বাংলাদেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজারের প্রবেশ-দ্বার চকরিয়া উপজেলা ছিল একসময় জেলার বৃহত্তর উপজেলা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে তৎকালীন যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী,কক্সবাজার-১(চকরিয়া ও পেকুয়া) আসনের এমপি ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০২ সালের ২৭ এপ্রিল কক্সবাজারের বৃহত্তর উপজেলা চকরিয়াকে বিভক্ত করে “পেকুয়া উপজেলা” প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
২০০২ সালে পেকুয়ায় ইউনিয়ন ছিল ৫ টি।পেকুয়া সদর,বারবাকিয়া, রাজা খালী,মগনামা ও টৈটং ।পরে ২০০৩ সালে বারবাকিয়া থেকে পৃথক করে শিল খালী ও মগনামা থেকে পৃথক করে উজানটিয়া ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে পেকুয়া উপজেলার ইউনিয়ন সংখ্যা দাড়ায় ৭ টি।পেকুয়ার পশ্চিমে কুতুবদিয়া, দক্ষিণে চকরিয়া ও মহেশখালী,পূর্বে চকরিয়া এবং উত্তরে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও লোহাগাড়া উপজেলা। পেকুয়ার একদিকে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও অপর দিকে সমুদ্রের মিতালীর ঢেউ যেন আল্লাহর অফুরন্ত দান।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালের ২৭ মার্চ সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের নিরন্তন প্রচেষ্টায় সরকারের পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত নিকার সভায় পেকুয়া উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল পেকুয়া উপজেলার ঘোষণা মুদ্রিত হয় স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে।
২০০২ সালের ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার জেলা এবং পেকুয়া উপজেলার মানুষের কাছে একটি অবিস্মরণীয় দিন।
সেইদিনের স্মৃতি মনে পড়ে যায় এখনো ।আমি তখন শিলখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র।একদিন আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং আমার নানা আবুল কালাম স্যার এসে বললেন,”আগামী ২৭এপ্রিল পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।নব গঠিত পেকুয়া উপজেলার শুভ উদ্বোধন করতে পেকুয়ায় আসছেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।তাই তোমাদের স্কুল ২৭ এপ্রিল বন্ধ থাকবে”। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকলেও মোহাম্মদ উল্লাহ স্যারের প্রাইভেট ছিলো খোলা।তাই ২৭ এপ্রিল সকালে ঘুম হতে উঠেই স্কুলে প্রাইভেট ক্লাসে গিয়ে
দেখি আকাশ ধীরে ধীরে মেঘলা হয়ে উঠছে।মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু হতাশ হই নি।কিছুক্ষণ পর মেঘলা আকাশে উঁকি দিয়ে সূর্যের দেখা মিলে।সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে নব গঠিত পেকুয়া উপজেলার প্রাকৃতিক দৃশ্য।
মেঘলা আকাশের ঘনঘনটা অন্ধকার ঘুচিয়ে হঠাৎ সূর্যের উদয় যেন আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলো যে, আমরা এতদিন অন্ধকারে অবহেলিত ছিলাম আর এখন উন্নয়নের আলোর দিকে যাত্রা শুরু করেছি। এ রকম চিন্তা ভাবনা করতে করতেই সেদিন দুপুর ১২টায় জনসভাস্থল “পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজ” মাঠে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে দেখি হাজার হাজার জনগণ হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মত চারদিক হতে আসতে শুরু করেছে।সেদিন সকালে পেকুয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্মরণাতীতকালের বৃহত্তর মেজবান অনুষ্ঠান ছিল ।
পূর্বনির্ধারিত সময় বিকাল চারটার আগেই পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিকাল চারটার পূর্বেই খালেদা জিয়াকে বহনকারী বিমানটি কলেজের পাশের মাঠে অবতরণ করেন।সাথে সাথে হাজারো জনতা তুমুল করতালি আর শ্লোগানের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে স্বাগতম জানান।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্মরণাতীতকালের বৃহত্তর জনসভায় লাখ লাখ নারী–পুরুষের সামনে পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসভায় পেকুয়া উপজেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেছিলেন।এ সময় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ,চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন,স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট জিয়াউল হক জিয়া সহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ।
