parbattanews

রাষ্ট্র জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি কারা এই দেশের আদিবাসিন্দা

মেহেদী হাসান পলাশ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ছবি কলাপ্স পার্বত্যনিউজ।

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বর্তমান সংসদের ডেপুটি স্পিকার। বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি’র হাজার হাজার নেতাকর্মীর মামলা আদালতে বীরত্বের সাথে লড়েছেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয় ও তারেক রহমান এর বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা মামলাগুলোতে তার অবদান স্মরণীয়। বিএনপি’র অনেক আইনজীবী নেতাই যখন এই মামলা নিয়ে নয়-ছয় করেছেন, তখন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল একজন প্রকৃত জাতীয়তাবাদী সৈনিক হিসেবে দলীয় প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের সদস্যদের নামে দেয়া রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলাগুলো মোকাবেলায় তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্বস্ততার সাথে। এ অবদানের জন্য দলীয় মনোনয়নে এমপি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং ডেপুটি স্পিকার পদে দলের চেয়ারম্যান তাকে পুরস্কৃত করেছেন। ডেপুটি স্পিকার হওয়ার পরে তার সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রশংসা আমি বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য, এমনকি কট্টর সরকার বিরোধী ব্লগারদের মুখেও শুনেছি। তার উল্লিখিত কার্যক্রম ও প্রশংসা আমাকে গর্বিত করেছে, আনন্দিত করেছে।

কিন্তু সম্প্রতি তিনি নিজ সংসদীয় এলাকার ট্রাইবাল অধ্যুষিত অঞ্চলের সমস্যা পরিদর্শনে গিয়ে তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে সম্বোধন করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাদেরকে আদি বাসিন্দাও বলেছেন। এবং একই সাথে এটাও বলেছেন যে, ‘তারাই এখানকার আদিবাসিন্দা। আমরা বাঙালরা এখানে এসে তাদের জায়গা দখল করেছি’। এই বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি নিজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বাঙালি বলতেও ভুলে গেছেন। ট্রাইবালদের উচ্চারিত শব্দ ‘বাঙাল’ ব্যবহার করেছেন। তার মত একজন উচ্চ শিক্ষিত, আইনজ্ঞ, দায়িত্বশীল, সংবিধান রক্ষায় শপথ গ্রহণকারী ব্যক্তির নিকট থেকে এ ধরনের ইতিহাস ও সত্য বিবর্জিত এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর অবস্থানের উচ্চারণ অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি, আর এই উচ্চারণ অসচেতন, অজ্ঞানতা ও জনতুষ্টিবাদ তাড়িত।

একজন আইনজ্ঞ হিসেবে তার জানা থাকার কথা, আদিবাসী বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন আইএলও ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক সনদ কেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ স্বাক্ষর করেনি। কেন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই আইন ও সনদ বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি, আদিবাসীদের দেশ হিসেবে খ্যাত বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রগুলো এই কনভেনশন ও চার্টার গুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো আদিবাসী অধ্যুষিত দেশগুলো পার্লামেন্টে নিজের দেশের আদিবাসী জনগণকে আদিবাসী বলে স্বীকৃতি দেয়ার বিল প্রত্যাখ্যান করেছে বিপুল ভোটে। এগুলো তার জানা প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিষয়ে সরকারের অবস্থান তার জানা থাকার কথা ছিল। এমনকি নিজ দলীয় গঠনতন্ত্র ও ইশতেহারে এ ব্যাপারে কোন শব্দগুলো নির্বাচন করা হয়েছে সেগুলো তার না জানা থাকার কোন কারণ নেই।

একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার জানা থাকার কথা, বাংলাদেশের ট্রাইবাল সম্প্রদায়ের এদেশে আগমনের ইতিহাস এবং বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে মানব বসতির ইতিহাস, বাঙালির প্রাচীন ইতিহাস তার অজানা থাকার কথা নয়। এতকিছুর পরও তিনি কেবলমাত্র জনতুষ্টিবাদের উপর ভিত্তি করে যে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন, তা রাষ্ট্রের জন্য কতটা ক্ষতিকর হয়েছে, আমি তাকে স্বনির্বন্ধ অনুরোধ করব বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। আমি আস্থা রাখি তিনি বিষয়টি বুঝতে পারলে, নিজেকে অবশ্যই সংশোধন করে নেবেন। কেননা একজন সাচ্চা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় জন্য ক্ষতিকর এমন কোন বিষয় তিনি কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন, প্রোমোট করবেন এটা আমার বিশ্বাস হয় না। তিনি নেত্রকোনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এই এলাকায় গারো, হাজং ও কোচ ট্রাইবালদের বসতি রয়েছে। প্রমাণিত ইতিহাসে এরা কেউ বাংলাদেশের আদিবাসী না নয়, আদিবাসিন্দাও নয়। এমনকি এদের নিজেদের লেখা ইতিহাস ও বিভিন্ন সাহিত্যে এদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য দেয়া হয়েছে। তাদের লেখা ইতিহাস থেকেই কিছু তথ্য আমি নিম্নে তুলে ধরলাম ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালসহ সকলের জ্ঞাতার্থে:

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘Do reng noktopgita, kilding jakbogita’, অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্বপুরুষদের ধারণামতে, তাদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা ‘Toru’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্বপুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীকালে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এদের আদি বসতি অনুসারে ভারতের মেঘালয়ের একটি পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে গারো পাহাড় হিসেবে। এই পাহাড় শ্রেণীর কিছুটা অংশ বাংলাদেশের ভিতরেও প্রবেশ করেছেজ

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গারোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

(সূত্র: বাংলাদেশ আদিবাসী বিতর্ক মেহেদী হাসান পলাশস, জ্ঞান বিতরণী প্রকাশনী, ঢাকা।)

কেবল ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায় ইতোমধ্যেই শতভাগ ক্রিস্টিয়ান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। ধর্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি ও জীবন যাপনে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এরা সবাই সুস্পষ্ট বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী এবং নিজ ভাষায় খুব কমই কথা বলতে শোনা যায়। কিছুদিন আগে উত্তরবঙ্গের একজন সংসদ সদস্যের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা ও কিছুটা বিতর্ক হয়েছিল। তিনি জোরের সাথে দাবি করছিলেন, সাঁওতাল সম্প্রদায় বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা। আমি তাকে প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিলাম, সাঁওতালদের নিজেদের লেখা ইতিহাসে বলা হয়েছে, তারা ব্রিটিশ আমলে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছেন দুই পর্যায়ে। এরপর তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ছোটবেলা থেকে আমরা এভাবেই শুনে এসেছি।

এই যে অসচেতনতা, এ ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রের! এ রাষ্ট্র জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়নি কারা এই দেশের আদিবাসিন্দা। আমাদের পাঠ্যসূচিতে ট্রাইবাল সম্প্রদায়ের পরিচিতি সম্পর্কে বাচ্চাদের পড়ানো হয়, তারা সাপ, ব্যাঙ, মদ প্রভৃতি খায়। তারা জুম চাষ করে। খুব কম কাপড় পরে ইত্যাদি। বেশিরভাগ সময় এগুলো অত্যন্ত হিউমিলিয়েটিং আঙ্গিকে, ভাষায় তুলে ধরা হয়। যা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। কিন্তু চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, রাখাইন প্রভৃতি সম্প্রদায়ের পরিচিতি সম্পর্কে বাচ্চাদের জন্য লেখা পাঠ্যক্রমে যদি একটি করে বাক্য থাকতো তাদের আদি নিবাস ছিল ভারত, মিয়ানমার, চম্পকনগর, তিব্বত প্রভৃতি। তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সুলতানি আমলে, মোঘল আমলে ও ব্রিটিশ আমলে। সবচেয়ে প্রাচীন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশে ত্রিপুরা সম্প্রদায় এসেছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে। সেকেন্ডারি পর্যায়ের পাঠ্য বইয়ে আমরা আমাদের কিশোরদের পড়াতে পারতাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অপার সম্ভাবনাময় এলাকার নাম। এখানে খনিজ সম্পদ বনজ সম্পদ সহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। ভৌগলিক কারণেও পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রকারী শক্তির শৈন দৃষ্টি রয়েছে এই অঞ্চলের উপর। এ বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

এধরণের কয়েকটি লাইন যদি আমরা আমাদের পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে পারতাম তাহলে আজ ব্যারিস্টার কায়সাল কামালের মত সচেতন ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ এই ভুল করতেন না। কিন্তু রাষ্ট্র সেটি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ‘আদিবাসী’ কনসেপ্ট এর আড়ালে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের রূপরেখা জনগণের মাঝে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ।

Exit mobile version