পাকিস্তান পাকিস্তানিরা বানাই নাই বানিয়েছিল আমাদের পূর্বপুরুষরা

fec-image

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ১৯৭১এ। কেউ যদি ৭১ নিয়ে দূষিত রাজনীতি করে সে দায় তার। তার জন্য একাত্তর দূষিত হয়ে যায় না। যেমন, কেউ যদি ধর্মের অপব্যবহার করে, তার জন্য ধর্ম খারাপ হয়ে যায় না। ৭১ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভিত্তি। কাজেই ১৯৭১ নিয়ে এই দেশে কোন রাজনীতি বা বিতর্ক থাকা উচিত ছিল না। যারা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করবে, বাংলাদেশে রাজনীতি করবে, বসবাস করবে, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কার্যক্রম করবে- কোন আপত্তি ছাড়া তাদেরকে ১৯৭১ মেনে নিতে হবে। ১৯৭১ বাদ দিলে বাংলাদেশে থাকে না। এটাই সত্য।

১৯৭১ এ আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় আমি পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক চাই। সেই সাথে এটাও চাই যে, পাকিস্তান ৭১ প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষের আবেগের সাথে একটি মীমাংসা করে নিক। অন্তত পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দল-মত নির্বিশেষে একটি প্রস্তাব পাস করে ১৯৭১ এর ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করুক। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান শক্তিশালী এবং স্থায়ী সম্পর্ক বিনির্মাণের জন্য ইতিহাসের এই মীমাংসা অত্যন্ত জরুরি। এই খচখচানি বুকের মধ্যে রেখে বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল সম্পর্ক বিনির্মাণ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। এই মীমাংসা যতদিন হবে না, ততদিন যারা বাংলাদেশ-পাকিস্তান শক্তিশালী সম্পর্ক চায় না তারা এটাকে উসকে দেবে। এখনো দিচ্ছে।

পাকিস্তান পাকিস্তানিরা বানাই নাই। আমাদের পূর্বপুরুষ বানিয়েছিল। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান সহ অসংখ্য বাঙালি রাজনীতিবিদ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় যে ভূমিকা রেখেছিল, পাকিস্তানি রাজনীতিবিদরা তার চার ভাগের এক ভাগও ভূমিকা রাখেনি। এমনকি পাকিস্তান প্রস্তাবটাও এই বাংলার মানুষেরই দেয়া। অথচ পাকিস্তান ভাগার পেছনে তাদের ভূমিকাই প্রধান। আমি ইতিহাসের এই অংশ পাঠ করে এটা নিশ্চিত হয়েছি, শেখ মুজিবুর রহমান সর্বশেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানকে অবিভক্ত রাখতে। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। এবং জনগণ তাকে সেই রায়ই দিয়েছিল।

পাকিস্তানের ৫ টি প্রদেশ ছিল। পূর্ব পাকিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া (সীমান্ত প্রদেশ)। এই পাঁচটি প্রদেশ মিলে সৃষ্ট দেশের নাম ছিল পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের পশ্চিমে অবস্থিত চারটি প্রদেশকে একসাথে পশ্চিম পাকিস্তান নামে ডাকতো। এই পাঁচটি প্রদেশ মিলেই পাকিস্তান। কেবল পশ্চিমেরটা আলাদা পাকিস্তান বিষয়টি এমন ছিল না। সর্বশেষ ডিসেম্বরে আমার পাকিস্তান সফরে গিয়ে সেখানে এক গবেষক আমাকে বললেন, ভেবে দেখুন, ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের দেশের একটি প্রদেশ হারিয়েছে। আর পূর্ব পাকিস্তানিরা তাদের দেশের চারটি প্রদেশ হারিয়েছে। কিন্তু এর জন্য পুরো পাকিস্তানিরা দায়ী নয়। এর জন্য দায়ী তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তান যদি আজও অবিভক্ত থাকতো, গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হতো, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিরা এর নেতৃত্ব দিত। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা কিংবা আজকের তারেক রহমান অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতেন। আমি তাকে বললাম, এজন্য তো আমরা দায়ী নই। তোমরা দায়ী। তোমরাই ভেঙেছো। তোমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে চাও নাই। তিনিও সেটা স্বীকার করলেন। ঐতিহাসিক বিচারে তার এই যুক্তি বাতিল করা যায় না।

