রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উদযাপিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপনের লক্ষে গৃহীত দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য বিভিন্ন ইভেন্টসমূহ দেশে বিরাজমান বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে কর্মসূচী সংক্ষিপ্ত করা হয়। এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘টেকসই আগামীর স্পন্দন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন’।
দিবসের কর্মসূচী অনুযায়ী ১৫ জুলাই সকাল ১০টায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে প্রশাসনিক ভবন-১ এর সামনে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের উদ্বোধন করেন মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী। আধুনিক কাতারের স্থপতি ও সাবেক আমীর শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি এর মৃত্যুতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৫ জুলাই ২০২৬খ্রি. তারিখে শোক পালন করায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬’ উপলক্ষ্যে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হয়।
সকালে একাডেমিক ভবন-১ এর সভাকক্ষে পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠান্তে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিগত ২০১৫ সালের ০৯ নভেম্বর থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে রাবিপ্রবি’র আনুষ্ঠানিক একাডেমিক কার্যক্রম শুরু থেকে ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে ঝগড়াবিলস্থ স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরসহ বর্তমানে চলমান একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য ও ছবি সম্বলিত ‘এক নজরে রাবিপ্রবি’ শীর্ষক ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়। এরপর প্রধান অতিথি মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয় রাবিপ্রবি’র জন্য যুগোপযোগী নতুন ওয়েবসাইট উদ্বোধন করেন।
আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয় বক্তব্যের শুরুতে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ও প্রকল্প পরিচালক প্রয়াত প্রফেসর ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমাসহ তাঁর টিম যে নিরলস শ্রম দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করেছেন তাদের সকলকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং প্রথম থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী-শিক্ষার্থীবৃন্দ ছিলেন তাদের সবার অবদান অনস্বীকার্য বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ২০০১ সালের আইনে প্রণীত ৯ নভেম্বর ২০১৫ সালে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এবং দুইটি বিভাগ (সিএসই, ম্যানেজমেন্ট) নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়েছিল যা এখন সুন্দর পাহাড় এবং হ্রদবেষ্টিত স্থানে স্থান পেয়েছে। তিনি ভূমি অধিগ্রহণের ফলে যারা অন্যত্র স্থানান্তারিত হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাদের আত্মত্যাগ তখনি সফলতা পাবে যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নূন্যতম সম্পদ রয়েছে সেটাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে যদি আমরা সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ার জন্য সবাই সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করি, তখনই বিশ্ববিদ্যালয় কাঙ্ক্ষিত মান ও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতে পারে কিন্ত কিভাবে সামাজিক অর্ন্তভুক্তির (ইনক্লুসিভনেস) দিকে আরো এগিয়ে যাওয়া যায় সেজন্য আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে, সবাই মিলে যদি এ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাই, তাহলে নিশ্চিত আমাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হচ্ছে সমস্ত স্টেকহোল্ডার শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় উৎকর্ষতার দিকে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ, শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়, জ্ঞানের সৃজনও একটা কাজ এবং এ সৃজনশীল জ্ঞানের পেছনে নিবেদিত প্রাণ এবং যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক দরকার, তেমনি শিক্ষার্থীবৃন্দের অংশগ্রহণও দরকার। সাথে সাথে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিসিএস পরীক্ষা, গণিত অলিম্পিয়াড, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় জুডো ও কারাতে প্রতিযোগিতা, প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা এবং আমেরিকায় ফুল ব্রাইট স্কলারশীপের মাধ্যমে মাস্টার্সে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ায় তাদেরকে অভিনন্দন জানান। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষক উন্নত বিশ্বে দেশসমূহ থেকে ডিগ্রী সম্পন্ন করায় এবং নয়জন শিক্ষকের Q1 জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ায় অভিনন্দন জানান। তিনি শিক্ষকবৃন্দের উন্নত বিশ্বের লব্ধ জ্ঞান ও গবেষণা কাজের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যলয়কে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস সফল হওয়ায় ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী-শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন রাবিপ্রবি’র রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) জনাব মোহাম্মদ জুনাইদ কবির, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ রহিম উদ্দিন, সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন ড. তৌহিদুল আলম, ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নিখিল চাকমা, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান জনাব মোহনা বিশ্বাস, শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও রাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি জনাব সপ্তর্ষি চাকমা, কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন এস্টেট দপ্তরের উপ-রেজিস্ট্রার ও রাবিপ্রবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জনাব সেতু চাকমা, কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন হিসাব দপ্তরের হিসাবরক্ষক জনাব আসমা আক্তার এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ নাসিরুদ্দীন অর্ণব। সভার সমাপনী বক্তব্য রাখেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সভার সভাপতি ড. তানজিম মাহমুদ।
আলোচনা সভা শেষে মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ইনোভেশন সেন্টার (আরআইসি) এর উদ্বোধন করেন। এরপর মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী দুর্গম এলাকা বাঘাইছড়ি এবং বিলাইছড়িতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রাণ বিতরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রাণ উপ-কমিটি ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী কমিটির নিকট ত্রাণ হস্তান্তর করেন।
উক্ত আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএইচএম) বিভাগের প্রভাষক জনাব ফাহিম হোসেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করেন এফএমআরটি বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ সাওবান, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী চৈতী রুদ্র ও নার্সি চাকমা এবং টিএইচএম বিভাগের শিক্ষার্থী রুথিনা বেসরা।
উল্লেখ্য ‘রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০১’ (৩৯নং আইন, ১৫ জুলাই ২০০১ সাল) দ্বারা রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুমোদন দেয় হয়। ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়।
