বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম


বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বা ইশতেহারে পার্বত্য প্রতিশ্রুতি কমবেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান তাদের স্ব স্ব দলের ইশতেহার ঘোষণায় পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অবহেলীত মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার অভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত উভয়দলই শান্তিচুক্তি ইস্যুতে তাদের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করেছে। বিএনপি বলেছে তারা ‘শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়ন’ করবে এবং জামায়াত বলেছে ‘শান্তিচুক্তি সংস্কার করবে। শান্তিচুক্তি ছাড়াও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী এই প্রধান দুই রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভোটারদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতির তুলনামূলক মূল্যায়ন তুলে ধরা হলো-
বিএনপি :
পার্বত্যবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় দলটি। ক্ষমতায় গেলে শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করার কথাও বলছে দলটি। ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত এই ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর জীবনমান উন্নয়নে যেসব প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয় তার শুরুতেই রয়েছে সকলের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সকল নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্ম-কর্মের অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করতে চায় ঐতিহ্যবাহী এই দল।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয় যে তারা ক্ষমতায় গেলে নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করবে। যেই অধিদপ্তরের মাধ্যমে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত নৃ-জাতি-গোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং সার্বিক উন্নয়ন করবে।
টেকসই শান্তি স্থাপনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। বলা হয়েছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করবে। তাছাড়া সকল গোষ্ঠীর সদস্যদের সংঘাত ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের জন্য আস্থা বিনির্মাণ প্রক্রিয়া (কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজার্স) ও সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচি (সোশ্যাল রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম) গ্রহণ করা হবে বলেও ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।
পার্বত্যবাসীর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান- এই তিন পার্বত্য জেলার জেলা হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন করতে চায় বিএনপি।কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পাহাড়ি পণ্য, হস্তশিল্প ও ইকো-ট্যুরিজমে বিনিয়োগে গুরুত্বারোপ করা হবে এবং স্থানীয় যুবদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে বলেও বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে ইশতেহারে যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হবে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করে পার্বত্য এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে এগ্রো-ইকো ট্যুরিজম জোন গড়ে তুলতে চায় বিএনপি।
বিএনপির ইশতেহারে শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হয়েছে, পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে যোগ্যদের পর্যায়ক্রমে শতভাগ সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসার প্রয়াস নেওয়া হবে।
জামায়াত ইসলামী :
৪ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ ঘোষণাকালে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের দেশে পাহাড়-সমতল নিয়ে কথা আছে। দেশটা খুবই ছোট। বিপুল সংখ্যক জনবল আমাদের। এই দেশে পাহাড়-সমতল নিয়ে কেনো কথা হবে? দেশে পাহাড়-সমতল ব্যবধান ঘুচিয়ে সমাধান করব। আমরা দেশের এই পাহাড়-সমতল রেষারেষি হিংসা-হিংসি দূর করতে চাই।
জামায়াতের লিখিত ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে জামায়াত ইসলামী ৪টি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে এসব প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্যবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় দলটি।
ইশতেহারে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ক্ষমতায় গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ জনসাধারণের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যথাযথ উন্নয়নের মাধ্যমে পার্বত্যবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করবে জামায়াত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনসাধারণের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য দূরীকরণের ব্যাপারে জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে, পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে তারা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান- এই তিন পার্বত্য জেলার নিরাপত্তা নিশ্চিতে যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী।
ইশতেহার ঘোষণাকালে জামায়াত আমির পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেছেন, পাহাড়ে যারা বসবাস করেন তারা যদি তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের পাওনা তাদের হাতে আমরা তুলে দেব। তারা যেন আস্থা এবং গর্বের সাথে মনে করেন যে এই দেশটা আমার, আমি যেন এই দেশ গড়তে পারি। হয়ত বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত করে তাদের দুর্বল জায়গায় টোকা দিয়ে কেউ কেউ তাদের খেপিয়ে তুলে দেশের বিরুদ্ধে ক্ষতি করার চেষ্টা করে।
পাহাড়ে অশান্তি লেগে আছে অভিযোগ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই অশান্তি আর দেখতে চাই না। আমরা এই অশান্তির অবসান চাই। এই পাহাড় রক্ষা করতে গিয়ে আমার জানামতে সেনাবাহিনীর ১০ হাজারেরও অধিক সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। কেন? কেন আমার দেশের এতো সেনা সদস্যকে জীবন দিতে হবে। এর পেছনে কারা আছে? এর পেছনে কারণ কী? এর যৌক্তিক সমাধান খুঁজে বের করা হবে। যে সমাধান পেয়ে সবাই আনন্দিত হবেন- ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০ জানুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এই ইশতেহারে পাহাড় বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে এই ইশতেহারে দফা ৩ এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ, নির্যাতন ও নিপীড়নকে প্রতিহত করতে স্বাধীন তদন্তের এখতিয়ার সম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হবে।’

















