parbattanews

পশ্চিমবঙ্গে কি হিন্দুত্ববাদের পুনরুত্থান ঘটেছে?

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন, ঠিক তখনই দিল্লির পার্লামেন্টে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তার ভাষণে বলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহায়তার নিগুঢ় অর্থ ও উদ্দেশ্য বুঝতে হলে এই একটি বাক্য বোঝাই যথেষ্ট। এই বাক্যটি বুঝতে পারলেই আজকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় লাভের পর ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে বিজেপি সমর্থকদের প্রোফাইলে যখন ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, Revival of Hindutva, Awakening of Hindutva, Awakening of Bharat Mata, A Sacred Land Reclaimed, Bengal is the birthplace of Hindutva, Hindus have reclaimed Bengal after 800 years — জাতীয় প্রচারণার প্রকৃত অর্থ বোঝা যেতে পারে। এটা বুঝতে পারলে বোঝা যাবে, এই ৮০০ বছর কোথা থেকে এলো এবং কীভাবে এলো?

এই ৮০০ বছর এসেছে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাতে সর্বশেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনের পতনের মধ্য দিয়ে। বাংলায় প্রথম বাঙালি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাল রাজাদের হাত ধরে (৭৫০-১১৭৪ খ্রিস্টাব্দ)। কিন্তু দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক থেকে আসা বিজয় সেন কর্তৃক পাল রাজাদের পরাজিত করার মাধ্যমে বাংলায় সেন বংশের শাসন শুরু হয় (১১৭০-১২০৪)। সেন রাজবংশ ছিল উচ্চবর্ণের এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্ন। তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির কাছে সেন রাজবংশের অন্যতম লক্ষণ সেনের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলায় হিন্দু সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটে এবং এর পরবর্তীতে আর কখনোই তারা বাংলা দখল নিতে পারেনি। এই শাসনামল টিকে ছিল ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ওই বছর সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইলিয়াস শাহী রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়, যা ইতিহাসে বেঙ্গল সালতানাত (১৩৪২-১৫৭৬) হিসেবে খ্যাত হয়েছে। এই সালতানাতের পতন হয় মোগলদের কাছে। শুরু হয় মুঘল শাসনামল (১৫৭৬-১৭১৭)। এরপর আসে নবাবী শাসন (১৭১৭-১৭৫৭)। এই নবাবরা যদিও দিল্লির সালতানাতের অধীনেই ছিলেন। তবুও তারা অনেকটা স্বাধীনভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। পলাশীর আম্র কাননে রবার্ট ক্লাইভের কাছে শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় শুরু হয় ব্রিটিশ শাসন আমল (১৭৫৭-১৯৪৭)। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগে পশ্চিমবাংলার বাঙালি হিন্দুরা ভারতের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে থাকাকে বেছে নিলে শুরু হয় বাংলায় কংগ্রেস ও বামদের শাসন। এই দুই দল বা তাদের সমর্থিত জোট বিভিন্ন নির্বাচনে ঘুরেফিরে একের পর এক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব উপভোগ করে। ২০১১ সালে সাবেক কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবাংলায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ২০ মে ২০১১ থেকে ৪ মে ২০২৬ টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করার পর সর্বশেষ নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির কাছে ভূমিধস পরাজয় ঘটে। এর মধ্য দিয়েই ৮০০ বছর পর আবার পশ্চিম বাংলার রাষ্ট্র ক্ষমতায় হিন্দুত্ববাদীরা ফিরে আসে। এটাকেই তারা Revival, Awakening, Reclaim — বাংলায় হিন্দুত্ববাদের পুনরুজ্জীবন, জাগরণ বা পুনরুত্থান বলে গর্বের সাথে দাবি করছে। তাদের মতে, আধুনিককালে সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদের জন্মভূমি এই বাংলা। বলা হচ্ছে, এটি ছিল ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শাক্তদের এক স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া, যা ১৮৬৬ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে শ্রী অরবিন্দ এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বাঙালি বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী এবং ঋষিদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে তাদের এই দাবি খুব বেশি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিল্প সাহিত্যে যেমন ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, এমনকি শরৎচন্দ্র বাঙালির জনমনে হিন্দুত্ববাদী চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের পোলিশড ভার্সন। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা কমল-দলবিহারিণীর’ সাথে রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামল বরণ কোমল মূর্তির’ লক্ষ্যগত কোন পার্থক্য নেই।

