parbattanews

সাঙ্গু নদী থেকে মারমা মেয়ে মিথিলার জীবন বাঁচাতে এগিয়ে এলেন বাঙালিরা

পাহাড়ে বছরের পর বছর ধরে সেখানে কৃত্রিমভাবে জমিয়ে তোলা হয়েছে অবিশ্বাসের এক দুর্ভেদ্য কুয়াশা। রক্ত ও মাংসে গড়া মানুষগুলোর মাঝখানে টেনে দেওয়া হয়েছে অদৃশ্য কিন্তু ধারালো এক সাম্প্রদায়িকতার কাঁটাতার। অথচ, মহাকালের নিয়মে কিছু ঘটনা এমনভাবে হানা দেয়, যা এক পলকেই ভেঙে চুরমার করে দেয় উগ্রবাদের তৈরি দীর্ঘদিনের সব মিথ্যে দেয়াল।

১১ জুলাই বান্দরবানের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা সাংগু নদীর বুকে ঠিক তেমনই এক অলৌকিক ও মানবিক রূপান্তর ঘটে গেল, যা কোনো কৃত্রিম প্রচারণার চাদরে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে বান্দরবানের বন্যাকবলিত আর্তমানুষের কাছে ত্রাণের আহার পৌঁছে দিতে গিয়ে সাংগু নদীর প্রবল স্রোতে এক ভয়াবহ নৌকা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন বর্তমান সময়ের তুমুল জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ব্লগার ও সমাজকর্মী মিথিলা মারমা যিনি ‘মারমা গার্ল’ নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় ১.৭ মিলিয়ন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত।

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের এই তরুণী দীর্ঘ ১৩ বছরের প্রেমের সফল পরিণতি শেষে মাত্র কয়েক মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সফরের সঙ্গী ছিলেন তাঁর আজীবনের সুখ-দুঃখের সারথি, তাঁর স্বামী।

নদীর সেই করাল গ্রাসে যখন তাঁদের নৌকাটি উল্টে যায়, চোখের সামনে যখন সাক্ষাৎ মৃত্যু ও জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছিল, তখন প্রমত্তা নদীর ঘূর্ণিস্রোতে তাঁরা নিজেদের ভাগ্যকে চরম অসহায় সমর্পণ করেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকৃতির রুদ্ররূপের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল একদল বাঙালি মানুষের অদম্য সাহসিকতা ও পরোপকারিতা।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বালাঘাটা এলাকার স্থানীয় বাঙালি অধিবাসীরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে, একটি বোট নিয়ে ছুটে যান সেই উত্তাল স্রোতের বুকে। তাঁদের তাৎক্ষণিক, অকুতোভয় ও নিঃস্বার্থ উদ্ধার তৎপরতায় মিথিলা মারমা, তাঁর স্বামীসহ মোট আটটি উপজাতি তাজা প্রাণ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসে।

জলমগ্ন নদীর বুক থেকে যখন তাঁদের বাঙালি মাঝির বোটে তুলে নেওয়া হয়, তখন কৃতজ্ঞতায় দু’হাত জোড় করে ক্রন্দনরত মিথিলা ও তাঁর স্বামীর সেই অভিব্যক্তি ছিল মূলত জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার চরণে এক পরম প্রণতি।

এই ঘটনার গভীরতা কেবল আটটি প্রাণ রক্ষার সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চেয়েও বহু গুণ বিস্তৃত। পার্বত্য চট্টগ্রামের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একশ্রেণির উগ্রবাদী আঞ্চলিক সংগঠন ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বছরের পর বছর ধরে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যে সুপরিকল্পিত কুৎসা ও বিষবাষ্প ছড়িয়ে আসছে, এই একটি ঘটনা তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। উপজাতি তরুণীদের মনস্তত্ত্বে প্রতিনিয়ত ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, বাঙালিরা কেবলই ‘ভূমি দখলদার’ কিংবা ‘শোষক’।

বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলা, চলাফেরা, কিংবা কোনো প্রকার আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করলে যেখানে উপজাতি মেয়েদের গণধর্ষণ, হত্যা, নিলাম কিংবা সমাজচ্যুতির মতো বর্বর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়; যেখানে অত্যন্ত হীনভাবে শেখানো হয়, “কথিত সেটেলার বাঙালিদের বোন দিলে দুলাভাই হয় না, মা দিলে বাবা হয় না।” সেখানে এই তথাকথিত তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঙালিরাই এগিয়ে এলো উপজাতি কন্যার জীবন বাঁচাতে। তাই পাহাড়ি-বাঙালি যে সবসময় পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চায় এটাই তার উদাহরণ।

উৎস : লেখকের ফেইসবুক পোস্ট

Exit mobile version