বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় কক্সবাজার সংলগ্ন কিংবা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পয়েন্টে প্রায়ই ঘটছে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা। বিপদ জেনেও মাইন পুঁতে রাখার জায়গায় যাচ্ছে সীমান্তের মানুষেরা। সীমান্তে কৃষি কাজ, ছুটে যাওয়া গরু ফিরিয়ে আনা বা গাছ কাটতে গিয়ে, বাঁশ কাটতে গিয়ে প্রায়ই মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন তারা।
এদিকে মাইন বিস্ফোরণে আহতরা বলছেন, মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখায় ঘটছে এই দুর্ঘটনা।আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্তে স্থলমাইন পোঁতা নিষিদ্ধ। তারপরও মিয়ানমার তা লঙ্ঘন করে স্থলমাইন পুঁতে রাখছে।
গত ৮ বছরে অন্তত ৫ জন নিহত এবং অর্ধশত মানুষ আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন, বিজিবি ও সীমান্তের মানুষদের কাছ থেকে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে এই তথ্য জানা গেছে। মাইন বিস্ফোরণের বিপদ থেকে নিজেদের কিভাবে রক্ষা করবে এ ব্যাপারে সীমান্তবর্তী মানুষদের নিয়ে প্রশাসন ও বিজিবির পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার ও মতবিনিময় কার্যক্রম চলছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হওয়ার পর থেকে সীমান্তে গত ৮ বছরে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে ৫ জন, পা হারানোসহ আহতের সংখ্যা অর্ধশত। এ ঘটনায় বেশি পতিত হচ্ছে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু, চাকঢালা, আশাতলী, জামছড়ি, ফুলতলী ও জারুলিয়াছড়ি সীমান্তের লোকজন।
এই পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনের নিরাপত্তায় টহল জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা প্রয়োজন মনে করছে বিজিবি। তারই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে বিজিবি’র আয়োজনে স্থানীয়দের নিয়ে জনসচেতনতামূলক সভায় ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক বলেন মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের বড় কারণ অসর্তকতা। বিপদ জেনেও লোকজন ঝুঁকি নিয়ে জিরো পয়েন্টে যাচ্ছে আর হতাহত হচ্ছে মাইন বিস্ফোরণে।
বিজিবির জনসচেতনতামূলক সভায় আসা মাইন বিস্ফোরণে আহতরা বলছেন, আরকান আর্মি বাংলাদেশের সীমান্তেই মাইন পুতে রাখছে। তাদের জীবন অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তের হাবিবুর রহমানের ছেলে নবি হোসেন বলেন, গত ১ বছর আগে চরতে যাওয়া গরু আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে তার ডান পা হারিয়ে ফেলে। এই মাইনটি ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে।
তমব্রুর উত্তর পাড়ার আবুল খায়েরের ছেলে মো. হাসান বলেন, ২০১৭ সালে মাইন বিস্ফোরণে আমার দুই পা মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আমরা যারা সীমান্তে আছি তারা সবসময় নিরাপত্তাহীনতায়। আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না সীমান্তের কোন অংশে মাইন আছে। এই ক্ষেত্রে বিজিবির সহযোগিতা প্রয়োজন।
তমব্রুর হেডম্যান পাড়ার অংকেথাইং এর ছেলে অন্যথাইং টংচংগা জানান, গত ২ বছর আগে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে বাম তিনি পা হারিয়ে ফেলেছেন। যা বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যেই ছিল।
সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে না যাওয়া পরামশ দিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশর সীমান্ত কোথায় শেষ হয়েছে বর্ডার এলাকায় যারা থাকে তারা সবাই জানে। বর্ডার ক্রস করা মানেই বিপদের আশংকা। সুতরাং জেনেশুনে কেনো বিপদের দিকে যাচ্ছেন তারা। এ ব্যাপারে সবাইকে সর্তক থাকতে হবে। এ বিষয়ে প্রশাসন ও বিজিবির পক্ষ থেকে সচেতনামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক এসএম খায়রুল আলাম বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তায় বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত সর্তক করার পরেও স্থানীয় কিছু লোকজন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যাচ্ছেন। এই হতাহতের দায়ভার কে নেবে? আমরা স্থানীয়দের বলেছি, সর্তকতার বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, ল্যান্ডমাইন হলো একটি বিস্ফোরক অস্ত্র যা প্রায়শই মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা বা ঢেকে রাখা হয়। এটি অতিক্রম করার সময় বা কাছাকাছি যাওয়ার সময় বিস্ফোরিত হয়। মানুষ হতাহত করার মাইন ছাড়াও রয়েছে ট্যাঙ্ক-বিরোধী মাইন , যা শত্রুর ট্যাঙ্ক বা অন্যান্য যানবাহন নিষ্ক্রিয় করার জন্য পুঁতে রাখা হয়।