কিন্তু বাস্তবতা ১৯৭১। এটা কোনভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, তাদের রক্তের বিনিময়ে, ইজ্জতের বিনিময়ে, ত্যাগের বিনিময়ে যেই একাত্তরের বিনির্মাণ তাই সর্বোচ্চ ও অলঙ্ঘনীয় সত্য। ১৯৭১ আমার পূর্বপুরুষের রক্তের শিহরণ, আমাদের প্রজন্মের চেতনার কম্পন। এটাকে না মেনে নিয়ে কিংবা কোনভাবে এড়িয়ে গিয়ে এই দেশে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। আমরা জানি জামায়াতের রাজনীতিতে ১৯৭১ নিয়ে সুস্পষ্ট অস্বস্তি রয়েছে। আন্দালিব রহমান পার্থের ভাষায়, ‘পরাজয়ের দলিল’ হিসেবে ১৯৭১ জামাতকে সবসময়ই বিব্রত করে, পিছে টেনে ধরে, বিতর্কিত করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে যারা পাকিস্তানের দোসর হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিল, বর্তমান জামাতে ইসলামে তাদের সংখ্যা পাঁচ শতাংশের বেশি নয়। এই পাঁচ শতাংশ না থাকলে বর্তমান জামাতের কোন রাজনৈতিক ক্ষতি হবে এটা আমার মনে হয় না। বরং আমি মনে করি, এতে জামাতের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। আমার ব্যক্তিগত মতে, বর্তমান জামাতের ৮০ শতাংশ নেতাকর্মীর জন্ম ১৯৭১ এর পরে। বর্তমানে যারা শিবির করছেন তাদের অনেকের বাবাদের জন্মও ১৯৭১ এর পরে। তবুও তাদের পূর্ব পুরুষের ঘৃণ্য রাজনীতির লেগাসি বহন করতে হচ্ছে।

আমি পূর্বেও বহুবার লিখেছি, বর্তমান জামাত যদি ৭১ প্রশ্নে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মীমাংসা করে নেয় তাহলে এই রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পাবার সুযোগ তৈরি হবে। আর এই মীমাংসা না করে জামাত কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে না। এ কারণেই সারাদেশে ব্যাপক সাংগঠনিক কাঠামো ও বিপুল জনসমর্থন থাকার পরেও রাজনীতি করতে তার সব সময় আমব্রেলা প্রয়োজন হয়। একটা সময় পর্যন্ত দীর্ঘদিন সে বিএনপির ছাতার নিচে ছিল, কিছু সময় আওয়ামী লীগের ছাতাও ব্যবহার করেছে। কিন্তু বিএনপির ছাতা সরে যাওয়ার পর তার সুযোগ ছিল সামনে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার। কিন্তু ওই পুরনো ৭১ তাকে আটকে দিয়েছে। ফলে এন সি পি নামক একটি ছাতা নিজেই তৈরি করে নিজের মাথার উপর ধরে রেখেছে। এমনকি সংসদে বিপুল আসনে জয়লাভ করার পরেও, এন সি পিকে বাদ দিয়ে অথবা কোন ছাতা ছাড়া রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার বাস্তবতা তার তৈরি হয়নি। ১৯৭১ এর প্রশ্নে মীমাংসা না করলে এই সুযোগ তার কখনোই আসবে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, জামাত তো ৭১ প্রশ্নে বহুবার দুঃখ প্রকাশ করেছে। এটা বেঠিক তা বলবো না। অতীতের অনেক জামাত নেতৃত্ব যেমন এটা করেছে, তেমনি বর্তমান আমির সবচেয়ে বেশি দুঃখ প্রকাশ করেছে ৭১ প্রশ্নে। কিন্তু পূর্বেই বলেছি, এ সকল দুঃখ প্রকাশ এ দেশের মানুষের আবেগের বিপরীতে যথেষ্ট ছিল না। এ সকল দুঃখ প্রকাশ এ দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়নি কখনো। এর জন্যও জামাত দায়ী। একদিকে বহুবার দুঃখ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে যখনই সুযোগ পেয়েছে, স্লোগান দিয়েছে- গোলাম আযমের বাংলায়, নিজামীর বাংলায় – অমুকের ঠাঁই নাই। একাত্তর প্রশ্নে দুঃখ প্রকাশ করার পর আপনি গোলাম আযম ও নিজামীকে ওন করতে পারেন না। এই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে গোলাম আযম ও নিজামীকে পরাজিত করেই। আত্মসমর্পণের দলিলেও সেটাই লেখা আছে।

১৯৭১ নিয়ে বারবার দুঃখ প্রকাশ করা সত্ত্বেও জামাত যখনই সুযোগ পেয়েছে ৭১ কে কালমিনেট করা টিফিন করা এমনকি ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করেছে। এরই অংশ হিসেবে ১৯৪৭ প্রথম স্বাধীনতা এবং ২০২৪ দ্বিতীয় স্বাধীনতা বয়ান তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে জুলাইয়ের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধার বিপরীতে জুলাই যোদ্ধা টার্ম গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। এগুলো এদেশের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করেছে। কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দলে টেনে সেই খতে মলম দেয়া যায়নি। একাত্তরের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন, আবার একাত্তরের উচ্চারণ শুনলেই ছ্যাত করে এই এমপির মত তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন- সেক্ষেত্রে এ ধরনের হাজার বারের দুঃখ প্রকাশ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সেজন্য বলেছি, এই দুঃখ প্রকাশ এ দেশের মানুষের আবেগের অনুরূপ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। সেটা করতে পারলে একদিন বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাত নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতেও পারে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন