সময়কালে মাদ্রাসার ছাত্রদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রবেশিকা পরীক্ষার (Entrance Exam) জন্য প্রস্তুত করা হতো, যাতে তারা সহজে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

প্রবন্ধে একটি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করা হয়, ২০০১ সালের আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা রিক্রুটদের (সৈন্য বা কর্মকর্তা) হার ছিল মাত্র ৫%। কিন্তু ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের মেয়াদের শেষে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩৫%-এ দাঁড়ায়। প্রবন্ধটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং দেশের মধ্যে সমালোচিত হয়।

বাংলাদেশের কোন কোন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জয়ের এই প্রবন্ধ পিলখানায় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এবং এর পরবর্তীকাল সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হয়। দাড়ি, টুপি, নামাজী সদস্যদের কঠোর মনিটরিংয়ে রাখা হয়। তাদের পদায়ন ও প্রমোশনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। নানা অজুহাত তুলে ছাঁটাই করা হয় শত শত সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যকে। ভারতে প্রশিক্ষণের নামে পাঠিয়ে সেখানে কারা নামাজ পড়েন, কারা মদ খান না সেগুলো দেখার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত আনুগত্য ও চিন্তা ধারা পরীক্ষা করা হয়। ফলে অনেক মুসলিম সেনাসদস্যই স্বাভাবিক ধর্মচর্চা করতে শংকিত হতো।

চন্দন নন্দী একজন রহস্যময় সাংবাদিক। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর গভীরে তার রহস্যজনক ও অত্যন্ত শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর অত্যন্ত গোপনীয় ফাইল গুলো তার কাছে সহজেই চলে যায়। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে অন্যান্য দেশের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ যাতায়াত প্রশিক্ষণ প্রায় সকল বিষয়ে তিনি লাইভটাইম জানতে পারেন। কখনো কখনো তিনি অনেক গুজব ছড়িয়ে থাকেন এটাও সত্য এবং প্রমাণিত। কিন্তু অনেক সময় আবার অনেক কনফিডেন্সিয়াল তথ্য তিনি প্রকাশ করে থাকেন।

একজন বিদেশি সাংবাদিক কিভাবে আরেকটি দেশের প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য এত নির্ভুলভাবে পেয়ে থাকে, এবং এই ঘটনার পর বাংলাদেশের ফাইলগুলোতে ‘অতি গোপনীয়’ লেখার ক্রেডেনশিয়াল কোথায় থাকে- এই প্রশ্ন গণমাধ্যমে উচ্চারিত হয়। কেন এদেশের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অভ্যন্তরে থাকা বিদেশি সাংবাদিকের সোর্সগুলো দীর্ঘদিনের উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছে না সেটা একটা দারুন রহস্য। আরেকদিন আলোচনা করব সে প্রসঙ্গে।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী নিয়ে চন্দন নন্দীর অভিযোগ বিশ্লেষণের পূর্বে তাদের সেনাবাহিনীর দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। তার দেশ ভারতে কী অবস্থা চলছে দেখে নিই এক নজর। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে হিন্দু ধর্মের চর্চা বেশ খোলামেলায় করা হয়ে থাকে। অন্তর্জালে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন সমরাস্ত্র, ঘাঁটি, কোর ও রেজিমেন্টের নাম যেমন হিন্দু দেব দেবীর নামে রয়েছে তেমনি তাদের স্লোগানেও রয়েছে হিন্দু ধর্মের উপাদান। সেনাবাহিনীতে প্রতীক ও ক্রেস্টে স্বস্তিক, ওম, ত্রিশূল, শঙ্খ, চক্র ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ইউনিটে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোর ও কমান্ডের নাম নেয়া হয়েছে বেদ, উপনিষদ ও গীতার বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার নাম থেকে। এরকম কয়েকটি নাম যেমন, ৩৩ কোর — ত্রিশক্তি কোর — সুকনা, শিলিগুড়িতে সদর দপ্তর; সিকিম ও উত্তর বাংলা সেক্টর দেখাশোনা করে। (Anantam IAS) ২ কোর — খড়্গ কোর — আম্বালায় সদর দপ্তর, একটি স্ট্রাইক কোর। (Anantam IAS), ১৭ মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর — ব্রহ্মাস্ত্র কোর — পানাগড়ে সদর দপ্তর, একমাত্র মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর, ২০১৩ সালে গঠিত। (Anantam IAS), ৪ কোর — গজরাজ কোর — তেজপুর, আসামে সদর দপ্তর। (Anantam IAS)।

এসকল কোর, রেজিমেন্ট বা কমান্ডের নীতিবাক্য গুলো নেয়া হয়েছে বেদ উপনিষদ ও গীতা থেকে। যেমন, তাদের রাজপুত রেজিমেন্টের স্লোগান “বোল বজরং বালী কি জয়”। বজরংবলী হচ্ছে হনুমান যিনি দেবতা রামের সেনাপতি ছিলেন। ডোগরা রেজিমেন্টের স্লোগান হচ্ছে, “জওয়ালা মাতা কি জয়”। জওয়ালা মাতা হচ্ছেন একজন হিন্দু দেবী। রাজপুতানা রাইফেলসের স্লোগান, “রাজা রামচন্দ্র কি জয়”। গোর্খা রাইফেলসের স্লোগান, “জয় মা কালী, আয়ো গোর্খালী”। এতে দেবী কালীর বন্দনা করা হয়েছে। গাড়োয়াল রাইফেলসের স্লোগান, “বদরী বিশাল লাল কি জয়”।

উত্তরাখণ্ডের বিখ্যাত বিষ্ণু অবতার বদ্রীনাথের নাম। কুমায়ুন রেজিমেন্টের স্লোগান, “কালিকা মাতা কি জয়”। জম্মু-কাশ্মীর রাইফেলস”দুর্গা মাতা কি জয়”দেবী দুর্গার নাম। মাদ্রাজ রেজিমেন্টের স্লোগান, “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ” (নীতিবাক্য) ভগবদ্গীতার ৩য় অধ্যায়ের ৩৫ নম্বর শ্লোক (“স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ”) থেকে নেওয়া। ভারতীয় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, মহাভারত, অর্থশাস্ত্র, রামায়ণ থেকে যুদ্ধকৌশল, নৈতিকতা ও কৌশল অধ্যয়ন করা হয়। এতে প্রাচীন ব্যূহ (formation) যেমন চক্রব্যূহ, গরুড়ব্যূহ ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র, সমরাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বিভিন্ন অস্ত্র গুলোর নামের দিকে তাকালে দেখতে পাই: ভারতের সবচেয়ে দূরপাল্লার মিসাইল এর নাম অগ্নি এসেছে মূলত অগ্নি দেবতার নাম থেকে। ভারতের হাইপারসনিক মিসাইল এর নাম ব্রাহ্মস। এটি এসেছে দেবতা ব্রহ্মা এবং রাশিয়ার মস্কোভা নদীর নামের সংমিশ্রণে। মিসাইলটি দুই দেশের মিলিত উৎপাদন। এন্টি ট্যাংক মিজাইলের নাম নাগ এসেছে নাগ দেবতার নাম থেকে। মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার পিনাক শিবের ধনুকের নাম থেকে এসেছে। রামের ধনুকের নাম থেকে এসেছে ধানুস মিসাইল। সারফেস টু এয়ার মিসাইল ত্রিশূলের নামটি নেয়া হয়েছে শিবের ত্রিশূল থেকে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর মটো হচ্ছে, “শং নো বরুণঃ”। তৈত্তিরীয় উপনিষদের একটি শ্লোক থেকে নেয়া হয়েছে। এতে সমুদ্রের দেবতা বরুণের আশীর্বাদ কামনা করে বলা হয়েছে, ‘সমুদ্রদেবতা বরুণ আমাদের প্রতি অনুকূল হোন’। ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ গুলোর নামের দিকে একটু নজর দেয়া যাক। আইএনএস জটায়ু: রামায়ণের পাখি জটায়ুর নামে। আইএনএস শচী, দেবরাজ ইন্দ্রের স্ত্রী শচীর নামে এই নামকরণ। আইএনএস চক্রের নাম এসেছে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র থেকে। আইএনএস শিবালিক নামকরণ করা হয়েছে শিবের নামে। আইএনএস ত্রিশূল নামকরণ করা হয়েছে শিবের ত্রিশূল থেকে।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর নীতিবাক্য হচ্ছে, “নভঃ স্পৃশং দীপ্তম্” — এটি গীতার একাদশ অধ্যায়ের একটি শ্লোক থেকে নেওয়া হয়েছে। যেখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে নিজের বিশ্বরূপ দেখান, যা আকাশ স্পর্শ করে দীপ্তিমান হয়ে ওঠে- সেই বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বিমান বাহিনীর কয়েকটি স্কোয়াড্রন ও ইউনিটের নাম নিম্নরূপ:

· গরুড় কমান্ডো ফোর্স: বিষ্ণুর বাহন পাখি গরুড়ের নামে।
· ১৫৭ হেলিকপ্টার ইউনিট (তারক্ষ্য): পৌরাণিক পাখি ‘তারক্ষ্য’-এর নামে।
· ১৫৯ হেলিকপ্টার ইউনিট (রুদ্রাক্ষ): ‘রুদ্র’ (শিব) ‘অক্ষ’ (চোখ)। রুদ্র নামের বিমানবাহিনীতে হেলিকপ্টারও রয়েছে।

· ২২৩ স্কোয়াড্রন (ট্রাইডেন্ট): ‘ত্রিশূল’ বা ইন্দ্রের ‘বজ্র’ থেকে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম সুদর্শন চক্র। এটি দেবতা বিষ্ণুর চক্র অস্ত্রের নামে। বিষ্ণুর দিব্য চক্র অস্ত্র হিন্দু গ্রন্থে সর্বধ্বংসী বলে বর্ণিত, ১০৮টি খাঁজযুক্ত প্রান্তসহ। এটাই বিষ্ণুর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। ভারত বিভিন্ন সময় যে সকল অপারেশন পরিচালনা করেছে তাতেও একই প্রক্রিয়ায় নাম বাছাই করা হয়েছে। যেমন, অপারেশন মহাদেব: শিবের নামে। অপারেশন মেঘদূত: কালিদাসের কাব্য ‘মেঘদূত’ থেকে। অপারেশন শিবশক্তি: শিব ও শক্তির নামে। সর্বশেষ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের নাম ছিল, অপারেশন সিন্দুর। এটি হিন্দু নারীর বিবাহের প্রতীক সিঁদুর থেকে নেয়া হয়েছে।

অন্তর্জালে এরকম হাজার হাজার দৃষ্টান্ত রয়েছে সেসবের উদাহরণ তুলে ধরতে গেলে কেবল লেখার পরিসর দীর্ঘ হবে এবং পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটবে। নন্দী বাবুর কাছে আমার প্রশ্ন, সরকারি হিসেবে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত ১৫ শতাংশ। বাস্তবে এটা আরো বেশি। আমরা বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে এভাবে হিন্দু দেব-দেবী ধর্মীয় গ্রন্থের নানা চরিত্র ঘটনা বিষয়বস্তু থেকে উঠে আসা নামকরণ, শ্লোক ও ত্রোস্তকে নীতিবাক্য হিসেবে গ্রহণ করা নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলেছি? তাহলে আপনি কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই নামকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন? উল্লেখ্য বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশ।

এখন আমি আপনাকে বলি, আপনি যেভাবে চিত্রিত করতে চেয়েছেন যে ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইসলামিকীকরণের প্রবণতা বেড়েছে, তথ্য প্রমাণ বলে এটি সঠিক নয়। কেননা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পূর্ব থেকেই অনেক ইসলামী শব্দ ও চরিত্রের নাম রয়েছে।

আবু বকর ওসমান ওমর আলী হায়দার নাম গুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে নতুন নয়। বহু পূর্ব থেকেই এই ধরনের শব্দ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে প্রচলিত রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটো ডিভিশনের নাম হচ্ছে জালালাবাদ ও জাহানাবাদ সেনানিবাস। এটি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ আলাইহি ও হযরত খানজাহান রহমাতুল্লাহ আলাইহির নাম অনুসারে করা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর অনেক ঘাঁটি ও যুদ্ধ জাহাজের নামে ইসলামিক নাম রয়েছে। বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর কয়েকটি জাহাজের নাম রয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের নামে। যেমন, বানৌজা আবু বকর, বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ, বানৌজা আলী হায়দার, বানৌজা ওমর ফারুক, বানৌজা আবু উবাইদাহ প্রভৃতি।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কয়েকটি ঘাঁটির নাম রয়েছে যেমন, হাজী মোহাম্মদ মহসিন ঘাঁটি। মীর নেসার আলী তিতুমীর ঘাঁটি, ঈশা খান ঘাঁটি প্রভৃতি। বাংলাদেশ সেনা নৌ ও বিমান বাহিনীর ভেতরে অসংখ্য ভবন, স্থাপনা ও মেসের নামে ইসলামী নাম রয়েছে। প্রশিক্ষণের সময় বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে গ্রুপ ভিত্তিক বিভাজনে এ ধরনের ইসলামিক নাম সম্বলিত গ্রুপ করা হয়। যেমন তিতুমীর গ্রুপ, উমর গ্রুপ, আবু বকর গ্রুপ, ওসমান স্কোয়াড্রন ইত্যাদি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর লোগোতে যে ঈগলের প্রতীক রয়েছে তার নাম ‘শাহীন।’ এজন্য বিমান বাহিনীতে শাহীন নামে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই শাহীন শব্দটি এসেছে ফার্সি ভাষা থেকে যার অর্থ রাজকীয় বাজপাখি। এগুলো কোন নতুন কথা নয় বা কারো নতুন আবিষ্কার নয়।

নন্দীবাবু আপনি হয়তো ভুলে গেছেন, ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার যখন ১৭ জন অশ্বারোহী নিয়ে আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে লক্ষণ সেনের সিংহ দুয়ারে তরবারি দিয়ে আঘাত করেছিল সেই ১৭ জন অস্বারোহীর আল্লাহু আকবার স্লোগানে লক্ষণ সেনের হাজার হাজার সৈন্যের সাহস ভেঙ্গে কোন খান হয়ে যায়। অন্যতম প্রতিরোধের চেষ্টা না করে পালিয়ে যায় লক্ষণ সেন। ভুলে গেছো হরযত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আযানের শব্দে কিভাবে গৌর গোবিন্দের প্রাসাদ ঘসে পড়েছিল।

ঈশা খাঁ মোগল সম্রাট ময়মনসিংহের সৈন্যবাহিনীর ওপর আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে বাঙালি মুসলিমদের চেতনাকে শানিত করেছে এই আল্লাহু আকবার স্লোগান। ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে ফায়ার ওপেন করার সময় এমনকি বিজয়ের পর প্রথম তাকবীর আল্লাহু আকবার গগন বিদারী স্লোগান দিত, তারপর জয় বাংলা। এদেশের শ্রমিক মজুর শরীরের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ‘ইয়া আলী’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে। এদেশের মাঝিরা তুফান দরিয়ায় নির্ভয়ে নৌকা ভাসায় লা শারিক আল্লাহ সারি গান গেয়ে। কিংবা শন শন তুফান বায়ুর মধ্যে তারা ‘বদর বদর বলিয়া হুংকারিয়া ওঠে।’ তুমি কি জানো এই ‘বদর’ কি? না জানলে ইসলামের ইতিহাস দেখে নাও। এটা আমাদের ইতিহাস এটা আমাদের সংস্কৃতি এটা আমাদের চেতনা যা হাজার বছর ধরে রক্তের সাথে মিশে আছে। এটা নতুন কারো আবিষ্কার নয়।

নন্দীবাবু, আপনার জ্ঞাতার্থে বলি, বাংলাদেশের একটি ক্যান্টনমেন্টে কালি দেবীর সামনে বুক চীরে রক্ত বের করে বিল্লপত্রের উপরে রেখে মাথার উপর তলোয়ার দিয়ে গীতা পাঠ করে শপথ নেয়া অনুশীলন সমিতির সশস্ত্র সদস্য সূর্য সেনের নামে একটি স্থাপনা রয়েছে। আমরা এ নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলিনি। কারণ বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। আমরা প্রয়োজনে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের নামেও স্থাপনা বানাবো গর্বের সাথে।

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠিত ও পরিচালিত হবে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নীরিখে। আমাদের সমরাস্ত্র ক্রয় ও উন্নতকরণের লক্ষ্যও এটাই। কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা কারো প্রক্সি খেলার জন্য নয়।

বাংলাদেশ কোন সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র নয়। কিন্তু আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে অবচেতন, অসতর্ক, অপ্রস্তুত থাকতে পারিনা। আমাদের হুমকি ও ঝুঁকি বিবেচনায় যা কিছু করণীয় আমাদের প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব সবকিছু করবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য সবার আগে বাংলাদেশ। এই লক্ষ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ একাট্টা।

নন্দী বাবু তোমার জ্বলুনীতে চন্দন লাগাও। শীতল হবে। নিজেরটা সামলাও। আমাদেরটা আমরাই দেখে নেবো, সামলে নেবো, নিতে সক্ষম।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষক।

Exit mobile version