রাজনীতিতে স্লোগানের ভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। স্বদেশী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা ও এগার দফার আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ এর সিপাহী জনতার বিপ্লব এবং ১৯৯০ এর গণ আন্দোলনসহ প্রত্যেকটি আন্দোলনে রয়েছে ট্রেডমার্ক কিছু স্লোগান, যেগুলো পরবর্তীকালে কালোত্তীর্ণ ইতিহাস হয়েছে। এই সমস্ত স্লোগান আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলে দিয়েছে বারুদে স্ফুলিঙ্গের মত করে। আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে, বেগবান করতে এবং পরিণতির পথে পরিচালিত করতে এই স্লোগানগুলো মন্ত্রের মত কাজ করেছে। ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে ‘তুমি কে, আমি কে- রাজাকার, রাজাকার। কে বলেছে, কে বলেছে- স্বৈরাচার স্বৈরাচার’- স্লোগানটি ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট। বারুদে খসে পড়া একটি স্ফুলিঙ্গের মতো এই স্লোগান মুহুর্তের মধ্যেই সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে এবং তরুণ সমাজের মধ্যে আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে দেয়। এ সময়ে আরো অনেক স্লোগান রয়েছে যেগুলো বিশেষভাবে স্মরণীয়।
শেখ হাসিনার অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পূর্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের স্লোগান গুলোতে কোন অশ্লীল স্লোগান বা স্লোগানে কোন অশ্লীল শব্দের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। ২০১৮ সালের জুলাই- আগস্ট মাসে সংঘটিত নিরাপদ সড়ক চাই শীর্ষক আন্দোলনে প্রথম অশ্লীল স্লোগানের প্রয়োগ কর্নগোচর হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় স্কুল ও কলেজ লেভেলের শিক্ষার্থীরা। তারা আন্দোলনে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করতে পুলিশের সামনে স্লোগান দেয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে লাল- পুলিশ কোন চ্যা-র ব.ল।’ যতদূর মনে পড়ে সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এটাই প্রথম অশ্লীল স্লোগান। যারা সেদিন স্লোগান দিয়েছিল, হয়তো তাদের অনেকের বাবা, মা, চাচা, ভাই, বোন বা কোন নিকট আত্মীয় পুলিশে চাকরি করতো। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তখন এই অশ্লীলতাও সাধারণ মানুষ নোটিশ করেনি। তবে এরপর থেকেই রাজনীতিতে অশ্লীল স্লোগানের প্রচলন শুরু হয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপকভাবে অশ্লীল স্লোগান ব্যবহার করা হয় দুই পক্ষ থেকেই। কিন্তু পরিস্থিতি তখন এতটাই বিবদমান এবং সহিংস পর্যায়ের ছিল যে, কারো পক্ষে এই বিষয়টি নোটিশ করা সম্ভব হয়নি। আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনা তার সরকার ও পৃষ্ঠপোষক ভারত এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অশ্লীল গালিগালাজ স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে। পাল্টা হিসেবে সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন আন্দোলনকারী ও তাদের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে একই ভাষায় অশ্লীল শব্দ সম্বলিত স্লোগান দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে উভয়পক্ষ প্রতিপক্ষের নেতা-নেত্রীদের গোপন ও একান্ত সময়ের ভিডিও এবং ছবি ছড়িয়ে দেয় অন্তর্জালে।
