parbattanews

‘পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন’ কবে হবে?

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একাংশের সশস্ত্র নেতা সন্তু লারমার সাথে চরম গোপনীয়তায় সই হয়েছিল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’। দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে ২৯ বছরে পদার্পণ করা এই চুক্তিটি আজকের দিনে পাহাড়ের আপামর জনগণের জন্য টেকসই কোনো শান্তির বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। বরং আইনি ও সামাজিক বাস্তবতায় এটি একটি ‘বৈষম্য দলিল’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তি করা হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ, এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাংশের সাথে রাষ্ট্রের একপেশে ও চরম একচেটিয়া বোঝাপড়া।

পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য ডজনখানেক অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতামত ও অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই অসম চুক্তি প্রণীত হয়েছিল। একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি না থাকার ফলেই আজ পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষা, সংবিধানের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব সমুন্নত রাখা এবং পাহাড়ে বসবাসকারী সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে এই পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা আজ কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং একটি অনিবার্য রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক কর্তব্য।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ১ম অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে—”বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র।” এই এক এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মূল নির্যাস হলো, দেশে কোনো পৃথক আইনগত স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক দ্বৈত শাসনের সুযোগ থাকবে না। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ’ এবং এর অধীনস্থ ৩টি জেলা পরিষদের আইনি কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি দেশের মূল প্রশাসনিক ধারার বাইরে গিয়ে একটি সমান্তরাল উপ-রাষ্ট্রীয় বা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত তাত্ত্বিক ও আইনি বিশ্লেষণে এই সংকটকে “একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো” হিসেবে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দ্বৈত কাঠামোর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ‘জাতীয় সংসদ’-এর সার্বভৌমত্ব ও একছত্র ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ যদি সমগ্র দেশের জন্য বা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করতে চায়, তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পূর্বাহ্নে পরামর্শ ও অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি কোনো আইন পাস হওয়ার পর জেলা পরিষদ যদি সেটিকে ‘আপত্তিকর’ বা ‘কষ্টকর’ মনে করে আপত্তি তোলে, তবে কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করতে বাধ্য থাকবে। জাতীয় সংসদের সম্মিলিত মেধার ওপর একটি আঞ্চলিক পরিষদের এই ভেটো প্রদানের আইনি ক্ষমতা কোনো স্বাধীন ও একক রাষ্ট্রে চলতে পারে না। এটি জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নিদারুণ অবমাননা।

পাশাপাশি, এই দ্বৈত কাঠামো মাঠ পর্যায়ের সাধারণ প্রশাসনের প্রচলিত চেইন অব কমান্ডকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কিংবা বিভাগীয় কমিশনার সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন এবং রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনের মাধ্যমে সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এক দেশে দুটি ভিন্ন প্রশাসনিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যা মাঠ প্রশাসনকে স্থবির এবং দেশের অখণ্ড শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে মারাত্মক দুর্বল করে তুলছে।

পার্বত্য চুক্তির কারণে সবচেয়ে বড় মানবিক ও আইনি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে পাহাড়ের বিশাল বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী। সংবিধানে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমান নাগরিক অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তি ও আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বাঙালিরা আজ নিজ দেশেই এক অদৃশ্য বর্ণবাদের শিকার হয়ে ‘দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে’ পরিণত হয়েছেন। পার্বত্য নিউজে প্রকাশিত “পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্যের স্বরূপ ও উত্তোরণ” নিবন্ধে এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের চোখে সমতা), অনুচ্ছেদ ২৮ (ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্যহীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ২৯ (প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সুযোগের সমতা)—এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি পদদলিত করা হয়েছে।

ভোটাধিকার ও স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত: সংবিধানে বাংলাদেশের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটার হওয়ার স্পষ্ট অধিকার থাকলেও, পাহাড়ে ভোটার হতে হলে ‘পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা’ হওয়ার অতিরিক্ত শর্ত চাপানো হয়েছে। আর একজন বাঙালির ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার অন্যতম শর্ত হলো—তাকে ওই অঞ্চলে জমির মালিক হতে হবে।

