★ এক লাখ রোহিঙ্গার সাথে গণ ইফতার করবেন ইউনূস ও গুতেরেস।
★ রাখাইনে সেইফ জোন চাই রোহিঙ্গারা।
★ চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আজ কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে করবেন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্থোনিও গুতেরেস ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সফরকালে গুতেরেস আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৮) একটি লার্নিং সেন্টার, ইউএনএইচসিআর এবং ডব্লিউএফপির সেবা ও ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে যাবেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা, যুব প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা সঙ্গে আলাদা বৈঠক করবেন। সফরের শেষ পর্বে জাতিসংঘ মহাসচিব ও প্রধান উপদেষ্টা এক লাখের বেশি রোহিঙ্গার সঙ্গে বসে গণ-ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব এন্থোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে সর্বশেষ রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এটি মুহাম্মদ ইউনূসের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম সফর।
গেল আট বছরে দফায় দফায় বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ক্যাম্প সফরে আসলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ১২ দশমিক ৫ ডলার থেকে ৬ ডলারে কমিয়ে আনা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় জাতিসংঘ মহাসচিবের এই সফর রোহিঙ্গাদের ভাগ্য ফেরাতে পারে কি-না!
গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ব্যক্তির সফরকে ঘিরে কক্সবাজার এবং উখিয়ায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সাদা পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিয়োজিত রয়েছে এক হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সফরটি রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, এটি মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সম্প্রতি বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা অর্ধেক কমিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরবেন রোহিঙ্গারা এই বলে যে শরণার্থী শিবিরগুলোতে যা মানবিক সংকট আরও বাড়াবে।
কুতুপালং ১ নাম্বার ক্যাম্পের নূর মোহাম্মদ বলেন,” আমরা আর এক মুহূর্তও বাংলাদেশে থাকতে চাই না। বাংলাদেশ কে আর বিপদে ফেলতে চাই না। ৮ বছর হয়ে গেছে কোন সমাধান হয় নাই। এবার জাতিসংঘের মহাসচিব এন্থোনিও গুতেরেস ও বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে দাবি থাকবে, সেইফ জোনের মাধ্যমে আমাদের নিজ দেশ মিয়ানমার ফিরে যেতে চাই। যেভাবে এসেছি সেভাবেই সীমান্ত দিয়ে নিজ দেশে চলে যাব।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের ভাইস চেয়ারম্যান ছৈয়দ হোসেন বলেন, ‘২০১৭ সালে প্রাণ রক্ষায় এসেছিলাম, এবার ফিরে যেতে চাই,। আমাদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কে ধন্যবাদ জানায়। সহযোগিতা যতোই পাইনা কেন, শরণার্থী জীবন ভাল লাগে না, মনটা রাখাইনে পড়ে থাকে। আমাদের কোন সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্থোনিও গুতেরেস ও বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সহযোগিতায় সেইফ জোন সৃষ্টির মাধ্যমে রাখাইনে ফিরতে চাই।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়র বলেন, রোহিঙ্গারা খেতে পাবে না তখন পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে এবং নানা ধরণের অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়বে। চুরি, ডাকাতি করবে, ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাবে। তখন বিশ্ববাসী রোহিঙ্গারা খারাপ এটা বলবে। আমরা এটা চাই না।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব এন্থোনিও গুতেরেস ও বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি দেখতে আসবেন। আমরা খুশি হয়ছি। আমাদের কোন সহযোগিতা প্রয়োজন নাই। আমরা আরাকানে ফিরতে চাই। আমরা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে টেকসই প্রত্যাবাসন সেইফ জোন সৃষ্টির মাধ্যমে রাখাইনে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবি জানাব। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কেও আলোচনা করব।’
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৫ লাখের বেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, খাদ্য সহায়তা কমলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়বে, যা স্থানীয়দের ওপর প্রভাব ফেলবে।
ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, ইতিমধ্যেই স্থানীয়দের শ্রমবাজার অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের দখলে। এখন রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা যদি অর্ধেক নামিয়ে আনা হয় তাহলে স্থানীয়দের শ্রমবাজার পুরোটাই রোহিঙ্গাদের দখলে চলে যাবে।
উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে এখন নানা ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয়রা। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ডব্লিউএফপি রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তার বরাদ্দ কমানো হলে উখিয়া-টেকনাফের মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে দেবে। রোহিঙ্গারা কম পেলে কাঁটাতারের বাইরে এসে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি লুটপাট করবে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হবে। খাদ্য সহায়তা না কমানোর জন্য বহির্বিশ্বের দাতা সংস্থার কাছে অনুরোধ জানাব।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সবচেয়ে বড় সংস্থা জাতিসংঘ, বাংলাদেশ সরকার এবং রোহিঙ্গা তিনটা গ্রুপ উপস্থিত হবেন। আমি আশা করব একটা সমাধান হবে। সেটা যে সমাধান হোক। রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে ফেরত যাবে। তাদের দেশে গিয়ে বসবাস করবে। এটা আমাদের কে ব্যবস্থা করে দিতে হবে, জাতিসংঘকে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি আশা করব ইফতার ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কষ্ট লাঘব হবে এবং রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সুন্দর সমাধানে পোঁছাতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।
