parbattanews

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান : আধুনিক বাংলাদেশের রূপান্তরের এক অনন্য স্থপতি

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদানকে ঘিরে রাজনৈতিক মত পার্থক্য থাকলেও তাঁদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তেমনই এক রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর কর্মময় জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রের বীর সেনানায়ক, রাষ্ট্রগঠনের রূপকার, উন্নয়নচিন্তার পথপ্রদর্শক এবং জাতীয় স্বার্থরক্ষার এক দৃঢ় প্রতীক।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর যখন সমগ্র জাতি দিকনির্দেশনাহীন এক সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছিল, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী জনতার মধ্যে নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করে ছিল। তাঁর সেই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিযুদ্ধে তিনি শুধু ঘোষণাদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীতে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। অসামান্য বীরত্ব ও কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। স্বাধীনতার পর যখন দেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক সংকটে জর্জরিত, তখন জিয়াউর রহমান জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি এমন এক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন, যিনি বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে শৃঙ্খলা এবং হতাশার পরিবর্তে আশার বার্তা দিতে সক্ষম হন। সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁর দক্ষতা যেমন প্রশংসিত হয়েছিল, তেমনি রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও তিনি জনগণের আস্থা অর্জন করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলেছিল। জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়েই দেশে নির্বাচনী রাজনীতির নতুন ধারা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণ আবারও ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পায়।

রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা উপস্থাপন করেন। এই দর্শনের মূল কথা ছিল—ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, পেশা কিংবা আঞ্চলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকল নাগরিকের অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় হবে বাংলাদেশি। এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় ঐক্যের একটি বিস্তৃত ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করেন, যা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছিল।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন যুগান্তকারী সংস্কারক। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে না পারায় তিনি বেসরকারি খাতের বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলেই দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ধারণা, শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ পরবর্তীকালে দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমশক্তি রপ্তানির যে প্রক্রিয়া তিনি উৎসাহিত করেছিলেন, তা আজ কোটি কোটি ডলারের রেমিট্যান্স প্রবাহের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। খাল খনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের যে স্বপ্ন পরবর্তীকালে বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে, তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল তাঁর শাসনামলেই।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠার ধারণা ছিল তৃণমূল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার একটি সাহসী পদক্ষেপ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, উন্নয়নকে যদি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়, তাহলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য।

শিক্ষা, যুব ও নারী উন্নয়নেও তাঁর উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি নারী উন্নয়ন ও যুব উন্নয়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বয়স্ক শিক্ষা, গণশিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের লক্ষ্যে শিশু একাডেমির কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনপ্রিয় ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচির পৃষ্ঠপোষকতা তাঁর ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্রচিন্তারই প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জিয়াউর রহমান ছিলেন এক দূরদর্শী কূটনীতিক। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে তিনি সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংগঠনে পরিণত হয়। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

তিনি মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা দেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সফল হন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা, ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রতি সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট নিরসনে গঠনমূলক ভূমিকা পালন তাঁকে বিশ্বমঞ্চে একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তিনি কখনো আপসকামী ছিলেন না। সীমান্ত নিরাপত্তা, পানির ন্যায্য হিস্যা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ় অবস্থান জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ভর করে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দৃঢ়তার ওপর।

আজ তাঁর শাহাদাতের চার দশকেরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তাঁর চিন্তা ও কর্মের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির যে ভিত্তি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নেতা এসেছেন, অনেক সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু এমন রাষ্ট্রনায়ক খুব কমই আছেন, যিনি একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রদূত, আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রবক্তা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই বিরল রাষ্ট্রনায়কদের একজন।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন নতুন করে আলোচিত হচ্ছে, তখন জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রদর্শন ও উন্নয়নচিন্তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্রগঠনের নীতিমালা আজও বাংলাদেশের কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। আর ঠিক সেই আদর্শ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতাই আজ বহন করছেন এদেশের জনগণের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যেমনটি করেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।ইতিহাসের বিচারে তাই বলা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি আধুনিক বাংলাদেশের রূপান্তরের অন্যতম প্রধান স্থপতি, যার অবদান দেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

E-mail: msislam.sumon@gmail.com

Exit mobile version