জমির মালিকানা ও স্বাধীন চলাচলের অধিকার হরণ: সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সর্বত্র অবাধ চলাচল, বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং ৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যেকোনো জেলার উপজাতীয় নাগরিক ঢাকা, চট্টগ্রাম বা দেশের যেকোনো প্রান্তে জমি কিনে স্বাধীনভাবে বসবাস ও ব্যবসা করতে পারলেও, দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের সাধারণ বাঙালি নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি কিনতে বা স্বাধীনভাবে বসতি স্থাপন করতে পারেন না।

চাকরিতে চরম বৈষম্য: আইন করে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্থানীয় চাকরিতে উপজাতীয়রা একচেটিয়া অগ্রাধিকার পাবে। এর ফলে যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারের শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।

পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের শীর্ষতম পদ বা ‘চেয়ারম্যান’ পদগুলোসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরপদ আইন করে শুধুমাত্র উপজাতীয়দের জন্য চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর পদটিও উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আইনি বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির একছত্র সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপের শামিল। যা সংবিধান লঙ্ঘণই।

বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলায় বাংলাভাষী বাঙালিরা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি। অথচ এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলো তাদের নিজস্ব অঞ্চলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, আইনের এমন নির্লজ্জ ও জঘন্য বর্ণবৈষম্যমূলক ধারা রয়েছে যে, কোনো পরিষদের সভায় উপজাতীয় চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে, উপস্থিত সকল বাঙালি সদস্য একমত হলেও কোনো বাঙালি সদস্য ওই সভায় সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। এই ধরনের শাসনতান্ত্রিক বৈষম্য অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধুনালুপ্ত শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবৈষম্য কিংবা প্রাচীন রোমের দাস প্রথার নিষ্ঠুর সামাজিক বিভাজনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বর্তমান সময়ের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত “পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা প্রয়োজন” প্রবন্ধে এই নিরাপত্তা ও কৌশলগত ঝুঁকির বিষয়টি সুতীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। ভারত এবং মায়ানমারের সংলগ্ন তিনদেশীয় সীমান্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এই এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িত।

চুক্তির ১৭(ক) ধারা অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো (প্রায় আড়াইশ) পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের নির্দিষ্ট ৬টি স্থায়ী ব্যারাকে সীমাবদ্ধ রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড যেখানে প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর (যেমন- জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ, মগ লিবারেশন পার্টি) অবৈধ অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, গহিন অরণ্যে মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং ভূ-কৌশলগত ষড়যন্ত্রের শিকার, সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম সুরক্ষাকারী সেনাবাহিনীর হাত-পা এভাবে বেঁধে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক আত্মঘাতী নীতি। এই প্রত্যাহার নীতির কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতায় পাহাড়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও সমান্তরাল কর ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ পেয়েছে। দেশের অখণ্ডতা এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই আত্মঘাতী ক্যাম্প প্রত্যাহার নীতির আমূল সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্প্রতিষ্ঠা করা আজ সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি—বর্তমান দেশের সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলই দেশের সার্বভৌমত্ব এবং পাহাড়ের সুশাসন বজায় রাখতে পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল।

বিএনপি তাদের অফিশিয়াল নির্বাচনী ইশতেহারের ২০২৬-এর পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী উপশিরোনামের অধীনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জাতির সামনে ঘোষণা করেছিল। জানিয়েছিল- সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

একই সাথে তারা পাহাড়ে সক্রিয় সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর অবৈধ অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থান এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ‘সোশ্যাল রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’ বা সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামীও তাদের নির্বাচনী বক্তব্যে পাহাড়ের সকল নাগরিকের বৈষম্যহীন সাংবিধানিক অধিকার এবং ভূমি অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে এই চুক্তির একপেশে ধারাগুলোর সংশোধনের পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেছিল।

