সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা অর্থের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
১৮ জুন বৃহস্পতিবার সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে তাদের ব্যাংকগুলোর দায় ও সম্পদের ২০২৫ সাল শেষের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের নামে পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪২ লাখ সুইস ফ্রাঁ। স্থানীয় মুদ্রায় (প্রতি ফ্রাঁ ১৫৩ টাকা ধরে) যার পরিমাণ ১২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার কিছুটা বেশি। ২০২৪ সাল শেষে যা ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্রাঁ এবং এখনকার বিনিময় হার ধরলে যার পরিমাণ প্রায় ৯০০০ কোটি টাকা।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নামে সবচেয়ে কম জমা ছিল ২০২৩ সালে, যার পরিমাণ মাত্র ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ বা প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২১ সালে ৮৭ কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ বা প্রায় ১৩ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা, গ্রাহক আমানত এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অর্থ এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাখ্যা দিয়েছে, এসব অর্থ মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত পাওনা।
সুইস ব্যাংকে থাকা অর্থের একটি অংশ পাচার হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। তবে পাচার সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকি গ্রাহক আমানত হিসাবে কার কত অর্থ আছে তাও জানা যায় না। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গোপনীয়তার স্বার্থে সমস্ত ডাটা ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ’ নাম বার্ষিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ‘সম্পূরক ডাটা’ হিসেবে সমন্বিতভাবে বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেখানে একটি অংশে দেশওয়ারি পরিসংখ্যান থাকে। আলাদাভাবে কোনো গ্রাহক বা ব্যাংকের তথ্য থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে, বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে যে লেনদেন হয়, তা অর্থপাচার নয়। এই হিসাবের বেশিরভাগই আমদানি–রপ্তানি কেন্দ্রিক। ২০১৭ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সংসদে জানিয়েছিলেন, এর মধ্যে পাচারের সামান্য অর্থ থাকতে পারে।
সুইস ব্যাংক সম্পর্কে
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) (ইংরেজি: Swiss National Bank) হল সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেটি দেশের মুদ্রানীতি প্রণয়ন এবং ব্যাংকনোট সুইস ফ্র্যাঙ্ক ইস্যু ও প্রচলন করে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বিশেষ ফেডারেল আইনের অধীনে গঠিত শেয়ার মালিকানার দ্বারা সীমাবদ্ধ একটি ব্যাংক কোম্পানি। এর দুটি প্রধান কার্যালয় রয়েছে, যার একটি বার্নে এবং একটি জুরিখে অবস্থিত।
সুইজারল্যান্ডের ফেডারেল কাউন্সিলের নির্দেশে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৪-১৯১৭) সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রথমবারের মতো ক্ষুদ্র সংখ্যার নোট প্রকাশ করে। ব্যাংক নোট ডিজাইনের জন্য ১৯৮১ সালে সুইস ব্যাংক ‘ওরেল ফ্যাসলি’ এবং ‘ল্যান্ডিস গির’ নামক অপটিক্যাল গবেষণা গ্রুপের সাথে একটি যৌথ গবেষণায় পরিচালনা করে।১৯৯৪ সালে এটি একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানি হিসাবে নিবন্ধিত হয়। ২০০৪ সালে মে মাসে ফেডারেল সংবিধানের ৯৯নং অনুচ্ছেদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন লাভ করে।
মালিকানা
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার মূলধনের প্রায় ৫৫% রয়েছে সুইস কনফেডারেশনের বিভিন্ন সংযুক্ত এস্টেট, ক্যান্টনাল ব্যাংকসহ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। বাকি শেয়ারগুলি মূলত ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। এসএনবি’র শেয়ার ১৯০৭ সাল থেকে এসএআইএক্স সুইস এক্সচেঞ্জে-এর তালিকাভুক্ত হয়।[৯]
দায়িত্ব
ফেডারেল সংবিধানের ৯৯নং অনুচ্ছেদে ব্যাংকের বেসিক গভর্নিং নীতিগুলি সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হচ্ছে মুদ্রানীতি সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করা অর্থাৎ মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রচলন করা। সংবিধানের বাধ্যবাধকতায় এই ব্যাংক সর্বদা সুইজারল্যান্ডের অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ করবে।
নোট ইস্যু এবং বিতরণ
নোট ইস্যু করার একমাত্র অধিকার এ ব্যাংকের হাতে। তাই অর্থনীতির অবস্থা বিবেচনায় ও তারল্য নিশ্চিতকল্পে এটি ব্যাংক নোট ইস্যু ও সরবরাহ করে। ধাতব মুদ্রা বিতরণের দায়িত্বও এই ব্যাংক পালন করে থাকে।
বৈদ্যুতিক লেনদেন পরিচালনা
সুইস ইন্টারব্যাঙ্ক ক্লিয়ারিং (এসআইসি) পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের অন্যান্য ব্যাংকসমূহের আন্ত ব্যাংক লেনদেন সম্পূর্ণ করতে সহায়তা করা এই ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব।
বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ও বিনিয়োগ
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সংরক্ষণ ও পরিচালনা করে। এছাড়া, মজুদকৃত বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন স্টকে বিনিয়োগ করে থাকে।
আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা
আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতায় বজায় রাখা এই ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা
ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এবং সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক যৌথভাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে অংশ নেয় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে।
কনফেডারেশনের ব্যাংকার
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক সুইস কনফেডারেশন তথা সরকারের ব্যাংকার হিসাবে কাজ করে। এটি কনফেডারেশনের পক্ষে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করে, মানি মার্কেটের বন্ড ইস্যু করে, অর্থের বাজার এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন পরিচালনা করে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক এর সম্পদ সাধারণত শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। ২০১৮ সালে, ব্যাংকের শেয়ার বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৫৩ বিলিয়ন সুইস ফ্র্যাঙ্কে দাঁড়ায়।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতায় রক্ষার জন্য মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও পরিচালনা করে। এসএনবি-এর মুদ্রানীতির তিনটি উপাদান রয়েছে যথাঃ মূল্য স্থিতিশীলতা; মধ্যমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতি পূর্বাভাস; এবং সুদের হারের লক্ষ্যসীমা নির্ধারণ করা। এই তিন উপাদান বা নীতির উপর ভিত্তি করেই সুইস ব্যাংক মুদ্রানীতি পরিচালনা করে।
পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ
শেয়ারহোল্ডারদের সাধারণ সভা বছরে একবার, সাধারণত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যাংক কাউন্সিল
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবসায় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ একটি ‘ব্যাংক কাউন্সিল’ এর উপর অর্পিত থাকে যেটি ১১ জন সদস্য নিয়ে গঠিত। ব্যাংক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টসহ ৬ জন সদস্য ফেডারেল কাউন্সিল মনোনীত এবং ৫ জন সদস্য শেয়ারহোল্ডার মিটিং দ্বারা নিযুক্ত হন। ব্যাংক কাউন্সিল নিজস্ব পর্যায় থেকে চারটি কমিটি গঠন করে। কমিটিগুলো হচ্ছে- নিরীক্ষা কমিটি, ঝুঁকি কমিটি, পারিশ্রমিক কমিটি এবং নিয়োগ কমিটি।