শেখ হাসিনা পতনের পর মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে এই অশ্লীল স্লোগান। হাসিনা পতন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্র ও তরুণরা সে যে দলের হোক অথবা নির্দলীয়, যেকোনো আন্দোলনেই, যেকোন মিছিলেই ব্যাপকভাবে অশ্লীল স্লোগান ব্যবহার করতে শুরু করে। এমনকি মাঝেমধ্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ যেসব ঝটিকা মিছিল করেছে সেখানেও এই অশ্লীল স্লোগান শ্রুত হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বর্তমানের তরুণরা ও ছাত্ররা যেন সুন্দর ও শালীন স্লোগান দিতেই ভুলে গেছে। অনেকে বক্তৃতাতেও এই অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করছেন। তরুণ ও ছাত্রদের কাছ থেকে এই ধরনের অশ্লীল শব্দের ব্যাপক ব্যবহার মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে শিশুদের মাঝে এবং বিভিন্ন স্তরে। কেবল অশ্লীল স্লোগান বা গালিগালাজ নয়, অশ্লীল বা অশালীন দেহভঙ্গি ও সাইন ব্যবহার করতেও তারা দ্বিধা করছে না। তরুণ ও ছাত্রদের এ ধরনের অধঃগতি ও অধঃপতন অত্যন্ত দুঃখজনক।
আসার কথা হচ্ছে, এই সকল ছাত্রদের মূল সংগঠন বা সিনিয়র সংগঠন এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক স্লোগানে বা বক্তৃতায় কোন অশ্লীল শব্দের ব্যবহার করেনি। বিষয়টি সিনিয়রদের মাঝে সংক্রামক হয়নি। দুয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া সিনিয়র রাজনীতিবিদদের মধ্যে এই গালিগালাজ প্রবণতা দৃশ্যমান নয়। তবে তারা নিজেরা না করলেও তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর এ ধরনের অশ্লীল শব্দের ব্যবহার ও গালিগালাজ বন্ধ করতে কোন ভূমিকা রাখেনি।
কেবল শ্লোগানই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্ট, পোস্ট এবং কমেন্টেও ভয়াবহভাবে অশ্লীল শব্দের ব্যবহার, গালিগালাজ ছড়িয়ে পড়েছে। কারো পোস্ট, কনটেন্ট কারো পছন্দ না হলে বা বিপক্ষে গেলেই কমেন্টে মুহুর্তের মধ্যে হাজার হাজার গালিগালাজ করা হচ্ছে। এটা এতটাই অশ্লীল যে, পড়তেও রুচিত বাধে। সাধারণভাবে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের বটবাহিনী বা কর্মীদেরকে এজন্য দায়ী করা হয়। বলা হয়, তাদের কর্মীরা অসংখ্য ফেক আইডি তৈরি করে এই গালিগালাজে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। এতে সত্যতা থাকলেও, কেবল ওই নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠন নয়, অন্যান্য প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ তরুণরা বর্তমানে দেখাদেখি এই অশ্লীল গালিগালাজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এগুলো ফেক আইডি দিয়ে করা হয় বলে সনাক্ত করা খুব কঠিন যে, কোন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন এ ব্যাপারে এগিয়ে এবং কোনটি পিছিয়ে। তবে যেই এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকুন, অশ্লীল শব্দ একটিও কাম্য নয়। এছাড়াও ওটিটি প্লাটফর্মে তৈরি নাটক এবং সাম্প্রতিক নির্মিত কিছু সিনেমাতে ব্যাপকভাবে গালিগালাজ ও অশ্লীল শব্দের ব্যবহার দৃশ্যমান। সেন্সর বোর্ড কিভাবে এ ধরনের শব্দকে বৈধতা দিয়েছে সেটাই বিস্ময়কর। একটা সময় দেয়াল লিখন ছিল শিল্প। আন্দোলনের কথা, সুন্দর বাক্যাবলি, মনীষীদের উদ্ধৃতি, কবিতা, লেখা থাকতো দেয়ালে। চারুকলার শিল্পীরা দারুণ চিত্রপট আঁকতো দেয়ালে। কিন্তু সেই দেয়াল এক সময় বদলে যায় অশ্লীল স্লোগান, ছবি ও লেখালেখিতে। এদের কোন কোনটি এতটাই অশ্লীল যে, তার পাশ দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হেঁটে যাওয়া মুশকিল। এটা মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের একটা পরিচয় বহন করে।
