পাকিস্তানকে কাছে টেনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক কৌশল ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কূটনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। এমনটাই মনে করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের পরবর্তী সময়ে নতুন সরকার আঞ্চলিক কূটনীতিতে আরও বেশি স্বাধীনতা ও কৌশলগত পরিসর তৈরির চেষ্টাসহ ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান করে নিতে চাইছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের নতুন এই কৌশল ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলেও মনে করেছেন তারা।
বৃহস্পতিবার ( ২৮ মে )হংকং-ভিত্তিক প্রভাবশালী ইংরেজি সংবাদপত্র সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, বহু বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সেই সাথে সমর্থন ও আঞ্চলিক দিকনির্দেশনার উৎস হিসেবে বিবেচিত ছিলো। এখন তাদের মধ্যে কয়েকজন পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ; এই প্রতীকী পরিবর্তনটি ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং ঢাকার নতুন সরকার তার প্রতিবেশীদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে চায়, তার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
১২ জন ঊর্ধ্বতন বাংলাদেশী কর্মকর্তার একটি প্রতিনিধিদল গত ৪ থেকে ২১ মে পর্যন্ত লাহোরের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে একটি নির্বাহী প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে বছরের পর বছর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে আরও কূটনৈতিক ভাবে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। আর এই পদক্ষেপ তারই প্রতিফলন।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে, বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ প্রভাবের দিকে, যা নিয়ে দিল্লি আশঙ্কা করছে যে এটি তার পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
ভারতীয় পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, অল্প সংখ্যক কর্মকর্তাই পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, অপরদিকে দিল্লি ই-গভর্নেন্স, জননীতি এবং শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক বাংলাদেশী প্রতিনিধিদলকে আতিথেয়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে।
একই সময়ে, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে চলা উত্তেজনার পর তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন, যা ছিল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর ঢাকায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে প্রথম উচ্চ-পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠক।
ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, বাংলাদেশ সরকার এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, হাসিনার নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সুদৃঢ় সম্পর্ক থাকলেও, একটি ‘আবেগঘন দিক’ ছিল। তবে পারস্পরিক লাভজনক চুক্তি নিশ্চিত করতে ঢাকা এখন আরও বেশি ব্যবসায়িক মনোভাবাপন্ন হতে পারে।
উভয় দেশ পর্যায়ক্রমে ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করেছে। ভারত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে জরুরি জ্বালানি সহায়তাও প্রদান করেছে; ইরান যুদ্ধ সংকটের মধ্যে ঢাকাকে তীব্র জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় সাহায্য করার জন্য অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছের
তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে কাজ করতে চায়। এ নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই।
বাংলাদেশী কর্মকর্তারা উপলব্ধি করেন যে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তাদের ভারতের সমর্থন প্রয়োজন। ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং তীব্র মুদ্রাস্ফীতির মতো বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে বাংলাদেশ, যা জ্বালানি ও সারের আকাশছোঁয়া দামের কারণে আরও তীব্র হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর অভাব রয়েছে।
দত্তের মতে, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল এবং সে কারণেই ঢাকার নতুন প্রশাসন বেসামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি নিয়ে এগিয়ে যায়, কারণ তারা এ ধরনের সহযোগিতায় কোনো ক্ষতি দেখেনি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মতো বাংলাদেশের নীতিগত পদক্ষেপগুলোর অর্থ এই নয় যে, দেশটি ভুলে গেছে কীভাবে সে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েক দশকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করেছিল।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে লেখালেখি করেন এমন লন্ডন-ভিত্তিক লেখক প্রিয়জিৎ দেবসরকার উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে দুই ধরনের ব্যাপক মতামতের ধারা বিদ্যমান: একটি রক্ষণশীল, যা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এবং অন্যটি ইসলামি মৌলবাদীদের দিকে ঝুঁকে থাকা, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে গভীরতর সহযোগিতা চায়।
তিনি বলেন, পরবর্তীজন একটি ইসলামী উমার ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন, যার অর্থ ছিল পাকিস্তানি নেতৃত্বের অধীনে বিভিন্ন দেশের একটি বিন্যাস।
“তবে, এটি দেশটির জন্য একটি খুবই জটিল বিষয়, কারণ সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের সময়কার জ্বালানি সংকট কিংবা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে সাহায্যের ক্ষেত্রে ভারতই বাংলাদেশের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল,” দেবসরকার বলেন।
ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্রের মতে, ঢাকার নতুন কর্মপন্থা ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি দেশের আমূল পরিবর্তনের পরিবর্তে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চায়।
“হাসিনা আমলের পর নতুন সরকার নিজেদের জন্য আরও কূটনৈতিক পরিসর তৈরি করার চেষ্টা করছে। এর অর্থ হলো চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দৃশ্যমান যোগাযোগ স্থাপন বলে মনে করেন তিনি।
চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশ তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কাছে সাহায্য চেয়েছে। এই নদীটি শিলিগুড়ি করিডোরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত একটি সরু ভূখণ্ড এবং এটি ভারতের প্রত্যন্ত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের এই উদ্যোগ ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াতে বাধ্য।
“এখন উদ্বেগ হলো যে, ঢাকা দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের জন্য চীন ও পাকিস্তানকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে,” চন্দ্র বলেন। “ভারতের স্পষ্টতই একটি নতুন বাংলাদেশ নীতি প্রয়োজন, যা কোনো দল বা রাজনীতিবিদের ওপর কম নির্ভরশীল হবে এবং একই সাথে বাংলাদেশের জনমতের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হবে।”
চন্দ্রের মতে, ঢাকার নতুন প্রশাসন সীমান্ত, পানি বণ্টন এবং ভারতে হাসিনার উপস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে জনসমক্ষে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে; তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতেই বসবাস করছেন।
তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, ভূগোল, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সংযোগ এখনও বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, স্বাভাবিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পারস্পরিক সংযোগ এবং সংক্ষিপ্ত পরিবহন পথের কারণে ভারত থেকে পণ্য সংগ্রহ ও তার সঙ্গে বাণিজ্য অত্যন্ত কার্যকর এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য, যেমন পেঁয়াজ, গম ও চালের জন্য, এবং সেইসাথে তার ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক খাতের জন্য কাঁচা তুলা ও সুতার সরবরাহের জন্য ভারতের উপর নির্ভর করে আসছে।
উৎস: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ( ২৮ মে ২০২৬ )
