ছোটবেলায় পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন রামহিম লিয়ান বম। কিন্তু স্কুলে টেবিল টেনিস (টিটি) দলে ঢুকে পড়ার পর ও পথে আর পা বাড়ানো হয়নি। র্যাকেট হাতে তুলে যে ভুল করেননি, গত জুলাইয়ে মিলল তার জোরালো প্রমাণ। ৩৯তম জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে বালক ও পুরুষ একক—দুই বিভাগেই হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশের টেবিল টেনিসে এটি রেকর্ড! জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের একই আসরে এর আগে কেউ-ই একসঙ্গে বালক ও পুরুষ একক দুটিতেই চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি।
এই চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষ দলগতেও সেরা হয়েছে রামহিমের দল। সর্বশেষ জাতীয় টিটি চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি ইভেন্টেই তিনি প্রথম। মিশ্র দ্বৈতে রানার্সআপ। এককের দুটি ফাইনালেই তাঁর জয়ের ব্যবধান ৪-০ সেট। দেশের টিটিতে দীর্ঘদিন রাজত্ব করা মানস চৌধুরী ও মাহবুব বিল্লাহদের বিদায়ঘণ্টার মধ্যেই বেজে ওঠে রামহিমের আগমনী সুর। অল্প সময়েই চূড়ায় উঠেছেন রামহিম। পেয়েছেন বিদেশিদেরও প্রশংসা। বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সহসভাপতি ও ক্রীড়া সংগঠক খোন্দকার হাসান মুনীর বলছিলেন, ‘রামহিমের খেলার ভিডিও পাঠিয়েছিলাম বিশ্ব টেবিল টেনিসের সিইও স্টিভ ডেইন্টনকে। ভিডিওটা দেখার পর তাঁর মেসেজ ছিল এই রকম, “ওয়াও! হি ইজ ভেরি গুড”।’
বাংলাদেশের টিটি-সম্পৃক্ত অনেকেই রামহিমকে বাংলাদেশের মা লং বলে ডাকেন। মা লং হচ্ছেন চীনের বিখ্যাত টিটি খেলোয়াড়। একই সঙ্গে তিনি অলিম্পিক গেমসে দুবার এককে চ্যাম্পিয়ন ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ এককে টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন। সদ্য সমাপ্ত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও এককে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিশ্বসেরার কাতারে গিয়েছিলেন। তাঁকে মনে করা হয় সর্বকালের সেরা টিটি খেলোয়াড়। আর সেটা উল্লেখ করে হাসান মুনীর বলছিলেন, ‘আগে খেলার স্টাইল ও চেহারার সাদৃশ্যের কারণে সবাই রামহিমকে আদর করে মা লং বলে ডাকত। আর এখন এত দ্রুত উঠে এসেছে যে ওর নামই হয়ে গেছে বাংলাদেশের মা লং।’
পাহাড়-পুত্র
বান্দরবান শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরের বগা লেক। জনপ্রিয় এই পর্যটনস্থানের পাশেই বম জাতিগোষ্ঠীর পাড়া। বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, আধুনিকতার ছোঁয়া থেকেও এই পাড়ার মানুষ অনেকটা দূরে ছিল। জুয়ামডো বম এই পাড়ারই মানুষ। রুমার একটি গির্জার তিনি ফাদার। উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জুমচাষেও সময় দিতে হয়। এ-ই করে যা আয়, তা দিয়েই কষ্টে চলে তাঁর আট সদস্যের সংসার। আর্থিক দৈন্যদশার কারণে বড় মেয়েকে উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পড়াতে পারেননি। পরের তিন সন্তানকেও পড়াশোনায় বেশি দূর এগিয়ে নিতে পরেননি। তাই পঞ্চম সন্তান রামহিম লিয়ান বমকে নিয়ে জুয়ামডোর অনেক স্বপ্ন।
চার বছর বয়স হতেই ছেলেকে রুমা উপজেলার একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করান জুয়ামডো। এক বছর সেখানে ভাষাশিক্ষা নেন রামহিম। বছর ঘুরতেই বেশ চটপটে হয়ে ওঠেন রামহিম। লামার কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে পড়ে তাঁর চাচাতো ভাই পাঅং বম। অবৈতনিক এই স্কুলে পড়াশোনার মান ভালো, আছে আরও নানা সুযোগ-সুবিধা। এসব বিবেচনা করে বাড়ি থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরের এই স্কুলে রামহিমকেও ভর্তি করে দেন তাঁর বাবা। খেলার সাথি চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্কুলে ভালোই কাটতে থাকে রামহিমের দিন।
টেবিলে টেনিসে বসতি
স্কুলে ভর্তির পর খেলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নিতে থাকেন রামহিম। ২০১২ সালে ছাত্রদের টেবিল টেনিস শেখানোর উদ্যোগ নেয় কোয়ান্টাম স্কুল কর্তৃপক্ষ। টেবিল টেনিসে তখনই রামহিমের হাতেখড়ি। তখন তিনি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। মজার ব্যাপার হচ্ছে, মাত্র আগে বছর টেবিল টেনিসের সঙ্গে তার পরিচয়। সেটাও এক গল্প। শোনালেন রামহিম, ‘২০১১ সালে আমি জ্যাকি চাংয়ের কারাতে কিড দেখি। সেই ছবিতে টিটি খেলার একটা অংশ ছিল। তখনই আমি প্রথম টিটি দেখি এবং খেলাটা মনে ধরে।’
পরের দুই বছর বড়দের খেলা দেখেই কেটে যায়। ২০১৪ সালে এসে টেবিল টেনিসের ব্যাট-বলের ভাষাটা খুব দ্রুতই শিখে ফেলেন রামহিম। পাঅং বমও টেবিল টেনিস খেলেন। দুই ভাই মিলে স্কুলে সকাল-বিকেলে অনুশীলন করেন। স্কুলের হয়ে নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতাও শুরু হয়ে যায়।