এই জুলাই আন্দোলনে বিপুল পরিমাণ নারী অংশগ্রহণ করেছে। তারা নির্যাতিত হয়েছে আহত হয়েছে এবং শহীদ হয়েছে। আজ এই নারীদেরকেই টার্গেট করে ব্যাপকভাবে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয় তাদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও, কখনো এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে তাদেরকে সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা, নীলা ইসরাফিল, তাসনুভা, বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানাসহ অসংখ্য নারী রাজনৈতিক নেতাকর্মী জুলাই পরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল বুলিং এর শিকার হয়েছেন। অনেক সময় নিজ দলের কর্মীদের দ্বারাও তারা সাইবার বুলিং এর শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানা এবং এন সি পি নেত্রী নিলা ইসরাফিল নিজেরাও অশ্লীল শব্দ ব্যবহারে পিছপা নন। তারাও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছেন। এগুলো কাম্য নয়।
সামাজিক যোগাযোগ বিচরণের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অশ্লীল গালিগালাজ ও শব্দ প্রয়োগে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় দুই প্রবাসী ইউটিউবার। তারা নিজেরা যেমন এ ধরনের অশ্লীল গালিগালাজ করেন, তেমনি তাদের বিপক্ষে কেউ কমেন্ট করলে তাদের সমর্থকরাও একইভাবে অশ্লীল গালিগালাজ করে জবাব দিয়ে থাকেন। এমনকি কেউ যদি অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে কমেন্ট করে থাকেন, তাহলে উক্ত কনটেন্ট ক্রিয়েটরগণ পাল্টা আরো তীব্র গালিগালাজ করে তার জবাব দিয়ে থাকেন। এভাবে কেবল রাজনৈতিক মিছিল, মঞ্চ ও ময়দান নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই অশ্লীল শব্দ ও গালিগালাজ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। যত দিন যাচ্ছে এর তীব্রতা তত বাড়ছে। এ পরিস্থিতি থামাতে না পারলে একদিন হয়তো জাতিগতভাবে আমাদের গালিগালাজের জাতি হিসেবে ব্র্যান্ডিং হতে হবে।
আমাদের রাজনীতিবিদরা গত এক বছর ধরে সংস্কার করেই চলছেন বিভিন্ন সেক্টরে। এ নিয়ে কোটি কথা, তর্ক-বিতর্ক, বাদ-বিবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু কাউকে এ দাবী করতে শোনা যায়নি যে, আমাদের তরুণদের রাজনৈতিক স্লোগানের সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার কমিটিতে কেউ এই প্রস্তাব দেয়নি। এমনকি রাজনৈতিক দলের বাইরে যারা বিভিন্ন সংস্কার কমিটির সদস্য বা সংস্কার কমিটিতে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন, তারাও কেউ এই দাবি করেননি যে, বাংলাদেশের ছাত্র ও তরুণদের রাজনৈতিক স্লোগানের সংস্কার প্রয়োজন। তবে এখনো সময় আছে, সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, ছাত্র ও তরুণ সমাজ এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার গণের প্রতি অনুরোধ; আপনারা আমাদের ছাত্র ও তরুণ সমাজকে এই গালিগালাজ মুখী হওয়ার পথ থেকে ফিরিয়ে আনবেন। যে বিপ্লবী তরুণ বুকের রক্তের বন্যায় আমাদের ব্যর্থতা ভাসিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে দারুন পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তাদের প্রতিও আহ্বান, আপনারা সমাজকেও ইতিবাচকভাবে পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবেন। আপনাদের রক্তে গড়া সমাজের কোন অধঃগতির উপলক্ষ যেন আপনারা না হন, সে ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। আমাদের ধর্মীয় নেতাগণ এবং গণমাধ্যম এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, যে সকল রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও তরুণ কর্মী ও সমর্থকরা এই অশ্লীল স্লোগান ব্যবহার করছেন, তারা দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাদের ছাত্র ও তরুণ কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান এবং কঠোর নির্দেশ দেবেন যাতে তারা অশ্লীল দেহভঙ্গি, শব্দ ও গালিগালাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। বিপ্লবের চেতনা একটি সভ্য সমাজ ও জাতি। সেটা বিনির্মাণে বিপ্লবীদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।
মেহেদী হাসান পলাশ : সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
উৎস : ইনকিলাব অনলাইন, ২৭ আগস্ট ২০২৫
