বাংলাদেশের অন্যতম পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে কুহালং হেডম্যান পাড়া গ্রামের প্রুনুমং মারমা। ইউএনডিপির চাকরি ছেড়ে যিনি মনোনিবশে করেছেন ড্রাগন চাষে। নিজের এলাকা পাহাড়ি ভূমিতে গড়ে তুলেছেন ড্রাগনের বিশাল বাগান। এই বাগান থেকে প্রতি মাসে আয় করছেন চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। একই সাথে তিনি তার বাগানে ১০ থেকে ১৫ জন লোকের কর্ম সংস্থান করেছেন।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ির মংমং সিং মারমা কিংবা সদর উপজেলার প্রুনু মং মারমার মতো অনেকেই পার্বত্য এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেছেন এবং তারা সফল হচ্ছে। এরই মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার ন্যায় পার্বত্যাঞ্চলেও ড্রাগন ফল চাষের বেশ সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাগণ। এখানকার উদ্যোক্তারা প্রথমে ইউটিউব দেখে চাষাবাদ শুরু করলেও তাদের উৎপাদিত এই লাল জাতের ড্রাগন এখন দেশ ও দেশের বাইরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, পাহাড়ে উৎপাদিত ড্রাগন দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে তুলনামূলক বেশি মিষ্টি ও সুস্বাদু।
কৃষি কর্মকর্তাগণ বলছেন, ড্রাগন মূলত মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রসিদ্ধ ফল। বিশেষ করে, মেক্সিকো ও ফ্লোরিডাতে এর ফলন হতো। পরবর্তীকালে, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ; তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এবং সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ এর চাষ শুরু হয়। এছাড়া উত্তর অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ চীনেও ড্রাগন পাওয়া যায়। এটি একটি ক্যাকটাস প্রজাতির গাছ।
ড্রাগন ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ডায়টেশিয়ানরা বলছেন, ড্রাগন রোগ প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী একটি ফল। ক্যারোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় ফলটি চোখের জন্য বেশ উপকারী। আঁশের পরিমাণ বেশি থাকায় হজমেও বেশ সহায়তা করে। এই ফলে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় শক্ত ও দাঁত মজবুত রাখে। রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে এবং ত্বক মসৃণ রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ড্রাগন ফল আয়রণ সমৃদ্ধ ফল বলেও পুষ্টিবিদগণ মনে করছেন।
তারা বলছেন, যাদের রক্তে আয়রণের ঘাটতি আছে তাদের জন্য এই ফলের কোনো তুলনা নেই। তাছাড়া ড্রাগন ফলের জুস, মিল্কশেক বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে। কাস্টার্ড, ফালুদা তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। স্বাস্থ্যকর রেসিপি হিসেবে টকদই, চিয়া-সিডস, ওটসের সাথে মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে। ড্রাগন ফল প্রচুর এন্টি অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজে ভরপুর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ বলছেন, একটু উঁচু ও উর্বর জমিতে এর ফলন ভালো হয়। তাই পার্বত্যাঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে ড্রাগন গাছ খাপ খেয়ে গেছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই এই বিদেশী ফলের চাষ হচ্ছে। যদিও এই ফলের আদিবাস এ ভূখন্ডে নয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম চাষের জন্য থ্যাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে বিভিন্ন জাতের ড্রাগন ফল আনা হয়। তার পর থেকে ড্রাগন বাংলাদেশে ড্রাগন চাষ শুরু হয় এবং এখন এই ফল এবং ফলের চাষ উভয়ই জনপ্রিয় হচ্ছে।
পাহাড়ের ড্রাগন চাষীরা জানিয়েছেন, এই ফলের উৎপাদন, সংগ্রহ, প্যাকেজিং থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত- প্রতিটি স্তরে সরকারের অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তা পেলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এমনকি বিদেশেও পাহাড়ে উৎপাদিত সুস্বাদু ড্রাগন সরবরাহ ও রপ্তানি করা সম্ভব।
