parbattanews

রিজাংসি চাকমার ওপর বর্বরতা এবং জিম্মি শিক্ষা খাত!

এ এইচ এম ফারুক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও শিক্ষকদের অনুপস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কথা বলে আলোচনায় এসেছিল ‘রিজাংসি চাকমা’ নামে সাধারণ পরিবারের এক তরুণী। কিন্তু পাহাড়ের তথাকথিত অধিকারের ঠিকাদার জেএসএস-এর ক্যাডারদের তা সহ্য হয়নি। তার ওপর বর্বরোচিত হামলা ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে তাকে এবং তার পরিবারকে শেষ করে দেয়ার। সাজেক থেকে উচ্ছেদ করে বিতাড়িত করা।

বারংবার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাপের ফলে হতাশ রিজাংসি চাকমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে তার এবং পরিবারের জীবন ভিক্ষা চেয়েছেন। সে এক পর্যায়ে কান্না করে প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করার বিনিময়ে হলেও তার পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছে সশস্ত্র সংগঠনের নিকট। তার এ আকুতি পাহাড়বাসীর মনে দাগ কেটেছে। উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

এই ঘটনা পাহাড়ের সেই চেনা ও নিষ্ঠুর নগ্ন রূপটিকেই পুনরায় জনসমক্ষে উন্মোচন করেছে। একটি মেয়ে যখন নিজের এলাকার অবহেলিত শিশুদের অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচাতে শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে, তখন তথাকথিত অধিকারের ঠিকাদাররা তাকে পশুর মতো নির্যাতন করে। এই ঘটনা পার্বত্যবাসী তথা বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো স্বাধিকারের লড়াইয়ের নামে এসব কর্মকাণ্ড মূলত চাঁদাবাজি, অর্থ উপার্জন তথা সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের আধিপত্য বিস্তারের খেলা মাত্র।

একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌম মানচিত্রের অভ্যন্তরে এক-দশমাংশ ভূখণ্ড যখন বছরের পর বছর ধরে প্রচ্ছন্ন এক সামন্ততান্ত্রিক ও সশস্ত্র অপশক্তির যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকে, তখন তা কেবল আঞ্চলিক সংকট থাকে না; বরং তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়বাসী এবং দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আরও একবার নির্মমভাবে প্রমাণ করেছে যে—পাহাড়ের এই অস্ত্রধারী আঞ্চলিক সংগঠনগুলো আসলে পাহাড়ের সাধারণ পাহাড়ি তথা জুম্ম কিংবা বাঙালি, কারও বন্ধুই নয়। এদের কোনো আদর্শিক ন্যায়বোধ নেই; এদের একমাত্র লক্ষ্য হলো বন্দুকের নলে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা এবং নিজস্ব কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ করা।

নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে আমি নিজেও একজন জন্মসূত্রে পাহাড়ি। আমার পূর্বপুরুষেরা চট্টগ্রামের পাহাড়িয়া অঞ্চল দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থেকে এসে একসময় এই পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ঠিক যেভাবে ইতিহাস ও নৃ-বিজ্ঞানের অকাট্য দলিল অনুযায়ী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ পাহাড়ের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম অববাহিকা হয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারের আরাকান কিংবা ভারতের ত্রিপুরা ও মঙ্গোলীয় অঞ্চল থেকে এসে এই জনপদে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডে আমরা পাহাড়ি বাঙালি এবং উপজাতিরা পরম মমতায় ও মিলেমিশে একে অপরের প্রতিবেশী হিসেবে বাস করে আসছি। কিন্তু এই দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্প্রীতি ও মেলবন্ধনে প্রথম কুঠারাঘাত করা হয় ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে। ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পাহাড়ের এক শ্রেণির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী এলিটরা বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সেই অযৌক্তিক দাবি পূরণ না হওয়ায়, ১৯৭৩ সালে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রবিরোধী ও উগ্র পন্থায় ‘শান্তিবাহিনী’ নামক একটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে এই স্থায়ী সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ রোপণ করে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস। এরপর থেকে রক্তের সেই ঝর্ণাধারা আজ বহু দূর গড়িয়েছে। আজ এই পার্বত্য জনপদ মূলত আদর্শহীন, বিভক্ত এবং ভাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত অন্তত ৬টি উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্মম জাঁতাকলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