স্কুলে শুরুর সময় প্রশিক্ষণে সহায়তা করেছেন বাংলাদেশ টেবিল টেনিসের জাতীয় কোচ হাফিজুর রহমান ও ফেডারেশন সদস্য এনায়েত হোসেন। ২০১৬ সালে ঢাকায় আসেন উত্তর কোরিয়ান টিটি কোচ কিম সুং হ্যান ও প্রশিক্ষণ সহযোগী কিম সুগান। তাঁদের দুজনকে বিকেএসপির পাশাপাশি কোয়ান্টাম স্কুলেও পাঠানো হয়। বিদেশি প্রশিক্ষকের দেওয়া প্রশিক্ষণের সুফলও মেলে দুই বছর যেতে না যেতেই। ২০১৮ সালে বিকেএসপি কাপে চ্যাম্পিয়ন হন রামহিম। তখন অনেকের নজরে আসেন রামহিমসহ আরও তিনজন (তাঁদের একজন বর্তমান জুনিয়র বালিকা চ্যাম্পিয়ন ও সিনিয়রেও ভালো খেলা খই খই সাই মারমা)। ২০১৯ সালে টেবিল টেনিস ফেডারেশনের পক্ষ থেকে লামার তিনজনকে আনা হয় ঢাকায়, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে। একই বছর উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য রামহিমকে দিল্লির অংশুল গর্গ একাডেমিতে পাঠায় বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশন। এসব প্রশিক্ষণ রামহিমকে গড়ে তোলে দক্ষ টিটি খেলোয়াড় হিসেবে।
জাতীয় দলে রামহিম
২০২০ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকায় চলে আসেন রামহিম লিয়ান বম। বাংলাদেশ পুলিশের টিটি দলে নাম লেখান। করোনা শেষে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বসে প্রিমিয়ার টেবিল টেনিস লিগ। সেখানে রানার্সআপ হয় রামহিমের দল। একই বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ গেমস টিটিতে ছেলেদের দলগত সোনা জেতে পুলিশ। সেখানেও ভালো খেলেন রামহিম। ফেডারেশন কাপ টিটিতেও ভালো খেলেছেন। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় টেবিল টেনিস দলে সুযোগ পান রামহিম। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনিই প্রথম টেবিল টেনিসে জাতীয় দলে যুক্ত হন।
খেলার সূত্রে আয়ও করতে শুরু করেন রামহিম লিয়ান বম। ২০২১ সালে ঢাকা মেট্রোপলিশ টেবিল টেনিস লিগে বাংলাদেশ পুলিশে খেলে হয় জীবনের প্রথম বড় আয়। সেখান থেকে বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক লাখ টাকা, যা তাঁর পরিবারকে আবেগাপ্লুত করেছিল। বাবাকে সাহায্য করতে পেরে রামহিমও খুশি।
জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন রামহিম লিয়ান বম। ২০২১ সালে মালদ্বীপে দক্ষিণ এশিয়ান জুনিয়র অ্যান্ড ক্যাডেট টিটিতে অনূর্ধ্ব-১৯ দলগত বিভাগে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের অন্যতম রামহিম। আন্তর্জাতিক টিটিতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সোনা। ওই সোনা জয়ের সুবাদে সেবার বাংলাদেশ এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
২০২১ সালে ওমানের মাসকাটে বিশ্ব টেবিল টেনিস ইয়ুথ কনটেনডারে নিজের বিভাগে প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে খেলেন রামহিম। দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৭ শীর্ষ খেলোয়াড় পি অভিনন্দকে হারিয়ে আলোড়ন ফেলেন। ২০২১ সালে কাতারের দোহায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো ফল করায় বাংলাদেশ ২০২২ বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। সবাইকে অবাক করে বাংলাদেশ পুরুষ দলগত বিভাগে কমনওয়েলথ গেমসের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। এখানেও রামহিমের অবদান অনেক।
রামহিম স্বপ্ন দেখেন
বর্তমানে বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনেই থাকেন রামহিম। তাঁর থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সব দায়িত্ব নিয়েছে ফেডারেশন। এসএসসি পাসের পর ঢাকার মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন রামহিম। এ কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন এবার। কিন্তু ছয়টি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েই গত আগস্টে চলে যেতে হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ায়, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে। রামহিম দলে থাকায় কোরিয়ায় এশিয়ান টিটিতে বাংলাদেশ এবার ১৪তম হয়ে সেরা ১৬-তে ঢুকেছে। দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে এক বছর জলাঞ্জলি দিতে হলো। তবে দলের সাফল্যে খুশি রামহিম। পরিকল্পনা করছেন বাকি চার বিষয়ে আগামী বছর পরীক্ষা দিয়ে এইচএসসিও সম্পন্ন করবেন।
দক্ষিণ এশিয়ান গেমস টেবিল টেনিসে রুপা জিতলেই সন্তুষ্ট থাকেন বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। কিন্তু আরও বড় কিছুর স্বপ্ন দেখেন রামহিম। তাই তো সাহসী কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘স্যাররা বলেন, এসএ গেমসে রুপা জিততে হবে। কিন্তু আমি বলি, রুপা নয়, সোনা জিততে চাই আমরা। সেই স্বপ্ন নিয়েই কঠোর অনুশীলন করে যাচ্ছি। আমি আরও সামনে এগিয়ে যেতে চাই।’
সূত্র: প্রথমআলো