‘হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।
দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে,
সঙ্কটদুঃখত্রাতা।
জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে,
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়ন অনিমেষে।
দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে,
স্নেহময়ী তুমি মাতা।
জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, জয় হে॥’

এটি বঙ্কিমের বন্দে মাতরমের রবীন্দ্র ভার্সন। রবীন্দ্রনাথ ‘এক ধর্মরাজ্যপাশে খণ্ড-ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারতকে বেঁধে দেয়ার’ যে সংকল্প করেছিলেন, ‘মহাভারত একধর্মরাজ্য হবে’ বলে যে মহাবচন দিয়েছিলেন, বিজেপি বাংলার বিজয়কে সেই মহাবচনের, সংকল্পের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছে। সে কারণেই বিজেপি নির্বাচনে জয়লাভের পর এই মহাকবির জন্মজয়ন্তী ২৫ বৈশাখকে শপথ নেওয়ার দিন হিসেবে বেছে নিয়েছিল, যদিও মমতা যথাসময়ে পদত্যাগ না করায় তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। এগুলো কাকতালীয় নয়।

জুন ২০১৪ থেকে জানুয়ারি ২০১৮ এবং এখন ৪ মে, ২০২৬ রাজনৈতিক মানচিত্রে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তার মিত্রদের এই নাটকীয় সম্প্রসারণ আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে রবীন্দ্রনাথের মহাভারত প্রতিষ্ঠার সংকল্পের বাস্তবায়নের চিত্র ফুটে ওঠে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভোট এবং আসন বিচারে ২০১৪ সালে বিজেপি জোট শাসন করত ৩৪% ভূমি এলাকা, ২৫% জনসংখ্যা। এ সময়ে অ-বিজেপি ৬০% ভূমি, ৭০% জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকায় ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ২০১৮ সালে বিজেপি জোটের দখলে আসে ৭৪% ভূমি, ৬৯% জনসংখ্যা। এসময়ে অ-বিজেপি ২৫% ভূমি, ৩১% জনসংখ্যা। ২০২৬ বঙ্গ বিজয়ের পর বিজেপি জোটের দখলে চলে গেল ৭২% ভূমি এলাকা, ৭৮% জনসংখ্যা। অন্যদিকে অ-বিজেপি জোটের দখলে থাকলো ২২% ভূমি, ২২% জনসংখ্যা। এটি রবীন্দ্রনাথের মহাবচন বাস্তবায়নের ক্রমচিত্র।

তবে বিজেপির এই উত্থান কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। শত বছরের এক পরিকল্পিত পুনরুত্থান। এর পেছনে রয়েছে হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নামক সংগঠনগুলোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পিত নকশা। হিন্দু মহাসভা ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর শিকড় ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বিভিন্ন স্থানীয় হিন্দু আন্দোলনের মধ্যে। মদনমোহন মালব্য, লালা লাজপত রায়, বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন এর বিশিষ্ট নেতা। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের ঐক্য সাধন, ভারতের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা এবং হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভারতের জাতীয় পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ১৯২৫ সালে নাগপুরে ড. কে. বি. হেডগেওয়ার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম, সবচেয়ে সুসংগঠিত স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থা বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ভারতে হিন্দুত্ববাদের জমিনকে উর্বর করতে এই সংগঠনের সদস্যরা সারা ভারতে লক্ষাধিক শাখা, উপশাখা খুলেছে। বিদ্যাভারতী, আরোগ্য ভারতী, বিজ্ঞানভারতী, এবিভিপি (ছাত্র সংগঠন), সংস্কৃতিভারতী, সেবাভারতী, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল (যুব শাখা), দুর্গা বাহিনী, রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি (মহিলা শাখা), বিএমএস (ভারতীয় মজদুর সংঘ), বিকেএস (ভারতীয় কিষাণ সংঘ), স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ (অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ), বনবাসী কল্যাণ আশ্রম (উপজাতীয়), হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ (কূটনীতি) প্রভৃতি নামে অসংখ্য সংগঠন তৈরি করেছে। প্রায় শত বছর ধরে এই সংগঠনগুলো বিজেপির সফট পাওয়ার, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট ও আঁতুড়ঘর হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই সুফল আজ ঘরে তুলছে বিজেপি। মনোহর পারিকর, শিবরাজ সিং চৌহান, রাজনাথ সিং, নীতিন গাডকারি, লাল কৃষ্ণ আদভানি, অটল বিহারী বাজপেয়ী, নরেন্দ্র মোদী, মোহন ভগওয়াত, যোগী আদিত্য নাথের মতো নেতারা বিজেপির উল্লিখিত প্রকল্প থেকে উঠে আসা।

