পর্যটকসহ চারজন উদ্ধার, আটক ১১

কক্সবাজারে কটেজের আড়ালে অবৈধ কারবার, গড়ে উঠেছে টর্চার সেল

fec-image

কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোনে ‘টর্চার সেলের’ সন্ধান মিলেছে; যেখানে বিভিন্ন লোককে জিম্মি করে টাকা আদায়, মাদকের আসর, জুয়া খেলা, দেহ ব্যবসাসহ নানা অপরাধকর্ম সংঘটিত হয়। আবার ছিনতাইকারী, বখাটে, কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ স্থান কটেজ জোন। এসবের নিয়ন্ত্রণ করছে চিহ্নিত কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেতা।

এদিকে, লাইট হাউজ এলাকা সংলগ্ন কটেজ জোনে ‘শিউলি কটেজ’ নামক একটি টর্চার সেলের সন্ধান পায় ট্যুরিস্ট পুলিশ। যেখানে আটকে রাখা হয় পর্যটকসহ চারজন ব্যক্তি।

খবর পেয়ে রোববার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

ঘটনাস্থল থেকে দেশিয় অস্ত্রসহ অপকর্মে ব্যবহৃত নানা উপকরণ উদ্ধার ও দালাল সন্দেহে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম জানান, রোববার মধ্যরাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের লাইট হাউজ এলাকা সংলগ্ন আবাসিক কটেজ জোন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়।

উদ্ধার চারজন হলেন, কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা দক্ষিণ ডিককূল এলাকার হেলাল উদ্দিনের ছেলে ইফাজ উদ্দিন ইমন (১৭), একই এলাকার বেলাল আহমদের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন (১৫), টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ এলাকার নুর মোহাম্মদের দীল মোহাম্মদ (১৭) ও চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ফয়েজ আহমেদ এর ছেলে মো. ইমরান (১৯)।

এদের মধ্যে দীল মোহাম্মদ ও ইমরান উখিয়া উপজেলার পালংখালী স্টেশনের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তারা রোববার সকালে কক্সবাজার বেড়াতে এসে রাত্রিযাপনের জন্য ‘শিউলি’ নামের একটি আবাসিক কটেজে অবস্থান করছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এছাড়া উদ্ধার অপর দুইজন কক্সবাজার শহরে মায়ের চিকিৎসা করতে এসে রাত্রিযাপনের জন্য ওই কটেজে উঠে।

আটক দালালরা হলেন, মো. আলমগীর (৪৫), মো. সেলিম (২০), আকাশ দাস (২৩), মো. জোবায়ের (২৮), মো. মামুন (২২), নাজির হোসেন (২৮), সেকান্দর আলী (২৮), মো. সোহেল (৩০), মো. জাহাঙ্গীর আলম(৩৩), মো. জসিম (২৭), মো. পারভেজ (২৫)।

পুলিশ জানিয়েছে, শিউলি নামের কটেজটির মালিককে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে কটেজটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে মো. রহিম ও লোকমান নামের দুই ব্যক্তি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘রোববার মধ্যরাতে কক্সবাজার শহরের লাইট হাউজ এলাকা সংলগ্ন আবাসিক কটেজ জোন কথিত টর্চার সেলে কয়েকজন পর্যটককে দুর্বৃত্তরা জিম্মি রেখেছে খবরে ট্যুরিস্ট পুলিশের একটি দল অভিযান চালায়। এতে সাইনবোর্ড বিহীন সন্দেহজনক ‘শিউলি’ নামের কটেজটি ঘেরা করলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রবেশ পথের দরজা তালাবদ্ধ করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।’

পরে নানাভাবে বলার পরও দরজার তালা না খোলায় তালা ভেঙ্গে পুলিশ সদস্যরা ভিতরে প্রবেশ করে। এতে কটেজটির ভিতরে কক্ষগুলোতে তল্লাশি করে দুর্বৃত্তদের কাউকে না পেলেও পালিয়ে যাওয়ার গোপন পথের সন্ধান পায়। এসময় একটি কক্ষে আটকে রাখা অবস্থায় দুই শিশু ও দুই পর্যটককে উদ্ধার করা হয়। কটেজে তল্লাশি করে পাওয়া যায় একটি ছোরা, একটি লোহার রড ও আপত্তিকর কাজে ব্যবহৃত নানা উপকরণ।

উদ্ধার হওয়াদের বরাতে ট্যুরিস্ট পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘রোববার রাতে কক্সবাজার শহরের আবাসিক কটেজ জোনে কম ভাড়া কক্ষের খোঁজ নিচ্ছিল ভুক্তভোগীরা। এসময় চলাচলের রাস্তায় অবস্থানকারী লোকজন কম ভাড়ায় কক্ষ ভাড়া দেওয়ার কথা বলে সাইনবোর্ড বিহীন শিউলি নামের কটেজটিতে নিয়ে যান। পরে তারা (ভুক্তভোগী ) কটেজের ভিতরে গিয়ে দেখতে পায়, কক্ষগুলো পর্যটকদের থাকার মত পরিবেশ নেই। এসময় কটেজে ৫ থেকে ৬ জন পুরুষ ও ৩ জন নারীকে দেখতে পায়। এরপর ওই নারীদের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ছবি তুলে ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি। হাতিয়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন। পরে আরও টাকার জন্য স্বজনদের জানাতে তাদের (ভুক্তভোগী) উপর নির্যাতন চালান হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘হোটেল-মোটেল জোনে দেড়-শতাধিক আবাসিক কটেজ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত ২০থেকে ৩০টি কটেজ রয়েছে সাইনবোর্ড বিহীন। সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা মূলত সাইনবোর্ড বিহীন কটেজগুলোকে ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। এরকম আরও কয়েকটি কটেজ টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহারের তথ্য রয়েছে পুলিশের। দুর্বৃত্ত চক্রের সদস্য পর্যটকসহ সাধারণ মানুষকে নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে জিম্মি করে আসছিল।

পরে শিউলি কটেজের আশপাশে অভিযান চালিয়ে দালাল সন্দেহে ১১ জনকে আটক করা হয়। আটকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + 1 =

আরও পড়ুন