স্টাফ রিপোর্টার :
সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যাক্তি বা একক সরকারের কৃতীত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে প্রথম সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের প্রধানমন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬ টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। শনিবার রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৬বছর দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সন্তু লারমা এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কেবল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত লিখিত নয়- এর বাইরেও অনেকগুলো বিষয়ে সরকারের সঙ্গে অলিখিত চুক্তি হয়েছে। মুলত: পার্বত্য চুক্তি হয়েছে লিখিত ও অলিখিত দুইভাবে। চুক্তি স্বাক্ষরের মূল উদ্দেশ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের। কিন্তু গত ষোল বছরে কোনোটাই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি সরকার। এমনকি জনসংহতি সমিতির চার সদস্যের কেবল ২২ হাজার ৭৮৩ টাকার ঋণ মওকুফ করেনি সরকার। অথচ চুক্তি অনুযায়ী সবগুলো শর্ত পালন করেছে জনসংহতি সমিতি। শেখ হাসিনার সরকার পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে নানান তালবাহানা ও প্রতারণা করে করে সময় পার করে দিয়েছেন অভিযোগ করে সন্তু লারমা আরও বলেন, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের গত পাঁচ বছরে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির মাত্র পাঁচবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সরকার উল্লেখযোগ্য কোন উদ্যোগ গ্রহন না করেনি বরং চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি এবং পার্বত্য চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নানান ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারা মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে যে দাবি করেছেন তা তিনি মিথ্যাচার ও পার্বত্যবাসীর সাথে প্রতারণা করেছেন।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়যিত না হলে পাহাড়ের আমাদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে সাবেক এই গেরিলা নেতা আরো বলেন, আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে বর্তমানে নির্বাচনকালীন অন্তবর্তী সরকার চলছে। আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে’ মর্মে অঙ্গীকার প্রদান করা হলেও বিগত পাচঁ বছরে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি কেবলমাত্র প্রতিশ্রুতি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। ইউএনডিপি সিএইচটিডিএফ এর সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ রাঙ্গামাটিতে সুশীল সমাজের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
সভায় ইউএনডিপির সিএইচটিডিএফ এর প্রকল্প পরিচালক রবার্ট ষ্টলম্যান, আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা নির্মল কান্তি চাকমা ও প্রকৃতি রঞ্জন চাকমাসহ জেলার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক জনসংহতি সমিতি পার্বত্যবাসির পক্ষে যা কিছু করণীয় সবকিছু নির্ধারিত সময়ে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করেছে উল্লেখ করে সন্তু লারমা বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত: সরকারেরই। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের কোনো সদিচ্ছা ও উদ্যোগ নেই। তাই সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে। আর এজন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী পাহাড়ী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান সাবেক এই গেরিলা নেতা।
তিনি বলেন, সদ্য বিদায়ী মহাজোট সরকার কেবল সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক, যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান, বীর বাহাদুরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, দীপংকর তালুকদারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং কাপ্তাই ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারসহ ৩৫ অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার ও পূর্বে হস্তান্তরিত বিভাগের সাত প্রতিষ্ঠান ও কর্ম তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর করেছে। মহাজোট সরকারের আমলে চুক্তি বাস্তবায়নের ওইসব উদ্যোগ মূলত: কমিটি পুনর্গঠন ও নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কমিটিগুলো পুনর্গঠিত হলেও চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির পাঁচ বছরে কেবল পাঁচ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ওইসব সভায় চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির কোনো অফিস, লোকবল, অর্থবরাদ্দ কিছুই নেই।
সন্তু লারমা পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন,জনসংহতি সমিতির ৫ দফা দাবির প্রেক্ষিতেই সবগুলো সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংলাপে শুরুতে সেনাবাহিনীই সরকার পক্ষে সংলাপে অংশ নিলেও পরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সংলাপে নেতৃত্ব দেন বলেও জানান তিনি। জনসংহতি সমিতির পক্ষে একটি সংলাপ কমিটি এইসব সংলাপে অংশ নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংলাপের স্মৃতিচারণ করে সন্তু লারমা বলেন, এইসব সংলাপে রাজনৈতিক কূটচাল যেমন ছিলো,তেমনি ছিলো অনেকের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও
সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও।
সন্তু লারমা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন,আঞ্চলিক পরিষদ যেনো অকার্যকর থাকে
সেইজন্য যা যা করার দরকার সরকার সব করছে,সরকারের কারণেই আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা
পরিষদ সক্ষম ও শক্তিশালি হতে পারছেনা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সন্তু লারমা আরো বলেন, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স পুনর্গঠিত হলেও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ও প্রত্যাগত শরণার্থীদের নিজেদের বাস্তুভিটায় পুনর্বাসনের কাজ মোটেও অগ্রগতি লাভ করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে একজন পাহাড়ি সাংসদকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়ার পরও বিধান অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে উন্নয়ন বোর্ড পরিচালিত হয়নি। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও কমিশন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারাগুলো গত পাঁচ বছরেও সংশোধিত হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় (পাহাড়ি) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানে পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যবিধিমালা চূড়ান্তকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন কার্যকর করা হয়নি। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যেমন- আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ (স্থানীয়), ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, মাধ্যমিক শিক্ষা, বন ও পরিবেশ, স্থানীয় পর্যটন, জুমচাষ ও পরিসংখ্যান হস্তান্তর করা হয়নি।