দেশের দুই বৃহৎ দলই নির্বাচনের আগে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কারণ তারা বোঝে—পাহাড়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে এবং সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কখনো টেকসই ও প্রকৃত শান্তি আসতে পারে না। আজ তারা যথাক্রমে সরকারে এবং প্রধান বিরোধী দলে অধিষ্ঠিত। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে দেওয়া এই অঙ্গীকার পূরণ করার উপযুক্ত সময় এখনই।

আজকের সরকারি দল বিএনপি যখন ১৯৯৭ সালে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল ছিল, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি এই কালো চুক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে এবং সংসদে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৯৯৮ সালের ১২ মে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক ভাষণ ও তথ্যবহুল দলিল পেশ করেছিলেন, তা আজ পার্বত্য চুক্তির সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও আইনি দলিল।

তৎকালীন সময়ে এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি সুনির্দিষ্ট ১৮টি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, যা আজও সমভাবে সত্য এবং প্রাসঙ্গিক। সেই ১৮ দফার মূল নির্যাসসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:

সার্বভৌমত্ব বিসর্জন: এই চুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল হতে স্বাধীন সার্বভৌম এককেন্দ্রিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে এবং স্বাধীনতার সংকট সৃষ্টি করেছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবৃক্ষ: চুক্তির মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘বিষবৃক্ষ’ রোপিত হয়েছে, যা দেশের অখণ্ডতা খণ্ডবিখণ্ড করার দ্বার উন্মুক্ত করবে।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন: সামগ্রিক চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।

১ম ধারার পরিপন্থী: সংবিধানের ১নং ধারায় বাংলাদেশকে একটি একক রাষ্ট্র বলা হলেও চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের মাধ্যমে পৃথক আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা ১নং ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সমান্তরাল সরকার গঠন: সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রী নিয়োগ বা সমান্তরাল নির্বাহী পরিষদ গঠনের সুযোগ না থাকলেও চুক্তির মাধ্যমে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিপরীতে একটি ‘পাল্টা বা সমান্তরাল সরকার’ গঠন করা হয়েছে।

পাল্টা বৈষম্য সৃষ্টি: অনগ্রসর শ্রেণীর উন্নয়নের নামে এই চুক্তি পাহাড়ে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর এক ধরনের ‘পাল্টা বৈষম্য’ চাপিয়ে দিয়েছে, যা সংবিধানের ২৯ নং ধারার পরিপন্থী।

সংসদের ক্ষমতা খর্ব: চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের ১৩ ধারার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা খর্ব করার সুস্পষ্ট চক্রান্ত করা হয়েছে।

চলাফেরার অধিকার হরণ: চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের ২৬ নং পংক্তি সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকদের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা ও বসতি স্থাপনের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩৬) লঙ্ঘন করেছে।

সম্পত্তির অধিকার খর্ব: সংবিধানের ৪২(১) ধারার অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন ও ধারণের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, চুক্তির ২৬ নং পংক্তি তা খর্ব করেছে।

ভূমির ক্ষমতা সমর্পণ: ভূমি বন্দোবস্ত, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইজারা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে আঞ্চলিক পরিষদের হাতে সমর্পণ করে সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে।

বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককরণ: পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাভাষী নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করে তাদের নিজ ভূখণ্ডে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।

প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি: জেলা প্রশাসকের পদ বিলুপ্তি ও কমিশনারের ক্ষমতা সীমিত করে সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও পুলিশ বাহিনীকে সরকারের অধীনে না রেখে বস্তুত পার্বত্য পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করায় এক দেশে দুটি ভিন্ন ও জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপর শর্ত: উপজাতীয় মন্ত্রী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ সংক্রান্ত একছত্র ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন: সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চলাচল সীমিতকরণ এবং তাদেরকে পরোক্ষভাবে পার্বত্য পরিষদের অধীনস্থকরণের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও দায়িত্ব পালনের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

