parbattanews

পাহাড় ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে

এই প্রবন্ধের লেখক মেহেদী হাসান পলাশ।

আবারো পাহাড় ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। ভূ-রাজনৈতিক আঞ্চলিক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সূত্র, সমীকরণ এবং উপাদান ও উপকরণ বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এই অশান্তির মাত্রা দিন দিন বাড়তেই থাকবে এবং দ্রুত বাড়বে। এর কিছু কারণ স্থানীয়, কিছু কারণ জাতীয়, কিছু কারণ আঞ্চলিক এবং কিছু কারণ বৈশ্বিক। কিছু লেখা যায়, কিছু লেখা যায় না। তবে বোঝা যায়।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এটি বিশ্লেষণে যেমন এর অতীত প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় যোগাযোগ ও আপডেটগুলো এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি একসাথে মেলাতে না পারলে সঠিক অবস্থানে পৌঁছানো খুব কঠিন। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যারা কথা বলেন লেখালেখি করেন ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে আমি সেগুলো পর্যবেক্ষণ করি পড়ি এবং বোঝার চেষ্টা করি নিজের জানাকে সবসময় আরো সমৃদ্ধ করা, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঝালাই করা, নিজের ধারণাকে যাচাই করার চেষ্টা করি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় গণমাধ্যমে পাহাড় নিয়ে যারা লেখালেখি করেন এদের বেশির ভাগেরই উপরোক্ত তিনটি উপাদানের যেকোনো একটি বা দুটির ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে তাদের আলোচনা সঠিক গন্তব্যে, সঠিক লাইনে, সঠিক তথ্যে নির্ভরশীল হয়ে ওঠেনা। গতকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপক এর আলোচনা শুনছিলাম। ভদ্রলোকের নাম মাসুদ ইমরান। কথাটি না বলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু লজ্জিত ও ক্ষুব্ধতার সাথে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, এতটা মূর্খতা, এতটা অজ্ঞানতা নিয়ে একজন শিক্ষক ছাত্রদের সামনে লেকচার দিতে বসে আমার ভাবতে অবাক লাগে। পাহাড় নিয়ে বায়োসনেস অনেকেরই আছে। সেটা সহ্য করা যায় মানবিক কারণে। কিন্তু ক্লাসে শিক্ষকের মূর্খতা সহ্য করা কঠিন।

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবান সবসময়ই অপেক্ষাকৃত শান্তিপ্রিয় ছিল। এজন্য বান্দরবান কে বলা হত সম্প্রীতির বান্দরবান। কিন্তু কে এন এফ এর উত্থানের ফলে এই সম্প্রীতির বান্দরবানে অসম্প্রীতি ও অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। এর জন্য বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের কিছু নীতিকে আমি দায়ী করি। বিশেষ করে র‍্যাবের চুনকাম প্রজেক্ট। এটা চরম ভুল পলিসে ছিল যেটা শান্তির বান্দরবানকে অশান্তির দাবানলে পরিণত করেছে। কিন্তু হাসিনা আমলে সরকার যে ভুলটি করেছিল, এবারে সেই একই ভুল করলো কে এন এফ। তারা ইউ পিডিএফ এর সাথে মিত্রতা করে খাগড়াছড়ি থেকে ইউপিডিএফ কে টেনে নিয়ে গেছে বান্দরবানে। এখানেও থামেনি তারা যৌথভাবে আরাকান আর্মির সাথে গড়ে তুলেছে মিত্রতা। এই আন হলি মিত্রতার কারণে গতকাল আবার সেখানে রক্ত ঝরেছে। গতকাল রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী রেংত্লাং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী এবং কে এন এফ ও ইউ পি ডি এফ এর মধ্যে চলা সংঘর্ষে এই রক্তপাতের ঘটনা ঘটলো। বেশ কিছুদিন বিরতির পর এঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের আগামী দিনের নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার ইঙ্গিত করে।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাহাড়ের অন্য দুই জেলার চেয়ে বান্দরবানের চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা কেবল বিস্তীর্ণ দুর্গ পাহাড়ের কারণে নয়, একমাত্র এখানেই বসবাস করছে পাহাড়ের সবগুলো নৃগোষ্ঠী। এছাড়াও ট্রাইজংশন সীমান্ত সন্নিহিত হওয়া, মিয়ানমারে দুইটি রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ইনসার্জেন্ট গ্রুপের উপস্থিতি, বান্দরবানকে তাদের হিন্টারল্যান্ড হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহ ও চেষ্টা, বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটতা, ওপিয়াম চাষ, আরাকান আর্মির সক্রিয় উপস্থিতি প্রভৃতি ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মির সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিয়েছে সেখানকার নিরাপত্তা ধারণা।

৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিন পার্বত্য জেলা থেকে পরাজিত ও ফ্যাসিস্ট সহযোগী শক্তিরা সেভাবে আটক হয়নি। মাত্র একজন এমপি ঢাকায় আটক হয়েছেন। বাকিরা সবাই রহস্যজনকভাবে উধাও। তবে সে আমলে আরাকান আর্মির সাথে যে নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ছিল তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে, নিজ বাড়িতে। কেন তিনি নিজ বাড়িতে বহাল তবিয়তে থাকতে পারলেন সে রহস্য যেমন জানা যায়নি, তেমনি বান্দরবনে আরাকান আর্মির এই বাড়বাড়ন্ত এবং অস্থিরতার পিছনে তার কোন মদত রয়েছে কিনা সেটাও পরিষ্কার নয়।

বান্দরবান সীমান্তে মায়ানমারের দুইটি রাজ্য রয়েছে। একটি সীমান্তে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। বিদ্রোহী আরাকান আর্মির পুরোপুরি রাম রাজত্ব সেখানে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের তৎপরতাও দৃশ্যমান। এই দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি এবং আরাকান আর্মির উপর সরকারের বিমান হামলা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। গতকালও সেখানে মিয়ানমার আর্মির বিমান হামলায় কেঁপে উঠেছে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের জনপদ। অন্যদিকে চিন স্টেট সীমান্ত অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকলেও সম্প্রতি খুমি পিপলস ফ্রন্ট নামে এক নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তাদের সাথে আবার আরাকান আর্মির বিরোধ রয়েছে।

এদিকে প্রেসিডেন্ট শিজিংপিং যে বাংলাদেশ মিয়ানমার চায়না অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা ও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তার সম্ভাব্য দুইটা রুট এই বান্দরবান জেলার ভিতর দিয়েই সংযুক্ত হবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কনটেন্ট চায়না নীতি এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগী ভারতের মাথাব্যথা একসাথে মিলে আগামী দিনে বান্দরবান হতে চলেছে বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও রূপরেখা এবং রিম্যাপিং ধারণা মাথায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে না পারলে আগামী দিনে বাংলাদেশকে এই অঞ্চলে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

  • লেখক : চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ।
Exit mobile version