parbattanews

যুক্তরাষ্ট্র মূলত চায়নার বিরুদ্ধে লড়ছে : ইরান বলির পাঁঠা

এই প্রবন্ধের লেখক মেহেদী হাসান পলাশ।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর শক্তিশালী জার্মানি ও জাপানের পর আরো দুটি বিশ্ব সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। একটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, অন্যটি ওসমানীয় খেলাফত। পরবর্তী কয়েক বছরে বিশ্বে নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ শুরু হয়। বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে এসে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে বিশ্ব বাই পোলার ব্যবস্থায় উপনীত হয় এবং ১৯৯০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউনিপোলার পৃথিবীতে পরিণত হয়। এ সময় বিশ্বের একক মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র তার ছায়া শত্রু হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানকে চিহ্নিত করে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে নতুন রাজনৈতিক টার্মিনোলজি চালু করে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়াসহ একের পর এক মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়।

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এসে যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, ইসরাইলের ইন্ধনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে সরলরেখায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকা চাইনিজ রেড ড্রাগনের উত্থান উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু যখন উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে ততদিনে চায়না অনেক দূরে এগিয়ে গেছে বলতে গেলে মার্কিন আধিপত্যবাদের গ্রিপ থেকে নিজেকে বের করে নিয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাত্রা রাতারাতি হ্রাস করে ব্যাপকভাবে। আফগানিস্তান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে সেনা উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। এবং বিশ্ব শাসনের নতুন নীতি হিসেবে কন্টেন্ট চায়না পলিসি গ্রহণ করে। ‌ শুরু হয় বিশ্বব্যাপী চায়নার উত্থান প্রতিরোধের নামে এক নতুন ও বহুমুখী ভূ-রাজনীতি।

যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর শক্তিশালী ও বিশাল রাষ্ট্র হলেও দুইটি মহাসাগর দ্বারা পৃথিবীর বাকি ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিশ্ব শাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যাপী বহির্বিশ্ব ঘাঁটি পরিচালনা করতে হয় বিপুল ব্যয়ে। বিশ্বের সর্বমোট ১৯৫টি রাষ্ট্রের মধ্যে ৮০টি দেশে সাড়ে ৭৫০-৮০০টি স্থায়ী, অস্থায়ী বা যৌথ সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে দেশটি। এতে প্রায় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার থেকে ২ লক্ষ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের মোট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্ধেকের কিছু কম রাষ্ট্রে মার্কিন ঘাঁটি বা সৈন্যের উপস্থিতি রয়েছে।

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চায়নার এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় সমুদ্র বাণিজ্য পরিচালনার জন্য ভারত মহাসাগরে প্রবেশ অপরিহার্য। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও চায়না ভারত মহাসাগর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক, ভূ কৌশলগত ও সামরিক জোটের নামে এই দুই পরাশক্তি ভারত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রণে মরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি, অকাস, কোয়াড, বার্মা এ্যাক্ট সবই চায়নাকে ভারত মহাসাগরে বাধা দেয়ার আর কৌশল। রোহিঙ্গা সমস্যা, মানবিক করিডরের প্রস্তাব, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং মিয়ানমারের কয়েকটি রাজ্য নিয়ে ক্রিশ্চিয়ান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, রাখাইনের আরাকান আর্মিকে পশ্চিমা সহায়তা- সবই এখন কনটেন্ট চায়না নীতির অংশবিশেষ।

এমনকি প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ান অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়া সত্বেও ভারত বছরের পর বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হিসেবে টিকে গেছে এই একই বিবেচনায়। বিশ্বব্যাপী রাশিয়া যে অস্ত্র রপ্তানি করে তার ৪০ থেকে ৫০ ভাগ অস্ত্র ভারত একাই ক্রয় করে থাকে। ভারত মহাসাগরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের নোঙ্গর সুবিধা এই কৌশলের অংশবিশেষ। মালাক্কা প্রণালী একপাশে ফিলিপাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যপাশে আন্দামান সাগরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের পোতাশ্রয় সুবিধা গ্রহণ মূলত ভারত মহাসাগরে চায়নার যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণের কৌশল বিশেষ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মানাও(Manaung) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা, আরাকান আর্মিকে সহযোগিতা করা, বার্মা অ্যাক্ট, কক্সবাজারে মানবিক করিডরের আলোচনা একই লক্ষ্যে প্রণীত। এছাড়াও গত ১ দশকে এই অঞ্চলে সরকার পরিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করলেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ভারতে টানা বিজেপির জয়লাভ, পাকিস্তানে ইমরান খানের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে আধা সামরিক আধা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় নিয়ে আসা, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে বিপুল পরিমাণ মার্কিন নাগরিক ও মার্কিন রেসিডেন্ট কার্ডধারীদের অনুপ্রবেশ ও কার্যক্রম- এই বার্তা দেয়।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক পার্বত্যনিউজ।

Exit mobile version