পাহাড়ের এই দীর্ঘস্থায়ী জুলুমের কথা সমতলের মানুষ কিংবা বাঙালিরা বললে স্বার্থান্বেষী আন্তর্জাতিক মহল ও তাদের সুবিধাভোগী এদেশীয় এনজিওগুলো এটিকে মিথ্যা বা প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না। এবার খোদ একজন পাহাড়ের দায়িত্বশীল উপজাতি নেতার জবানিতেই ভেতরের সেই অন্ধকার চিত্রটি আমরা অবলোকন করতে পারি। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা বাবু খনি রঞ্জন ত্রিপুরা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেছেন, যা পুরো পার্বত্য অঞ্চলের ভেঙে পড়া শিক্ষা খাতের এক জীবন্ত দলিল। খনি বাবু অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন—খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার ‘কেষ্ট মনি পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ চারজন শিক্ষক নিযুক্ত থাকলেও শুধু মশিউর রহমান নামের একজন বাঙালি শিক্ষক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন। বাকি ৩ জন উপজাতি শিক্ষক বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে বিদ্যালয়ে ঠিকমতো উপস্থিতই হন না। ৫-৬ কিলোমিটারের মধ্যে বিকল্প কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শতাধিক কোমলমতি উপজাতি শিশুর জীবন আজ স্থায়ী অন্ধকারের মুখে পতিত হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কেন স্থানীয় ভুক্তভোগী সমাজ কিংবা প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না? খনি রঞ্জন ত্রিপুরার বিবৃতিতে সেই আশঙ্কাজনক সত্যটিও উঠে এসেছে। পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র রাজনৈতিক দলগুলোর (ইউপিডিএফ-জেএসএস) সরাসরি বন্দুকের হুমকি ও নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় ও নিরুপায়। এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো বার্ষিক বা মাসিক মোটা অঙ্কের লেভি ও উৎকোচের বিনিময়ে এই সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিদ্যালয় ফাঁকি দিয়ে শহরে অন্য ব্যবসা-বাণিজ্য করার অবৈধ সুযোগ করে দিচ্ছে। আর সেই প্রভাবশালী শিক্ষকেরা নিজেদের বেতনের সামান্য অংশ দিয়ে নামমাত্র মূল্যে ‘বর্গা চাষী’র মতো ‘বর্গা শিক্ষক’ বা ছদ্মবেশী লোক রেখে কোনোমতে খাতা কলমে স্কুল সচল রাখছেন, যা দেশের প্রচলিত আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পাহাড়ের কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবনকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।

এখানে অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন উচ্চারণ করা জরুরি—প্রতিবছর সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক আদায় করা হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ চাঁদাবাজি দিয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সাধারণ ও প্রান্তিক চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো কিংবা মাংখোয়াদের জীবনের কী উন্নয়ন ঘটিয়েছে? পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াতে তারা কি কোনো মানসম্মত উচ্চ বিদ্যালয় কিংবা উন্নত চিকিৎসালয় নির্মাণ করেছে? এর উত্তর হলো—বিন্দুমাত্র না। বরং এই অবৈধ এবং কালো টাকার পাহাড় তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দুটি রাষ্ট্রবিরোধী ও ধ্বংসাত্মক খাতে নিয়োজিত করছে। প্রথমত, ভারী ও অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেনেড ও গোলাবারুদ ক্রয় করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো, যাতে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত জিম্মি রাখা যায় এবং উপজাতিদের ভেতরেই ভাইয়ে ভাইয়ে কৃত্রিম সংঘাত জিইয়ে রেখে রক্তের হোলিখেলা খেলা যায়। দ্বিতীয়ত, বর্তমান বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধের যুগে এই সন্ত্রাসী গডফাদাররা তাদের চাঁদাবাজির টাকার একটি বিশাল অংশ ঢালছে ডিজিটাল অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার পেছনে। তারা মাসিক বেতনের ভিত্তিতে শত শত উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধতায় লিপ্ত বিপথগামী যুবককে সাইবার অপরাধী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এই যুবকেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার ভুয়া বা ‘ফেইক আইডি’ খুলে দিন-রাত দেশের অখণ্ডতা, উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলা গবেষক, কলামিস্ট, সাংবাদিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে চরম নোংরা অপপ্রচার, সাম্প্রদায়িক উসকানি, গুজব সৃষ্টি এবং চরিত্রহননের মতো হীন খেলায় মেতে রয়েছে।

রিজাংসি চাকমার ওপর ঘটে যাওয়া এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা কিংবা কেষ্ট মনি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই দীর্ঘস্থায়ী অচল দশা একটি গভীর চক্রান্তের দিকেই ইশারা করে। পাহাড়ের এই সশস্ত্র চাঁদাবাজ চক্রটি চায় না যে সাধারণ জুম্ম বা বাঙালি শিশুরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সচেতন হয়ে উঠুক। কারণ পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যদি সুশিক্ষিত ও সচেতন হতে শুরু করে, তবে এই সামন্ততান্ত্রিক অবৈধ অস্ত্রের রাজত্ব এবং হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির কর্পোরেট সিন্ডিকেট তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তারা চায় পুরো একটা প্রজন্মকে মূর্খ ও জিম্মি করে রেখে নিজেদের আখের গোছাতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুশীলবদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দেশকে অস্থিতিশীল রাখতে।

আমরা এখন কোনো মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসনে বাস করছি না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা এবং আমাদের মহান সংবিধানের মূল চেতনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকারের অধিকারী। পাহাড়ের এই অনৈতিক ও সশস্ত্র সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কোনোভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশে চলতে দেওয়া যায় না। এখন সময় এসেছে পাহাড় ও সমতলের সকল দেশপ্রেমিক, প্রগতিশীল ও সাধারণ নাগরিককে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানোর। আমাদের দীর্ঘদিনের নীরবতা ও উদাসীনতা এই অপরাধীদের দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া ও শক্তিশালী করে তুলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১ শতাংশ ভূমির পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, প্রতিটি ইঞ্চিতে অভিন্ন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সেনাবাহিনীর কৌশলগত নিরাপত্তা তদারকি জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। আসুন, পাহাড়ের অবহেলিত কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার আলো নিশ্চিত করতে, সাধারণ মানুষের মানবাধিকার রক্ষা করতে এবং সর্বোপরি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে এই অবৈধ অস্ত্রধারী ও সাইবার অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে তীব্র জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

(পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)

ইমেইল: ahmfarukcht@gmail.com

Exit mobile version