পেকুয়া উপজেলার শুভ উদ্বোধন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন,” আমরা পেকুয়াকে যেমন উপজেলা করেছি,তেমনিভাবে পেকুয়ার উন্নয়নও করব।শুধু পেকুয়ায় নয়,সারা বাংলাদেশে একইভাবে আমরা উন্নয়ন করবো।” উন্নয়নের জোয়ার বলতে যা বোঝায়,বিএনপি সরকারের আমলে পেকুয়ায় তার সবকিছুই হয়েছিল।যেমন-পেকুয়ার দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম, পেকুয়া থানা ভবন, উপজেলা প্রশাসনিক ভবন,ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ইত্যাদি ।
২০০২ সালে পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার জেলাটি প্রথম শ্রেণির জেলার মর্যাদা লাভ করে।এর আগে কক্সবাজার জেলা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর জেলা ।
অন্যদিকে পেকুয়া উপজেলা মর্যাদা লাভের মাধ্যমে উপকূলীয় জনগণের নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন আর আগের মত চকরিয়ায় গিয়ে সরকারি–বেসরকারি দাপ্তরিক কাজের জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হয় না। এসএসসি–এইচএসসি এর মতোই বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে যায় বাড়ির পাশের প্রতিষ্ঠানেই। উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর থেকে পেকুয়ার অবকাঠামোগত অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
পেকুয়া একসময় একটি অবহেলিত গ্রাম ছিল।সেই অবহেলিত গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন হতে উপজেলায় উন্নীত হওয়া এক বিস্ময়কর ঘটনা।এই কৃতিত্বের মহানায়ক হলেন আমাদের পেকুয়ার গর্বিত সন্তান সালাহউদ্দিন আহমদ,যিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ার সময় থেকেই পেকুয়ার অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ এমপি ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকায় রাস্তাঘাট,মসজিদ,মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন।তারই প্রতিদান হিসেবে চকরিয়া ও পেকুয়ার জনগণ ২০০৮সালের ২৯ড়িসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী এডভোকেট হাসিনা আহমদ কে কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত করেন। শুধু তাই নয়,২০০৯ এবং ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত এবং সালাহ উদ্দিন আহমদ কর্তৃক মনোনীত প্রার্থী হিসেবে শাফায়ত আজিজ রাজু বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
পেকুয়ার বিশিষ্ট ব্যক্ত্বিদের মধ্যে রয়েছেন মগনামার মরহুম মাহমুদুল করিম চৌধুরী(সাবেক এমপি ও বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ),মেজর জেনারেল(অব:) রুহুল আলম চৌধুরী( বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন), এডভোকেট জহিরুল ইসলাম (কক্সবাজার মহকুমা বাকশালের সাবেক গভর্ণর,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য)প্রমুখ।বিএনপি সরকারের আমলে পেকুয়া উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই আওয়ামী লীগের আমলে পেকুয়া উপজেলায় উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন হয়নি ।ফলে উন্নয়নের অভাবে পেকুয়া ছিল বিবর্ণ ও মলিন।রাস্তাঘাট সংস্কারের কেউ ছিল না ।পেকুয়া যেন এতিম সন্তানের মত।
বিএনপি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকার পরও শুধুমাত্র উন্নয়নের কারণেই সালাহউদ্দিন আহমদ এর নাম এখনো মানুষের মুখে মুখে রয়েছে।তিনি শুধু পেকুয়া উপজেলায় নয়, সমগ্র কক্সবাজার জেলায় উন্নয়ন করেছেন।তিনি ভারতের শিলং শহরে রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত জীবনযাপনের সময় পেকুয়া ও কক্সবাজার জেলার মানুষ তাঁকে একনজর দেখার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ছুটে যেতেন ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সালাহউদ্দিন আহমদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-নির্বাচনের পর থেকেই পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মূল অংশ কে নিয়ে পৌরসভা গঠনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।গত ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পেকুয়া কে পৌরসভা ঘোষণা করা হয়েছে ।
২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পেকুয়া উপজেলায় অভূতপূর্ব উন্নয়নের কারণেই আমরা এই সময় কে পেকুয়া উপজেলাবাসীর স্বর্ণযুগ বলি। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের হাত ধরেই পেকুয়া উপজেলাবাসীর উন্নয়নের সেই স্বর্ণযুগ ফিরে আসুক – এটাই প্রত্যাশা ।বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০৩ সালের ১৪ এপ্রিল কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলা সফর করেছিলেন । তিনি পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দিয়েছিলেন ।এখন সেই মোক্ষম সময় এসেছে ।
পেকুয়া উপজেলার ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পেকুয়া উপজেলার সর্বস্তরের জনগণকে প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।