অথচ, ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিজেপির এই নেতাদের পূর্বসূরি ছিলেন বাংলার রাজনারায়ণ বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ কুমার ঘোষ। রাজা রামমোহন রায় আব্রাহামীয় মতবাদগুলোকে অবৈজ্ঞানিক এবং হিন্দুত্ব সংস্কৃতিতে কর্মের ধারণাকে বৈজ্ঞানিক বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন কট্টর হিন্দু। তিনি ছাত্রদের কখনো হিন্দু দর্শন কখনও পরিত্যাগ না করার পরামর্শ দিতেন। আনন্দমঠের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দুদের সমাজবিজ্ঞানকে ঔপনিবেশিকতামুক্ত করতে এবং ধর্ম ও ধর্মের ভ্রান্ত সমতা থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন। তিনি তাঁর লেখায় জোরালোভাবে ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের এই বন্দেমাতরম গানের সুরারোপ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৯০১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ নামক একটি পত্রিকায় ‘হিন্দুত্ব’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এখানে তিনি হিন্দুত্বকে নিঃস্বার্থতার ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শরৎচন্দ্র বাঙালি মুসলমানদেরকে বাঙালি বলে স্বীকারই করেননি। স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ব আধ্যাত্মিকতা এবং হিন্দুদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছিলেন। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন, ‘আমি বলি যে সনাতন ধর্মই আমাদের জন্য জাতীয়তাবাদ। এই হিন্দু রাষ্ট্রের জন্ম সনাতন ধর্মের সাথে, এর সাথেই এটি চলে এবং এর সাথেই এটি বিকশিত হয়। যখন সনাতন ধর্মের পতন হয়, তখন জাতিরও পতন হয় এবং যদি সনাতন ধর্মের বিলুপ্তি ঘটা সম্ভব হতো, তবে সনাতন ধর্মের সাথেই এরও বিলুপ্তি ঘটত।’ গিরিশ চন্দ্র এবং তাঁর নাট্যদল ১৮৭১ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ভারতীয় জন সংঘ শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে আজকের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিতে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই পশ্চিমবাংলায় বিজেপির জয়ের পর বিজেপি সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করছে, বাংলা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদের জন্মভূমি।

পূর্বেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রের সফট বা পোলিশড ভার্সন। তেমনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, অনুকূল ঠাকুর, হরিচাঁদ ঠাকুর, এমনকি নিমাই চাঁদ ঠাকুরের বৈষ্ণববাদ হিন্দুত্ববাদেরই সফট ভার্সন। এ কারণে জাতপাতে বিভাজিত বাংলার অন্ত্যজ হিন্দুরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা শোষিত হলেও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তারা সব সময় হিন্দুত্ববাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

