২০২৬ সালের মার্চ মাসের ১৩ তারিখ, কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে আটক করা হয় মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ ভ্যানডাইক নামের এক ব্যক্তিকে। একই সময়ে ভারতের অপর দুইটি বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় আরো ছয় জনকে। তারা প্রত্যেকেই ইউক্রেনীয় নাগরিক। উত্তরপ্রদেশের লখনউ বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সহায়তায় গ্রেফতার হন ৩ জন এবং দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন বাকি তিনজন।
আটক এ ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের নাম হচ্ছে, পেট্রো হুরবা (Hurba Petro), তারাস স্লিভিয়াক (Slyviak Taras), ইভান সুকমানভস্কি (Ivan Sukmanovskyi), মারিয়ান স্টেফানকিভ (Stefankiv Marian), ম্যাক্সিম হনচারুক (Honcharuk Maksim) ও ভিক্টর কামিনস্কি (Kaminskyi Viktor)। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ (NIA) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যম যেমন আনন্দবাজার ও হিন্দুস্তান টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, আটককৃত এই ইউক্রেনীয় নাগরিকদের পরিচয় অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং উচ্চ সামরিক দক্ষতাসম্পন্ন।
ভারতীয়দের দাবি আটক ইউক্রেনীয় নাগরিক সকলেই সাবেক সামরিক বিশেষজ্ঞ (Ex-Military Personnel)। তারা মূলত ইউক্রেনের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা বা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে এদের সম্মুখ সমরে ড্রোন পরিচালনা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল। তারা ভাড়াটে সেনা ও প্রযুক্তিবিদ (Mercenaries & Technicians) ম্যাথিউ ভ্যানডাইকের বেসরকারি মার্সেনারি ও নিরাপত্তা সংস্থা ‘সন্স অফ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল’ (SOLI)-এর বেতনভুক্ত মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষক এবং প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তারা কাজ করছিলেন।
অন্যদিকে মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইক (Matthew Aaron VanDyke) আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক, ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার, এবং ‘সন্স অফ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল (SOLI)’ নামক একটি বেসরকারি সামরিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ, আইএসিস-এর বিরুদ্ধে ইরাক ও ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ইউক্রেনীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর তার কর্মকাণ্ড রুশ সরকারের নজরদারিতে আসে। পরবর্তীকালে রাশিয়ার দেয়া তথ্য মোতাবেক ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা কলকাতা বিমানবন্দরে ফাঁদ পেতে তাকে আটক করে। ভারতীয় মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, এই চক্রটি সম্পর্কে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা থেকে একটি গোপন তথ্য (Tip-off) ভারতকে দেওয়া হয়েছিল। NIA-র তদন্ত অনুযায়ী তাঁরা মোট ১৪ জন ইউক্রেনীয়ের একটি বৃহত্তর দলের অংশ ছিলেন, যাঁরা পৃথক পৃথক তারিখে পর্যটক ভিসায় ভারতে প্রবেশ করে গুয়াহাটি হয়ে মিজোরামে যান। তাদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পরীক্ষা করে নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের খোঁজ করা হচ্ছে।
ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইক এবং ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিক একটি পরিকল্পিত নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন। তারা পর্যটক ভিসায় ভারতে প্রবেশ করে গুয়াহাটি হয়ে বিহিত অনুমতি (Restricted Area Permit) ছাড়াই মিজোরামে যান এবং সেখান থেকে মিয়ানমারের চিন রাজ্যে (Chin State) অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেন। সেখানে তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী (Ethnic Armed Organizations – EAOs)-কে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেন। পাশাপাশি, তারা ভারতের নিষিদ্ধ ঘোষিত কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকেও অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ সরবরাহের সাথে জড়িত ছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে ভারতীয় গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে ভারতের মার্কিন দূতাবাস গণমাধ্যমকে ঘটনা সম্পর্কে “অবগত” বলে জানিয়েছে কিন্তু গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। ইউক্রেন সরকার তাদের নাগরিকদের জড়িত থাকার প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কথা জানিয়ে কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছে ও ভারতীয় ও রুশ কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনকে “বিকৃত ব্যাখ্যা” বলে সমালোচনা করে নিজেদের নাগরিকদের মুক্তি দাবি করেছে। ইউক্রেন সরকার তাদের ৬ জন নাগরিক আটকের বিষয়ে ভারতের কাছে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। এনআইএ ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর আইন UAPA-এর ধারা ১৮ (সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র), বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং বেআইনি অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার এখন চলমান প্রক্রিয়া।
এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব অনুভাবের অনুধাবনের জন্য প্রথমেই ভ্যানডাইক ও তার সাথে আটক ছয় ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিস্তারিত পরিচয় জেনে নেয়া প্রয়োজন। ৪৬ বছর বয়সী আমেরিকান নাগরিক ম্যাথিউ ভ্যানডাইক (Matthew VanDyke)-এর অতীত রেকর্ড বেশ বৈচিত্র্যময় ও বিতর্কিত। জন্ম ১১ জুন ১৯৭৯, বাল্টিমোর, মেরিল্যান্ড। University of Maryland, Baltimore County (UMBC) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক এবং জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি থেকে ‘সিকিউরিটি স্টাডিজ’-এ মাস্টার্স করেন। নিজেকে তিনি একাধারে “ফ্রিডম ফাইটার” (স্বাধীনতাসংগ্রামী), ডকুমেন্টারি নির্মাতা, যুদ্ধ সংবাদদাতা এবং সিকিউরিটি কনসালট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।
তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে তিনি মূলত একজন “ভাড়াটে সৈনিক” (Mercenary) বা প্রাইভেট মিলিটারি ট্রেইনার হিসেবেই পরিচিত। । শিক্ষাজীবন শেষ করে ভ্যানডাইক মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘সিআইএ’-তে অপারেটিভ (গোপন এজেন্ট) পদের জন্য আবেদন করেছিলেন। তিনি সাইকোলজিক্যাল এবং ড্রাগ টেস্ট পাস করলেও শেষ ধাপে পলিগ্রাফ বা ‘লাই ডিটেক্টর’ (Lie Detector) টেস্টে অনুত্তীর্ণ হন, যার ফলে সিআইএ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়নি। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, ভ্যানডাইক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ওয়াশিংটনের হয়ে অফ-দ্য-রেকর্ড বা অনানুষ্ঠানিক প্রক্সি মিশন (Proxy Mission) পরিচালনা করে থাকেন, যদিও তিনি নিজে এই দাবি বরাবরই অস্বীকার করেছেন। পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাইরে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার পথ বেছে নেন। ২০০৯ সালে ইরাকে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে embedded war correspondent হিসেবে ছিলেন (দ্য বাল্টিমোর একজামিনার পত্রিকার হয়ে)।
তবে ম্যাথিউ ভ্যানডাইকের এই লাইফস্টাইলের সূচনা হয় ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তিনি চোরাপথে লিবিয়ায় প্রবেশ করেন এবং গাদ্দাফিবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হয়ে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ শুরু করেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে গাদ্দাফি বাহিনীর অ্যাম্বুশে তিনি গুলিবিদ্ধ ও বন্দি হন। লিবিয়ার কুখ্যাত ‘আবু সেলিম’ কারাগারে প্রায় সাড়ে ৫ মাস তাঁকে নির্জন কারাবাসে (Solitary Confinement) রাখা হয়েছিল। পরে বিদ্রোহীরা কারাগারের তালা ভেঙে তাঁকে মুক্ত করলে তিনি আবারও অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যোগ দেন এবং গাদ্দাফি সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত লিবিয়া ছাড়েননি। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে বিখ্যাত ‘পয়েন্ট অ্যান্ড শুট’ (Point and Shoot) নামক একটি তথ্যচিত্র তৈরি হয়।
ভ্যানডাইক লিবিয়া থেকে ফিরে ২০১২ সালে তিনি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে তিনি বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত সিরিয়ান বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য ডকুমেন্টারি তৈরি শুরু করেন। কিন্তু কেবল ক্যামেরার পেছনে না থেকে তিনি লিবিয়া যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের কৌশলগত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন।
২০১৪ সালে ভ্যানডাইক Sons of Liberty International (SOLI) নামের একটি বিতর্কিত ও ব্যতিক্রমী অলাভজনক (Non-profit) প্রাইভেট মিলিটারি কোম্পানি গড়ে তোলেন। এই সংস্থার লক্ষ্য ছিল—বিশ্বের যেসব প্রান্তে সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সন্ত্রাসী বা স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তাদের “বিনা মূল্যে” সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পরামর্শ দেওয়া। এর অংশ হিসেবে তিনি ২০১৫ সালে ইরাকে খ্রিষ্টান মিলিশিয়াদের প্রশিক্ষণ দেন। SOLI প্রতিষ্ঠার পর ভ্যানডাইক তাঁর প্রথম বড় মিশন পরিচালনা করেন ইরাকে। সেখানে কুখ্যাত জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসআইএস (ISIS)-এর হাত থেকে নিজেদের গ্রাম রক্ষা করতে লড়ছিল স্থানীয় খ্রিষ্টানদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, যার নাম ছিল ‘নিনেভে প্লেইন ফোর্সেস’ (Nineveh Plain Forces – NPF)। ভ্যানডাইক ও তাঁর প্রশিক্ষক দল ইরাকে গিয়ে এই খ্রিষ্টান মিলিশিয়া বাহিনীকে আধুনিক গেরিলা যুদ্ধ, অস্ত্র চালনা এবং ট্যাক্টিক্যাল অপারেশনের ওপর ব্যাপক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ শোরগোল ফেলেছিল।
তিনি ইরাক থেকে ফিরে ২০২২ সালে পুরোদমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই (প্রায় ২০২০ সাল থেকে) ভ্যানডাইক ইউক্রেনের লজিস্টিক সাপোর্টের সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালের পর থেকে তিনি ও তাঁর সংস্থা SOLI সরাসরি ইউক্রেনে ঘাঁটি গারে। সেখানে ইউক্রেনীয় ফ্রন্টলাইন সেনাদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অ্যাডভান্সড ড্রোন অপারেশন, অ্যান্টি-ড্রোন জ্যামিং প্রযুক্তি এবং স্নাইপার ট্রেনিং দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কলকাতা বিমানবন্দরে তাঁর সাথে যে ৬ জন ইউক্রেনীয় সেনা আটক হয়েছিল, তারা মূলত ইউক্রেনের এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই ভ্যানডাইকের সাথে যুক্ত হয়েছিল।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।
