parbattanews

বৃষ্টির পানিতে দেশের উপকূল ও নিম্নাঞ্চল বিপর্যস্ত

টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ছে। প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল ও ফসলি জমি। টানা ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে ২২টি জেলায় ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত। মাঠের আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, শাকসবজি, ফলবাগান, পানসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে ডুবে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— রাঙামাটি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, ফেনী, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা।

পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফেনীতে। জেলাগুলোয় বৃষ্টির তীব্রতা ও সেচ নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে জলাবদ্ধতা বেশি দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

মন্ত্রণালয় বলছে, এলাকাগুলোয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আউশ ধান ও আমনের বীজতলা। আউশ ধান ৪৪ হাজার ৬৬২, আমন বীজতলা ১৪ হাজর ৩৯৩, শাকসবজি ৯ হাজার ৬৭৩, বোনা আমন ২৯৭, পাট ১৩৫, কলা ১১৪, পেঁপে ২৯৩, পান ৩৮৭, মরিচ ১০৪ এবং ২৮১ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন তরমুজ ক্ষতিগ্রস্ত। মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৭২ হাজার ৭৬ হেক্টর। বিশেষভাবে কুমিল্লার ১১ হাজার ৫৯০ হেক্টর, নোয়াখালীর ৭ হাজার ৮০৬ হেক্টর এবং ফেনীর ১ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাত আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানানো হয়েছে।

অস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে আমনের বীজতলা। ফসল যদি বেশি দিন ডুবে থাকে, তবে বীজতলা পুনরায় তৈরি করতে হবে, যা শস্যচক্র ও উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কৃষক আজিজুল হক বলেন, এই সময়ের আমন বীজতলা আর শাকসবজি মাঠে ডুবে গেছে। যদি আরও এক-দুই দিন পানি না নামে, তবে সব শেষ হয়ে যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক ছাইফুল আলম বলেন, জেলা পর্যায়ে মাঠকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত জমির তালিকা তৈরি ও কৃষকদের পরামর্শ দিতে কাজ শুরু করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর পুনর্বাসন ও বীজ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাহাড় ধসের আশঙ্কায় মাইকিং

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গত ১২ ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাহাড় ধসের আশঙ্কায় উপজেলায় মাইকিং করছে প্রশাসন।

ভারী বৃষ্টির কারণে সীতাকুণ্ড পৌর সদরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন, নামার বাজার, দাসপাড়া, শেখপাড়া এলাকায় বিভিন্ন স্থান হাঁটুপানিতে ডুবেছে। একই দৃশ্য দেখা গেছে বাড়বকুণ্ড বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের কার্যালয়সহ স্থানীয় কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। এ ছাড়া সৈয়দপুর, বারৈয়াঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও সোনাইছড়ির বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, গতকাল থেকে ভারী বর্ষণের কারণে মোট আবাদের প্রায় অর্ধেক জমির ফসল জলাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। পানি সরে না যাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে না।

টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। দীঘিনালার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ৪৪টি পরিবার। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় দীঘিনালা-লংগদু সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী নদীর পানি বেড়ে তীরবর্তী ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানান, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে রান্না করা ও শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। পানিবন্দি রয়েছে কয়েকশ পরিবার।

শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনালে জলাবদ্ধতা

টানা বৃষ্টিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনাল এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। টার্মিনাল ভবনের নিচতলায় আগমনী গেট, ক্যানোপি পার্কিংসহ বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানি ঠেকাতে বালতিসহ বিভিন্ন পাত্র ব্যবহার করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, টার্মিনাল ভবনের নিচতলায় পানি জমেছে। ছাদ থেকে পিলার চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে। এসব পানি ঠেকাতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাকর্মীরা বালতি ও ট্রে ব্যবহার করছেন।

ফেনীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২২ স্থানে ভাঙন

ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২২টি স্থান ভেঙে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত। দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে। বন্ধ হয়ে গেছে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক মহাসড়ক যোগাযোগ। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যমতে, ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানায়, অনেক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক মিটার ও সাব-স্টেশন ডুবে যাওয়ায় নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদর উপজেলার ৯৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলার ছয় উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য সাড়ে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদী ও চৌমুহনীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এতে রান্না ও খাবারের চরম দুর্ভোগে পড়েছে পানিবন্দি লোকজন। গতকাল বিকেলে মাইজদী শহরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ সড়ক, হাউজিং এস্টেট, সেন্ট্রাল রোড, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, আল ফারুক একাডেমি ও বালুর মাঠ আবাসিক এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কগুলো দেড় থেকে দুই ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, বৃষ্টির কারণে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ব্যাপক প্লাবিত হয়েছে। কবিরহাট, কোম্পানীগঞ্জ ও সুবর্ণচর উপজেলায় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ৩০০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও ঘনবসতিপূর্ণ অনেক এলাকা তলিয়ে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আবুল কালাম আজাদ জানান, বাগেরহাট সদরসহ উপকূলীয় তিন উপজেলায় ৯১৫টি চিংড়ি ঘের, ১৭৭টি পুকুর ক্ষতির মুখে পড়েছে।

যশোরের অভয়নগরে সড়ক-অলিগলি থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতেও পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলার ভবদহ অঞ্চলের বিলগুলোয় পানি বেড়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, নওয়াপাড়া পৌরসভা ও অভয়নগর উপজেলায় আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মরিচের ক্ষতি হয়েছে।

Exit mobile version