যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। তবে এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি ইসলামাবাদে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়েও নীরব থেকেছে নয়াদিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় এবং আশা করে এটি পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। পাশাপাশি তারা জোর দেয় যুদ্ধবিরতি, সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর, যা এই সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে সংঘাতের ধ্বংসাত্মক প্রভাবের কথাও উঠে আসে। এতে বলা হয়, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাকে ব্যাহত করেছে। ভারত আশা প্রকাশ করে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হবে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার আগ্রহ দেখায়, তখন থেকেই ভারতের অভ্যন্তরে সমালোচনা শুরু হয়। বিরোধী দলগুলো একে ভারতের জন্য ‘কূটনৈতিক আঘাত’ হিসেবে আখ্যা দেয়। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ভারত কোনো ‘মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র’ হতে চায় না।
তবে ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক এবং বিরোধী নেতাদের একটি অংশ ভিন্ন মত পোষণ করছেন। তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে এবং ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা মেনন রাও মন্তব্য করেন, পাকিস্তান এখানে সরাসরি মধ্যস্থতাকারী না হলেও একটি ‘অনুঘটক’ হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে বার্তা আদান-প্রদান সহজ হয়েছে এবং একটি সীমিত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং সংঘাতের নতুন পর্যায়, যেখানে সামরিক চাপ ও কূটনীতি একসঙ্গে চলছে।
তিনি ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ সময় নীরব না থেকে একটি স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়া জরুরি। যেখানে উত্তেজনা প্রশমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা হবে।
কিছু বিশ্লেষক আরও এগিয়ে গিয়ে দাবি করছেন, এই ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে তার কূটনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশ এবং ইরানের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ পাকিস্তানের ভূমিকাকে প্রশংসা করছেন, আবার কেউ ভারতের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে সমালোচনা করছেন। অনেকেই মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য আত্মসমালোচনার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
দুই দেশের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি শুধু একটি সাময়িক স্বস্তিই নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতির পরিবর্তিত সমীকরণেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে এবং পুরনো কৌশলগুলো নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
