জেএসএস নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা, ফের আসন বিক্রির গুঞ্জন পাহাড়ে

fec-image

পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণায় ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে পাহাড়ে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে শেষ মুহূর্তে কোনো কারণ স্পষ্ট না করে নির্বাচন থেকে বিরত থাকা নিয়ে আসন বিক্রির আশঙ্কা করছেন অনেকে। আবার কেউ কেউ বলছেন এটি সন্তু-ঊষাতন দ্বন্দ্ব। এ দু’টি কারণ ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেয়ার পেছনে কৌশলগত কোনো কারণ আছে কীনা তা নিয়েও রয়েছে কৌতুহল।

বিষয়টি নিয়ে পাবর্তনিউজের সম্পাদক ও সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ একটি ফেইস বুক পোস্ট দিয়েছেন। তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না এ ঘোষণা এসেছে দলের পক্ষ থেকে। তবে এর কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। এর আগে রাঙামাটি থেকে উষাতন তালুকদার এবং বান্দরবান থেকে কে এস মং নির্বাচনে অংশগ্রহণের তৎপরতা শুরু করেছিলেন। হঠাৎ কী কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা পরিষ্কার নয়।’

মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘এর আগের নির্বাচনে অভিযোগ উঠেছিল, সন্তু লারমা রাঙামাটি আসনটি ৩ কোটি টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতা দীপঙ্কর তালুকদারের নিকট বিক্রি করেছিলেন। তবে দলীয় প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারকে এই টাকার কোন ভাগ দেয়া হয়নি। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে টানাপোড়নের খবরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। জেএসএস প্রথাগত রাজনৈতিক দল না হওয়ায় এর আভ্যন্তরীণ খবরগুলো বাইরে সেভাবে আসে না। দলীয় কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বা প্রতিদ্বন্দ্বীরা অনেক সময় আভ্যন্তরীণ খবরগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে। এসব খবর সেভাবেই এসেছে। বাস্তবিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এবারেও নির্বাচন থেকে জেএসএসের সরে দাঁড়ানোর কারণ জানা যায়নি। এবারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আসন বিক্রি, সন্তু-ঊষাতন দ্বন্দ্ব, নাকি কৌশলগত কোন কারণ রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা চলছে পাহাড়ে। তবে নির্বাচনে অংশ নিলে তাদের পক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার আভাস ছিল রাঙামাটি ও বান্দরবানে।

পোস্টে উল্লেখ করা হয়, সন্দেহ নেই, জেএসএসের এই সিদ্ধান্তে লাভবান হবে বিএনপি। তবে জামাত যদি সমঝোতার অংশ হিসেবে পাহাড়ের তিনটি আসনে নিজেদের প্রার্থী সরিয়ে দিয়ে এনসিপিকে সমর্থন দেয় এবং জেএসএস উক্ত আসন গুলোতে এনসিপিকে সমর্থন দেয় তাহলে ভিন্ন সমীকরণ দাঁড়াবে এবং সেটা বিএনপিকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

কৌশলগত কারণে জেএসএস বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে ২০০১ সালের মত- এমন অভিজ্ঞতা থেকে মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, ‘শান্তি চুক্তির পর বিএনপি এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে প্রবল আন্দোলন করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে জেএসএস কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তাদের সামরিক শাখার একজন কমান্ডারকে সমর্থনের বিনিময়ে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। স্বাভাবিকভাবে জেএসএসের সমর্থনে রাঙ্গামাটিতে বিএনপি জয়লাভ করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেএসএসের সাবেক ফিল্ড কমান্ডার মনি স্বপন দেওয়ান। মনি স্বপন দেওয়ান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি পার্বত্য চুক্তি বাতিলের দাবি থেকে কেবল সরে আসেনি বরং পার্বত্য চুক্তি সর্বাধিক বাস্তবায়ন করেছে তারাই। এমনকি পার্লামেন্টে বা পার্লামেন্টের বাইরে পাহাড় থেকে নির্বাচিত কোন এমপি শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি সে সময়। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, একই সমীকরণ মাথায় রেখে জেএসএস তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে পাহাড়ে বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে। কেননা বর্তমান বাস্তবতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভ অনেকটাই নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি আগামীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন এবং এক্ষেত্রে জয়লাভ করতে পারলে রাঙ্গামাটির বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দীপেন দেওয়ানের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।’

শান্তি চুক্তির বিষয়টি টেনে মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর পোস্টে বলেন, ‘শান্তি চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ‘আদিবাসী’ প্রভৃতি ইস্যুতে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বর্তমানে বেশ পরিষ্কার। ফলে অনেকের ধারণা, আগামীতে কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে পাহাড়ে এ সকল বিতর্কিত বিষয় বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শান্তি চুক্তি বাতিল অথবা পুনঃমূল্যায়ন এবং ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিগুলো বর্তমানে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বেশ পরিষ্কার।’

বিষয়গুলোর সাথে জেএসএস’র অস্তিত্ব জড়িত উল্লেখ করে মেহেদী হাসান পলাশ তাঁর পোস্টে বলেন, ‘শান্তি চুক্তির আওতায় জনসংহতি সমিতির বিভিন্ন নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিভিন্নভাবে পেয়ে আসছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছেন। ফলে যে কোনভাবে যুক্তিটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে জনসংহতি সমিতির এই নেতাদের বর্তমান সুবিধাগুলোয় টান পড়তে পারে। বিশেষ করে দলের প্রধান সন্তু লারমা টানা ২৮ বছর ধরে প্রতিমন্ত্রীর সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এক ধরনের অভিজাত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু চুক্তিটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তাদের এই সকল সুযোগ-সুবিধা এবং দল হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। এ সকল কারণে, পূর্ব সতর্কতা হিসেবে জনসংহতি সমিতি বিএনপি’র সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ও অস্তিত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে বর্তমান অবস্থান নিয়ে থাকতে পারে বলে আমার ধারণা।’

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: জেএসএস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন