নিয়ন্ত্রণহীন ভাড়ায় বান্দরবান ভ্রমণে দ্বিগুণ ব্যয়

fec-image

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন জেলা বান্দরবানে এখন পর্যটকদের প্রধান অভিযোগ—নিয়ন্ত্রণহীন যাতায়াতে ভাড়া কিংবা হোটেলের বৃদ্ধি। হোটেল থেকে গাড়ি, স্পট থেকে গাইড—প্রায় প্রতিটি ধাপে পর্যটকদের গুণতে হচ্ছে দ্বিগুণ ব্যয়। ভ্রমণবান্ধব পরিবেশের বদলে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক শোষণ ও প্রশাসনিক শূন্যতার এক জটিল বাস্তবতা। যা পর্যটকদের জন্য দিনের পর দিন গলার কাটাঁ হিসেবে দাঁড়িয়েছে পর্যটন নগরী বান্দরবান জেলাটি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ঘেরা পর্যটনসমৃদ্ধ পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে দিন দিন বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন। সম্প্রতি বগালেক, কেওক্রাডং, তমাতুঙ্গীসহ জেলার অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ায় শীতের শুরু থেকে জনপ্রিয় স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেবার মান সমানভাবে বাড়েনি। এ কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা।

বান্দরবান এখন আর শুধু পাহাড়–ঝর্নার সৌন্দর্যের ঠিকানা নয়। এখানে নিলাচল,বগালেক, নীলগিরী,কেওক্রাডংসহ আরো মনোরঞ্জন করার স্থান রয়েছে। কিন্তু সেখানে পাড়ি দিতে চাঁদের গাড়ি অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া, হোটেলের হয়রানিসহ নানা নৈরাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। যাকে বলে—পর্যটনের নামে প্রকাশ্য লুটপাট আর পর্যটকদের কাছ থেকে গলা কেটে অর্থ আদায়ের উৎস।

পর্যটকদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রুম বুকিং নেয়ার পর হোটেল স্টাফদের ব্যবহার যেন জঘন্য। রুমে শোচাগার থেকে বিশ্রামাগার পর্যন্ত অপরিস্কার ভাবে রাখছেন হোটেল কতৃপক্ষরা। শুধু এখানে থেমে থাকেনি- বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, যা দূরত্বের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য রাখে না। স্থানীয় ও বাইরে থেকে আসা গাড়ির চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করছেন। হোটেল ও রেস্টুরেন্টের সেবার মানও পর্যাপ্ত নয়। পরিবহনে ভাড়া কমানো, হোটেল ও রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন খাতে সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানাচ্ছেন পর্যটকরা।

বান্দরবান শহর থেকে পর্যটকদের নিয়ে পর্যটন স্পটের ছুটে যাচ্ছে বেশী কয়েকটি যানবাহন। কিন্তু জিপ, চাঁদের গাড়ি, থ্রি–হুইলার—কোনো পরিবহনেই ভাড়ার স্বচ্ছতা নেই। একই দূরত্বে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা তিন সময় তিন রকম ভাড়া।স্পটভিত্তিক প্যাকেজেও একই চিত্র—কেউ নিজের সুবিধামতো দাম নির্ধারণ করছেন। যার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছেন অনেকেই।

একই চিত্র পর্যটক গাইড ক্ষেত্রেও। অনেক স্থানে অঘোষিত টিকিট ফি এবং অস্বীকৃত গাইড ফি পর্যটকদের বিব্রত করছে। একই রুটে একেকজন গাইড একেক রকম চার্জ নিচ্ছেন—কোথাও কোনো মানদণ্ড নেই।ফলে ভ্রমণকারীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কোনটি বৈধ আর কোনটি নয়। ফলে এই পদক্ষেপগুলো নিলে বান্দরবান ফের নিরাপদ, স্বচ্ছ ও পর্যটকবান্ধব গন্তব্য হতে পারে।

জীপ মাইক্রোবাস স্টেশন তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবানে চাদের গাড়ি(থ্রি হুইলার), ফাইডোরসহ প্রায় চার শতাধিক গাড়ি রয়েছে। সেসব গাড়ি পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ছুটে যান। কিন্ত সেখানেই ভাড়া নিয়েও মহাবিপদে পর্যটকরা।

বান্দরবান- সর্বোচ্চ চূড়া কেওক্রাডং পাহাড়ের দুরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। সেখানে চাঁদের গাড়ি ভাড়া প্রায় ১৭ হাজার টাকা। যা একরাত রাত্রিযাপন করলে গুনতে হবে ২০ হাজার টাকা।তবে গত দুইদিন ব্যবধানে কমেছে ১৭ হাজার টাকা। বান্দরবান- বগালেক দুরত্ব ৭৫ কিলোমিটার, সেখানে যাতায়াতের ভাড়া ৮ হাজার ও রাত্রীযাপনের গুনতে হবে সাড়ে ১১হাজার টাকা। একইভাবে নীলগিরিতে যাতায়াত ৬ হাজার ৩শত টাকা ও একরাত রাত্রিযাপনে ভাড়া ১০ হাজার টাকা, দেবতাখুমে ভাড়া ৫ হাজার ও একরাত রাত্রিযাপন ভাড়া ৮ হাজার টাকা।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আশরাফুল, তৃপ্তি, সৈয়দ আব্দুর বলেন, ‘বান্দরবানের প্রকৃতি অসাধারণ, কিন্তু সেবার মান হতাশাজনক। অতিরিক্ত ভাড়া ও হোটেলে পর্যাপ্ত সুবিধা না পাওয়া আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে। একই সেবা পেতে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হওয়ার অভিজ্ঞতায় বান্দরবানকে এড়িয়ে যেতে হচ্ছে।এমন প্রতিক্রিয়া শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করেন তারা।

জীপ ও মাইক্রোবাস লাইনম্যান কামাল উদ্দিন বলেন, কেওক্রাডং ভাড়া ১৭ হাজার ছিল’ ডিসির মাধ্যমে এটি কমে ১৫ হাজার করা হয়েছে। আর এক রাত রাত্রিযাপন করলে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে।

বান্দরবান হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শীতের শুরুতেই পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা পর্যাপ্ত সেবা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছি এবং বিভিন্ন সময়ে ডিসকাউন্টও দিই। এসবের কোন গুরুতর অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বান্দরবান ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার হাসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘পর্যটকদের হয়রানি, হোটেলে অপর্যাপ্ত সেবা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আসে। যদি পর্যটক অভিযোগ দেন, তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: বান্দরবান
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন