parbattanews

বন্দর রক্ষায় আন্দোলনে নামছে বিভিন্ন সংগঠন

চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল ও কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া নিয়ে ক্রমেই উত্তাল হচ্ছে দেশ। এই ক্ষোভ এখন কেবল রাজধানী ঢাকায় আবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামেও। বন্দর পরিচালনার ভার বিদেশিদের হাতে চলে যাওয়া মানে দেশ ভূরাজনৈতিক আগ্রসনে পড়বে- এমন আশঙ্কা করছে দেশের সচেতন মহল। এর প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ-সমাবেশের ডাক দিয়েছে একাধিক সংগঠন। তাছাড়া বন্দর রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কিছু সংগঠন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে এসব চুক্তি করা এবং চুক্তির বিষয়গুলো প্রকাশ না করায় সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি বন্দরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিচালনায় বিদেশি কম্পানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তারা আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, গণসংযোগ, গণ-অনশন, গণমিছিল ও মশাল মিছিলের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ দেশের ক্রিয়াশীল অধিকাংশ শ্রমিক সংগঠনের জোট ‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)’, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত দলগুলো, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণতন্ত্র মঞ্চভুক্ত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ জাসদ, ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, পাঁচদলীয় বাম জোট এবং উদীচীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ছাত্র-যুব সংগঠন। টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামীও।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে বিশাল মশাল মিছিল করেছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ’। আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করবে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন। আগামী শনিবার চট্টগ্রামে জাতীয় কনভেনশন আহবান করেছে স্কপ।

কনভেনশন থেকে হরতাল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে। চট্টগ্রাম স্কপের যুগ্ম সমন্বয়ক রিজওয়ানুর রহমান খান বলেন, শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ীসমাজ ও দেশের জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে গণবিরোধী ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পাদিত চুক্তি জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামত ছাড়াই এই দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি করা হয়েছে। তাই স্কপ এই ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অবিলম্বে চুক্তি বাতিল না করলে আগামী শনিবার চট্টগ্রামে শ্রমিক কনভেনশন থেকে হরতাল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড অবরোধসহ কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার ঢাকার একটি হোটেলে ডেনমার্কের মায়ের্সক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের কোম্পানিটির সঙ্গে ৩৩ বছরের জন্য কনসেশন চুক্তি হয়েছে। শর্ত পূরণ করা হলে আরও ১৫ বছর পরিচালনার সুযোগ পাবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পটিতে স্থানীয় অংশীদার হিসেবে রয়েছে কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিসেস।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল আগামী ২২ বছরের জন্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ।

গত সোমবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এ সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় সাইনিং মানি হিসেবে সরকারের পক্ষে ১৮ কোটি টাকার চেক গ্রহণ করেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। চেক তুলে দেন মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাত।

রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এবং মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের মধ্যে একটি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সিপিএ চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাত তাঁদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরকার ও মেডলগের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম শাখাওয়াত হোসেন। উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনসচিব নুরুন্নাহার চৌধুরী।

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল।

চুক্তির মাধ্যমে এই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ। চুক্তির আওতায় সরকার বছরে ১ কোটি ১ লাখ টাকা ফি পাবে।

পাশাপাশি প্রতি একক কনটেইনার থেকে ২৫০ টাকা মাশুল পাবে সরকার। এ টার্মিনালে মোট ৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে মেডলগ। তৈরি করা হবে কটন ওয়্যারহাউস। নিজস্ব বার্থ জাহাজ এবং ট্রাক ও ফ্রিজিং ট্রাক ক্রয় করা হবে টার্মিনালটির জন্য। এত দিন ধরে বছরে ২২ কোটি টাকা লোকসানে ছিল পানগাঁও নৌ টার্মিনালটি।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম শাখাওয়াত হোসেন (অব.) বলেন, ‘গত ১২ বছরে পানগাঁও নৌ টার্মিনালে আমাদের ৩০০ কোটা টাকা লোকসান হয়েছে। বছরে ২২ কোটি টাকার মতো লোকসান হতো। মোট ১৬৫ কোটি টাকা লোকসান এবং নির্মাণ ব্যয় ১৫৫ কোটি টাকা মিলিয়ে তা ৩০০ কোটি টাকা। অনেকে এটা বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ব্যবসায়ীরা কাস্টমসের সমস্যার কথা বলতেন। তবে কর্মকর্তা পরিবর্তন করেও কোনো লাভ হয়নি। এখন আশা করি এসব সমস্যা উতরে যাবে পানগাঁও টার্মিনাল।’

মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাত বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ৬০ লাখ ডলার এবং পর্যায়ক্রমে ৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করব আমরা যার মাধ্যমে ঢাকা এবং আশপাশের সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে। দেড় মাসের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করার কথা বলেন তিনি।’

অনুষ্ঠানে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সড়কপথে আমাদের কার্গো পরিবহন হয় ৯৬ শতাংশ। কিন্তু নৌপথে ১ শতাংশের কম। এটা ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে সড়কের ওপর চাপ কমবে। এ ক্ষেত্রে নতুন এ চুক্তি সহায়তা করবে।’

Exit mobile version