একইভাবে হিন্দু মহাসভা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস-এর ধারণা এসেছিল বাংলার অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মাধ্যমেই। বাইরে ভারতীয় স্বাধীনতার কথা বললেও ভেতরে ছিল চরম মুসলিম বিদ্বেষ। এ দলের সদস্যরা ছিল শাক্ত পূজারী। মাথার উপর তরবারি রেখে বুক চিরে রক্ত বের করে বেল পাতার উপর রেখে কালী দেবীর সামনে উৎসর্গ করে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে এদের শপথ নিতে হতো। সে কারণে একইভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমরা কখনোই এসব দলের সদস্যপদ গ্রহণ করেনি। ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এ দলেরই সদস্য। স্বাধীনতার নামে তাদের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতার নামে। এদের উৎসাহ যুগিয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার ফুল বাংলার ফল, এক হোক, এক হোক, এক হোক, হে ভগবান।’ অথচ, সেদিন যারা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে বাঙালির হাতে রাখি বেঁধে গাইলো, ‘বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন, এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান’— ১৯৪৬-এ এসে সেই বাংলা ভাগ করার জন্য তারা বললো, If India wants her bloodbath, she shall have it. (এম. কে. গান্ধী)। যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে বললেন, মুসলিমরা যদি ভারতবর্ষের বিভাজন চায় তবে ভারতের সকল মুসলিমদের উচিত তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যাওয়া। তিনিই আবার ১৯৪৭ সালের মে মাসে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠিতে লেখেন, ভারত ভাগ না হলেও বাংলাকে অবশ্যই ভাগ করতে হবে। এ কারণেই শরৎ বসু প্রমুখের চেষ্টা বৃথা হয়ে যায়।

আজ ১৯৪৭ নিয়ে যে বিতর্ক তুলেছেন স্বয়ং বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা, সেই বিতর্কের সমাধান বহু পূর্বেই করেছিলেন ঐতিহাসিক বিমলানন্দ শাসমল। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেবার জন্য আমরা ভারতীয়রা কৃতিত্বের দাবি করি এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে সেইজন্য এই সময়ে এশিয়ার মুক্তি সূর্য বলেও অভিহিত করা হোতো। কিন্তু বিনীতভাবে বলতে চাই, যে লোকটির জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারলো তাঁর নাম মহম্মদ আলি জিন্না। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা জিন্নার আহ্বহ্বান অগ্রাহ্য করে যদি পাকিস্তানে যোগ না দিতেন এবং ভারতে যোগ দিতেন এবং তারপর দশ-বিশ বছর বাদে যে-কারণে পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন হতে চাইলেন অর্থাৎ ভাষা পার্থক্যের জন্য ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতালাভ করতে চাইতেন, তাহলে শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা বাঙালিরা কি ফুলের মালা দিয়ে পূজা করতাম, না রাস্তায় গুলি করে মারার দাবি জানাতাম? প্রায় একই কারণে শেখ আবদুল্লাকে কত বছর কারাগারে থাকতে হয়েছিল, নিশ্চয়ই সেকথা কেউ ভোলেননি। পাকিস্তানে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে পাকিস্তান পূর্ব বাংলায় যে অত্যাচার করেছিল, আমাদের ভারতবর্ষে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে ভারতবর্ষ পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি না হোক কম অত্যাচার করতো না।

মিজো-নাগাদের উপর আমরা যে অত্যাচার করে-ছিলাম, পৃথিবীর লোক কোনোদিন সে সংবাদ জানতে পারবে না। এবং ভারতের মত শক্তিশালী দেশের সংগে লড়াই করবার জন্য ক্ষুদ্র পাকিস্তান বা পৃথিবীর কোনো দেশের কার্যকরী সাহায্য পূর্ব বাংলার লোকেরা পেতেন না। ভাগ্যবশত পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল, তাই খুব সহজেই স্বাধীন হতে পারলো-না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দূর অস্ত হয়ে থাকতো। সেইজন্যই বললাম, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা মহম্মদ আলি জিন্নার ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল বলেই সহজে স্বাধীন হোলো। ১৯৪০-এ লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাবে জিন্না একাধিক মুসলমান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নই দেখেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে জিন্নার স্বপ্নই সফল হোলো।’ (বিমলানন্দ শাসমল, ভারত কী করে ভাগ হলো, পৃষ্ঠা: ১৬০-১৬১।)

ইতিহাস রচনা ও চর্চায় বাঙালি মুসলমানের আগ্রহ ও দুর্বলতা বরাবরের। ফলে অন্যের ইতিহাস পাঠ ও চর্চা করে সে একটি ঐতিহাসিক মার খেয়েছে বারবার। ঘরে, বাইরে, স্বপ্ন ও চিন্তার জগতেও। এই পর্যুদস্ততা সে বুঝতেও পারে না। ফলে তার স্বাজাত্ম্যবোধ, স্বতন্ত্রতা, সংগ্রাম, শক্তি, বীরত্ব ও আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতনতাও গড়ে ওঠে না। এ কারণে আজকে পশ্চিমবাংলায় হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে নিজস্ব অস্তিত্বের প্রশ্নে বিশ্লেষণ করতে অক্ষম। এ কারণে ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বোঝা পড়ার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্বার্থের সম্পর্ক সাময়িক কিন্তু আদর্শের সম্পর্ক স্থায়ী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল যুদ্ধ বন্ধের। নিজের প্রথম মেয়াদের অভিজ্ঞতা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় জোরেশোরে বলেছিলেন, ডেমোক্রেটরা সব সময় যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, আর আমি যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তিনি ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। অথচ সেই প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিপর্যয়কর যুদ্ধে যেতে হয়েছে। কারণ, নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তিনি যে ইহুদি লবির আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিলেন, নির্বাচনে বিজয়ের পর তাদের চাপ ব্যক্তিগতভাবে বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ উপেক্ষা করতে সক্ষম হননি। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীরা নির্বাচনে জয় লাভের জন্য মাড়োয়ারি, হিন্দি ভাষী ও গুজরাঠিদের যে সহায়তা নিতে হয়েছে তাকে উপেক্ষা করা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পক্ষে সম্ভব হবে না। এদের চাপেই একদিন তাকে প্রবল বাঙালি মুসলিম ও বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। একারণেই এশিয়া গ্রুপের ইন্ডিয়া বিভাগের সভাপতি অশোক মালিক তার এক লেখায় বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং এটি একটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। এটি গঙ্গা তীরবর্তী পূর্বাঞ্চলে সরকার-বিরোধী মনোভাব, হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দাবির প্রতিফলন; যা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন রূপ দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাস্তব দৃষ্টান্ত দিতে ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ-১৮ এর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলের উপরে করা একটি বিশ্লেষণের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) নথিভুক্ত বর্তমান ভোট শতাংশ অনুযায়ী, বিজেপি ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ৪০.৯৩ শতাংশ ভোটের চেয়ে চার শতাংশে এগিয়ে রয়েছে। সংখ্যাগতভাবে, এর অর্থ হলো বিজেপি পেয়েছে প্রায় ১.৩৯ কোটি ভোট এবং তৃণমূল পেয়েছে ১.২৬ কোটি ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান মাত্র ১২ থেকে ১৩ লক্ষ। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, এমন ব্যবধানের ফলে একটি হাড্ডাহাড্ডি বিধানসভা গঠিত হওয়ার কথা। বাংলায় এর ফলে প্রায় ৮৫ থেকে ১০০টি আসনের এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এই নির্বাচনের উপর একটি বড় ছায়া ফেলেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটার বিচারাধীন ছিলেন এবং তাঁদের ভোটাধিকারের জন্য পুনরায় আবেদন করতে হয়েছিল। এমন একটি রাজ্যে যেখানে নির্বাচনী ব্যবধান প্রায়শই খুবই সামান্য থাকে, সেখানে এটি কোনো গতানুগতিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। এটিকে একটি ভূকম্পন সৃষ্টিকারী হস্তক্ষেপের মতো মনে হয়েছে।

