পাহাড়ে ভাষার আর্তনাদ, বিলুপ্তির পথে চার জনগোষ্ঠীর বর্ণমালা ও মাতৃভাষা


চাক সম্প্রদায়ের ৮২ বছর বয়সী প্রবীন লেখক মংমং চাক। তিনি একজন চাক বর্ণমালা উদ্ভাবক ও গবেষক। ২০১১ সালে চাক জনগোষ্ঠীর জন্য বর্ণমালা অক্ষর উদ্ভাবন করেছেন । প্রকাশ করেছেন নিজ ভাষায় ব্যঞ্চনবর্ণ ও স্বরবর্ণ। তিনি নিজ উদ্যোগে চাক ভাষায় গল্প, কবিতা ও স্মৃতিচারণ লিখেছেন। চাক ভাষাটিকে জীবিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু আর্থিক সংকট ও সরকারের পৃষ্টপোষকতার না থাকায় নিজ ভাষায় প্রকাশিত করতে পারেনি আরো চারটি বই। ফলে ভাষাটিকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এই লেখকের।
প্রবীন লেখক ও চাক বর্ণমালা উদ্ভাবক মংমং চাক বলেন, ২০১১সালে চাক বর্ণমালা উদ্ভাবন করা হয়েছে। বর্তমানে চাকের এই ভাষা ও বর্ণমালা থাকলেও তা সরক্ষণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। যার কারণে নতুন প্রজন্ম যারা রয়েছে তারা চাক ভাষা শিখতে আর বর্ণমালা পড়তে কেউ পারেন না।
লেখক বলেন, একটি জাতিগোষ্ঠীর রক্ষার্থে প্রয়োজন বর্ণ ও মাতৃভাষা সরক্ষন। বর্ণমালা হারিয়ে গেলে ভাষা যেমন হারিয়ে যাবে তেমনি জাতিগোষ্ঠীও বিলুপ্ত হয়ে যাবে৷ তাই সরকার যদি এই পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে পাহাড়ে আরো চারটি জাতিসত্ত্বারাও হারিয়ে যাবে।
বান্দরবানের পাহাড়ি পথ বেয়ে এগোলে এখনো শোনা যায় পাখির ডাক, ঝরনার শব্দ আর মানুষের মৃদু কথাবার্তা। কিন্তু সেই কথাগুলোর ভাষা—চাক,খুমি,লুসাই ও পাংখোয়া ভাষা—দিন দিন নিভে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের মুখে আর শোনা যায় না সেই শব্দভান্ডার যা একসময় ছিল তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের বাহক।
বান্দরবানে জেলায় ১১টি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে মারমা, চাকমা, বম, ম্রো, তংচগ্যা,ত্রিপুরা ছাড়াও সংখ্যালগিষ্ট হিসেবে চাক,খুমি,লুসাই ও পাংখোয়া চার জাতিগোষ্ঠীর বসবাস করছেন। অনান্য জনগোষ্ঠী পাশাপাশি তাদের আছে বর্ণমালা, মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি। কিন্তু স্কুলে মাতৃভাষার শিক্ষা নেই, বই নেই, সরকারি উদ্যোগ সীমিত। ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে হারাচ্ছে নিজেদের ভাষা ও বর্ণমালাকে।
তাছাড়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় স্কুলে বাংলা, বাইরে চাকরি-বাণিজ্যে বাংলা ও ইংরেজি—সব মিলিয়ে শিশুদের কাছে নিজের মাতৃভাষা হয়ে উঠছে “অপ্রয়োজনীয়”। ফলে বাড়ির ভেতরেও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এর ব্যবহার। হারিয়ে যাচ্ছে নিজেদের সংস্কৃতি ও মাতৃভাষা বর্ণমালা। এই সম্প্রদায়ের মানুষই চান তাদের ভাষা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাক, এবং টিকে থাকুক ভবিষ্যতের জন্য।
চার সম্প্রদায়ের প্রবীণরা বলছেন, ভাষা যদি না থাকে, তাহলে এই জাতিস্বত্তার মানুষগুলো কি নিয়ে বাঁচবে। বর্ণমালা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে মানুষ’ ভাষা বিলুপ্তির হয়ে গেলে এই জাতিগোষ্ঠীও হারিয়ে যাবে। সরকারে উচিত এই জাতিগোষ্ঠীদের ভাষা ও বর্ণমালা সরক্ষণ করে তাদেরকে টিকিয়ে রাখা।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষার পাঠ্যবইয়ে পাঠদান চালু করতে না পারা প্রসঙ্গে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকেরা মূলধারার সাধারণ শিক্ষার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষিত। তাঁরা মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষায় প্রণীত পাঠ্যবই পড়তে পারেন না। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক নিজের ভাষায় লিখতে ও পড়তে পারেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে পাঠদান করার মতো প্রশিক্ষণ তাঁদের নেই। কিছু মারমা, চাকমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষককে জেলা পরিষদ থেকে এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন নিজ ভাষায় পাঠদানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সেটিও যথেষ্ট ছিল না বলে পাঠদানে অগ্রগতি হয়নি।
শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন পার্বত্য জেলায় চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তিন জনগোষ্ঠীর ৬৬ হাজার ৬৮৭ শিশুকে মাতৃভাষার পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা শিশু ৩৫ হাজার ১৪৫ জন, মারমা ১৮ হাজার ৫১৩ ও ত্রিপুরা ১২ হাজার ৭৫৬ জন।
২০২২ সালে পরিসংখ্যা বলছে, বান্দরবান জেলাতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্য প্রায় ১লক্ষ ৯৭ হাজার ৯৮৩। তার মধ্যে খুমি ৩ হাজার ২৮৭, চাক ২ হাজার ৬৬৩ ও অনান্য জাতিসত্তা রয়েছে ২৭৩ জন। তারমধ্যে সবচেয়ে জনসংখ্যা কম চাক, খুমি, লুসাই ও পাংখোয়া।
চাক জনগোষ্ঠীর বিজয়,মাবোয়াচিং চাক বলেন, ছেলে মেয়েরা এখনো নিজেদের বর্ণমালা শিখতে পারছে না। যার কারণে কেউ চাক বর্ণমালা পড়তে পারছে না। এই চাক ভাষা যদি সরক্ষণ করা না গেলে বিলুপ্তির ঘটবে।
একই কথা জানালেন, লুসাই,খুমি,ও লুসাই সম্প্রদায়ের নাফ্রাং,লেলুং খুমি ও পারকুম লুসাই। তারা বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্যঞ্চলের সবচেয়ে কম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তারাও একটি। কিন্তু সবকিছু থাকার সত্ত্বেও বর্ণমালা ও ভাষা বিলুপ্তির পথে রয়েছে।
ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী ইন্সটিটিউটের পরিচালক নুক্রাচিং মারমা বলেন, ১১টি জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে সরক্ষণ রাখতে বর্ণমালা ও ভাষা প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। একই সাথে নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা শিখাতে প্রতিযোগিতা মাধ্যমে পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। যাতে করে সব সম্প্রাদায়ের মানুষ নিজের নিজের ভাষায় পড়তে ও লিখতে আগ্রহী হয়।

















