parbattanews

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড. ইউনূসের করা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে যা বললো আনন্দ বাজার

ছবি সংগৃহীত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে, যেখানে বাংলাদেশের ১৩১টি শর্ত মানার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে মাত্র ছয়টি শর্ত। তাই অনেকেই এই চুক্তিকে অসম চুক্তি বলেও উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এবার সে পালে হাওয়া লাগালো ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকা।

সোমবার (১১ মে) বাণিজ্য-স্বাধীনতা হারাবে বাংলাদেশ? আমেরিকার সঙ্গে ইউনুস সরকারের করা বাণিজ্যচুক্তি কেন ঢাকার মাথাব্যথার কারণ? শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গণমাধ্যমটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে আমেরিকার সঙ্গে ইউনুস সরকারের করা বাণিজ্যচুক্তি। শুল্কছাড়ের পাশাপাশি এর বেশ কয়েকটি ধারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে সে দেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ওই চুক্তি বাতিলের দাবিও উঠেছে। বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের দিন তিনেক আগে ‘দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে’ আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে নামিয়ে আনা হয়েছিল ১৯ শতাংশে। তড়িঘড়ি করা সেই চুক্তি নিয়ে বর্তমানে উত্তাল ভারতের প্রতিবেশী দেশ।

ওই চুক্তির পর মনে করা হচ্ছিল, মূলত বস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে ভারতকে কড়া প্রতিযোগিতার মুখে ফেলতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু এই এক শতাংশ শুল্ক কমানোর জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হয়েছে ঢাকাকে। আমেরিকার অনেক দাবি মেনে নিতে হয়েছে মুখ বুজে। তবে চুক্তির বিশদ বিবরণ তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এখন আমেরিকার তরফে চুক্তির বিষয়বস্তু বিশদে প্রকাশিত হওয়ার পর জন্ম নিয়েছে বিতর্ক।

ওই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করতে সম্মত হয়েছিল আমেরিকা। কিন্তু এর বিনিময়ে মার্কিন শিল্প এবং কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে রাজি হয়েছিল বাংলাদেশ।

চুক্তিটি রফতানি-নির্ভর পোশাকশিল্পকে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি দিলেও বাংলাদেশে তা বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। কারণ শুল্কছাড়ের পাশাপাশি এর বেশ কয়েকটি ধারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে সে দেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ওই চুক্তি বাতিলের দাবিও উঠেছে।

কিন্তু কেন এখন বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচনের তিন দিন আগে আমেরিকার সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের করা সেই বাণিজ্যচুক্তি? কী রয়েছে সেই চুক্তিতে?

মূল বিতর্ক অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি সই করার প্রক্রিয়া ও বৈধতা এবং চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে। ৯ ফেব্রুয়ারি ওই চুক্তির পর পরই ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। জনমতে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। তার পরেও প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, একটি দেশের অন্তর্বর্তী সরকার কী ভাবে আমেরিকার মতো একটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সারল? তা-ও আবার নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। কেন বিষয়টি নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করতে হয়েছিল ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে?

পাশাপাশি অভিযোগ, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে কী কী শর্ত ছিল, তা গোপন করা হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণের কাছে। কারণ সে সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আনা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন সেই আলোচনার বিষয়বস্তুও সংশ্লিষ্ট মহলের থেকে গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকমহল। চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা মাথায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ় বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেকে চুক্তিটিকে ‘একপাক্ষিক’ এবং ‘অসম’ বলেও মন্তব্য করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে ‘ডোবানো’র মতো চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিতে এমন সব শর্ত রাখা হয়েছে, যা স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণে বাধা দেবে বাংলাদেশকে। কিন্তু কী এমন রয়েছে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তিতে? ওই চুক্তি বলছে, আমেরিকার কাছ থেকে জ্বালানি এবং ১৪টি বোয়িং বিমান কিনতে হবে বাংলাদেশকে। পাশাপাশি সয়াবিন, গম-সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে বাধ্যতামূলক ভাবে।

সে দেশের বিশেষজ্ঞদের দাবি, বাজার সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রেখে এবং অর্থনীতির নিয়ম ভঙ্গ করে ওই চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিটি মেনে চললে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে পণ্য আমদানি থেকে বঞ্চিত থাকতে হবে বাংলাদেশকে। কম সময়ের মধ্যে পণ্য হাতে পাওয়াও দুষ্কর হবে।

বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনারও শর্ত দেওয়া হয়েছে ওই চুক্তিতে। ফলে বিশেষজ্ঞদের একাংশ এ-ও মনে করছেন, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে পারস্পরিক বাণিজ্যের কথা বলে আদতে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে বাংলাদেশকে। কারণ ওই চুক্তি অনুযায়ী, যদি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় আমেরিকা কোনও রকম সীমান্ত বা বাণিজ্যিক অবস্থান নেয়, তা হলে সেই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে ওই চুক্তির যে শর্ত নিয়ে বিতর্ক চরম সীমায় পৌঁছেছে তা হল, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনও দেশের সঙ্গে এমন কোনও চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবে না যা আমেরিকার স্বার্থের পরিপন্থী। মূলত চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে বাণিজ্য করা থেকে আটকাতেই চুক্তিতে এমন শর্ত আমেরিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও আগের অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে চুক্তিটি গোপন রাখার অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে। বিবিসি নিউজ় বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত যাঁরা ওই চুক্তি সই করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বাণিজ্য মন্ত্রকের প্রাক্তন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

বশিরউদ্দীনের দাবি, আমেরিকা যখন বিভিন্ন দেশে বাড়তি শুল্ক আরোপ করছিল, তখন বাংলাদেশের শুল্ক কমানো হচ্ছিল। ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা যেত না। চাকরি হারাতেন ১২ লক্ষ মানুষ। তাই বাংলাদেশের রফতানি শিল্পের স্বার্থেই ওই চুক্তি করা হয়েছিল। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘‘অহেতুক বিভ্রান্তি বা ঝামেলা সৃষ্টির আগে বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত।’’

কী বলছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার? পুরো বিষয়টি ইতিমধ্যেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষরের পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে ছিলেন খলিলুর রহমান। তিনি ওই সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার খলিলুরকেই বিদেশমন্ত্রী করেছে। তাই আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই বিদেশমন্ত্রী করা হয়েছে খলিলুরকে।

তবে যে চুক্তি নিয়ে এত বিতর্ক তা এখনও সম্পূর্ণ ভাবে কার্যকর হয়নি। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করলেও তার আগেই আমেরিকার সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। এর কারণ, চুক্তি অনুযায়ী, দু’পক্ষই লিখিত ভাবে নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা জানাবে। এর দু’মাস পরে চুক্তি কার্যকর হবে। তবে চাইলে অন্য তারিখও ঠিক করা যেতে পারে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’কে জানিয়েছেন, আমেরিকার সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি কার্যকরের আনুষ্ঠানিকতা এখনও বাকি আছে। বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরেই সব ঠিক হবে।

উৎসঃ আনন্দবাজার.কম অনলাইন ( ১১ মে ২০২৬)

Exit mobile version