চূড়ান্ত ভোটের ব্যবধান মাত্র ১২-১৩ লাখের সঙ্গে তুলনা করলে, বাদ পড়া ভোটারদের এই ব্যাপকতা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাদ পড়া ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি কোনো নির্দিষ্ট দিকে ঝুঁকে থাকত, তাহলেও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ফলাফলের ওপর তার পরবর্তী প্রভাব ভিন্ন বা ব্যাপক হতে পারত। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকা ১১২ আসনের ১০৬টি গতবার জিতেছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এটিই সেই আপাত-বিরোধিতা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, যেখানে তুলনামূলকভাবে সামান্য ভোটের ব্যবধানও ভূমিধসের মতো আসন বদলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভারতের বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় ব্লগার ধ্রুব রাঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এ সংক্রান্ত একটি পোস্টে লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরা কোনো ‘মৃত ব্যক্তি’ বা ‘বাংলাদেশি’ ছিলেন না। এরা ছিলেন সত্যিকারের মানুষ, যাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আগেই আবেদন করেছিলেন। এই ভোটারদের আবেদনের শুনানি ট্রাইব্যুনাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন স্থগিত রাখতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। এই নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব পর্যন্ত সময়মতো মাত্র প্রায় ১৬০৭ জন ভোটারের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুনানি হওয়া প্রায় প্রতিটি আবেদনই অন্যায়ভাবে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেকোনো কার্যকর গণতন্ত্রে, যেখানে বিপুল সংখ্যক ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন, সেটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলে গণ্য করা যায় না। আমি বলছি না যে, তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ফিরিয়ে দেওয়া হলে তারা নিশ্চিতভাবে জিতে যেত, হয়তো বিজেপিও জিততে পারত, কিন্তু প্রশ্নটা এই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন একটি বিস্তৃত পরিসর। দিল্লি-মহারাষ্ট্র-বিহার-বাংলার পর থেকে এই পরিসরের কাঁটাটি ক্রমশই অন্যায্যতার দিকে ঝুঁকেছে। প্রতিবারই বিরোধী দলগুলো কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যথারীতি অংশগ্রহণ করে, এই ভেবে যে নির্বাচন কমিশন, ইডি, সিবিআই ইত্যাদির আপোস সত্ত্বেও তারা জয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর প্রতিবারই তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কোন পর্যায়ে গিয়ে তারা অনুভব করবে যে, এই অন্যায়ের মাত্রা এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন বর্জন করা উচিত? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ওই ২৭ লক্ষ আপিলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিএমসি’র এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো উচিত ছিল।

হয়তো অতি আত্মবিশ্বাস কিংবা মুসলিমদের নিয়ে ভোটের ফাঁকা রাজনীতির গ্যাড়াকলে তিনি আটকে গিয়েছেন। সে আলোচনায় আজ যাব না। তবে উল্লিখিত দুটি বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই ৯১ লক্ষ বাদ পড়া ভোটার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় বা যাকে তারা হিন্দুত্ববাদের উত্থান বলে দাবি করছে, তা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এটা শুভেন্দু অধিকারী থেকে কেন্দ্রীয় বিজেপি পর্যন্ত জানে। তারা এটাও জানে, এই ৯১ লক্ষ মানুষ পুনরায় ভোটাধিকার পেলে বিজেপিকে আবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে গৈরিক পতাকা গোটাতে হবে। সে কারণে তারা কখনোই এই ৯১ লক্ষ ভোটারকে পুনরায় ভারতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে দেবে না। হয়তো নানা ঘষামাজার মাধ্যমে বা আদালতের নির্দেশে কিছু মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিলেও সংখ্যা খুব বেশি হবে না। ফলে এই জনগণের ব্যাপারে বিজেপিকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের হাতে একটাই অপশন আছে, বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া। ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ নির্দিষ্ট ক্যাম্পে আটকে রেখে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অনুপস্থিতির সময়ে বাংলাদেশে ঠেলেদেয়ার যে কৌশলের কথা আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা বর্ণনা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকেও হয়তো সেই রাস্তায় যেতে হতে পারে। কিংবা তারা যখন জানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে পারেনি, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে পারেনি, অপ্রিয় হলেও বলা ভালো এই মুহূর্তে ফেরানোর সক্ষমতা নেই, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সার্বিক দুর্বলতা ও খুঁটিনাটি যখন তাদের কাছে দিনের আলোর মত প্রতিভাত তখন রাতের অন্ধকারে কেন, দিনের আলোতেই তারা ঠেলে দিতে সক্ষম এবং সে পথেও এগোতে পারে। অথবা এটাকে কার্ড হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা অনিবার্য ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। এটা ঘটবেই কাল অথবা আরেকটু পর। তাই বাংলাদেশকে এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই তার নিজের পথ ও পন্থা নির্ধারণ করে নিতে হবে।

লেখক :  সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।

Exit mobile version