বনাঞ্চল ও সরকারি স্বার্থ ত্যাগ: এ অঞ্চলের প্রোটেকটেড বনাঞ্চলসহ বহু জমির ওপর সরকারের অধিকার প্রত্যাহার করে সমগ্র দেশের জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আয় সংকুচিতকরণ: নানা ধরনের ট্যাক্স, খাজনা, টোল আদায়ের ক্ষমতা এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের লাভের কমিশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজকোষের আয় সংকুচিত করেছে।

সহিংসতাবাদীদের পুরস্কার বনাম নিরীহদের অবহেলা: সরকার শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী ও সহিংসতাবাদীদের নগদ অর্থ, জমি, ঋণ মওকুফ ও মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছে; পক্ষান্তরে শান্তিবাহিনীর বর্বর হামলায় নিহত ২০ হাজার নিরীহ বাঙালির স্বজনদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি।

সরকারি ক্ষমতা সমর্পণ: পরিষদের সাথে আলোচনা ছাড়া জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার নিজস্ব ক্ষমতা একটি আঞ্চলিক পরিষদের কাছে সমর্পণ করেছে।

বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সেই ভাষণে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রজ্ঞার উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, এরশাদ আমলে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে দেশের একক চরিত্র নষ্টকারী হাইকোর্ট বিভাজনের সংশোধনী (অষ্টম সংশোধনী) বাতিল করেছিল, ঠিক একই কারণে দেশের এককেন্দ্রিক চরিত্র ধ্বংসকারী এই আঞ্চলিক পরিষদ গঠনও সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক।

আজ ইতিহাসের এক মহাবর্তে দাঁড়িয়ে ১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক বিরোধী দল বিএনপি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। দেশের তরুণ সমাজ, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ সমগ্র দেশবাসী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং পাহাড়ের আপামর শোষিত ও বঞ্চিত জনগণ বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জননেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও একপেশে চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর দল বিএনপি যে অটল, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক অবস্থান নিয়েছিল—আজ ক্ষমতায় এসে বর্তমান সময়ের বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই ঐতিহাসিক অবস্থান ধারণ করে এই কালো চুক্তির আমূল সংস্কার করবেন, নাকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক নীতিকেই নীরবে মেনে নেবেন?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং ফ্যাসিবাদের তৈরি করা সকল প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পার্বত্য চুক্তি সংস্কারের বিষয়টিও ঠিক একইভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সুগভীর পরীক্ষা। ১৯৯৮ সালের বিএনপির সেই ঐতিহাসিক ১৮ দফা অভিযোগ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণের প্রতিটি শব্দ আজ বর্তমান সরকারের জন্য এক অবিকল্প গাইডলাইন।

তখনকার সময়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছিল, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেই অবস্থানে কেবল অটুট থাকলেই চলবে না, বরং নির্বাচনের আগে দেওয়া তাঁর দলের নিজস্ব ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী “সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার” করার বাস্তবমুখী ও সাহসী পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

স্থায়ী শান্তি বৈষম্যহীন নতুন পাহাড়ের রূপরেখা: একটি ঐতিহাসিক ভুলকে যুগ যুগ ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া কোনো দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক সরকারের কাজ হতে পারে না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিটি পাহাড়ের শান্তির নামে মূলত বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ বপন করেছিল, যা আজ প্রমাণিত। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাই সমাধান কোনো একপেশে নীতিতে নেই; সমাধান রয়েছে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের পূর্ণ প্রতিফলনে। পার্বত্য চুক্তিকে কোনো অপরিবর্তনীয় অলঙ্ঘনীয় ঐশি দলিল না ভেবে, দেশের অখণ্ডতা রক্ষার্থে অবিলম্বে এর বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ধারাগুলো সংস্কার করতে হবে। পাহাড়ের সকল নাগরিকের জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার, সমান ভোটাধিকার, বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান এবং অবাধ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, জাতিগত সম্প্রীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেই ঐতিহাসিক স্লোগানকে ধারণ করে আজ আমাদের আবারও বলতে হবে—জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় “বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও” এবং পবিত্র সংবিধানের আলোকেই পাহাড়ের সুশাসন নিশ্চিত করো।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক (পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)।

 

 

 

 

Exit mobile version