রামগড়ে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত উন্মুক্ত হচ্ছে: নির্মাণ হচ্ছে স্থলবন্দর

fec-image

কাছেই সমুদ্র বন্দর তাই স্বল্প সময়ে সীমান্ত পার হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার জন্য দু দেশের জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠছে বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্তশহর ‘রামগড়’। জেলা সদর থেকে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার দূরে রামগড় পৌরসভার কাছেই নির্মাণ হচ্ছে স্থলবন্দর।

অন্যদিকে, রামগড়ের মহামুনি এবং ত্রিপুরার আনন্দপাড়া সীমান্তকে যুক্ত করতে ফেনী নদীর উপর তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১। যা পার হলে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরত্বেই নাগাল মিলবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের। ফলে ভারতের ভূমিবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রবেশমুখ হবে ত্রিপুরা। আর বাংলাদেশী বন্দরের মাধ্যমে সরাসরি আমদানি-রফতানির সুযোগ পাবে ওই অঞ্চলের সাতটি রাজ্য।

এর আগে আশুগঞ্জকে ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আখাউড়া-আগরতলা দিয়ে প্রবেশের যে দ্বারটি ভারত পেয়েছিল তার মূল ভিত্তি ছিল মংলা বন্দর। এছাড়া ভারতের সঙ্গে সর্বশেষ স্বাক্ষরিত নৌ প্রটোকল চুক্তির আওতায় থাকা তিনটি রুটের মধ্যে কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল হয়ে বাংলাদেশের চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরব বাজার এবং আশুগঞ্জ রুট ধরে এসে স্থল পথে আখাউড়া সীমান্ত পার হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনেরও সুযোগ পেয়েছে ভারত।

তবে আশুগঞ্জ-আখাউড়ার ওই রুটটি ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হচ্ছে ৩৫০ কিলোমিটার পথ। তারও আগে কলকাতা থেকে আসামের গৌহাটি ঘুরে ত্রিপুরার আগরতলা যেতে পাড়ি দিতে হতো ১৬৫০ কিলোমিটার পথ। কিন্তু এবার ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ধরে সড়ক পথে মাত্র ৭২ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই রামগড় সীমান্ত এবং সীমান্তের ওপারে সাব্রুম-উদয়পুর হয়ে ১৩৩ কিলোমিটারের মাথায় আগরতলা।

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর শর্টকাট রুটের এই সুবিধা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রামগড়ে স্থলবন্দর স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল। জানা গেছে, ওই বছরের ২৮ জুলাই স্থলপথ ও অভ্যন্তরীণ জলপথে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি-রপ্তানির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পয়েন্টে ১৭৬টি শুল্কস্টেশনের তালিকা ঘোষণা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ওই তালিকার ৪৮ নম্বরে ছিল রামগড় স্থল শুল্ক স্টেশনের নাম। কিন্তু দীর্ঘদিন উদ্যোগটি চাপা ছিলো।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফেনী নদীর ওপর প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ এর ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন করেন। ন্যাশনাল হাইওয়েজ এন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার (এনএইচআইডিসিএল) তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করে গুজরাট ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আগরওয়াল কনস্ট্রাকশন।

পরিকল্পনা হচ্ছে আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৪ দশমিক ৮০ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হবে। ভারত সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত সেতুটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

সেতু থেকে ওপারে প্রায় ১২শ মিটার অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ হচ্ছে। যা নবীনপাড়া-ঠাকুরপল্লী হয়ে সাব্রুম-আগরতলা জাতীয় সড়কে যুক্ত হবে। এদিকে বাংলাদেশ অংশে রামগড়-বারৈয়ারহাট হয়ে ৩৮ কিলোমিটার চার লেনের অ্যাপ্রোচ রোড ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা বাস্তবায়ন করবে।

এছাড়া বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তত্বাবধানে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রামগড়ে ১০ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে দেশের ২৩তম স্থল বন্দর। এ প্রক্রিয়ায় জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ হবে এবং এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা।

সর্বশেষ গেল জুনে স্থলবন্দর ও মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাস। এরও আগে গত বছরের জানুয়ারিতে এক সঙ্গে পরিদর্শনে গেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা। সবারই বক্তব্য বন্দর, সেতু এবং কানেকটিভিটি পাহাড়ে প্রবৃদ্ধি বাড়াবে, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়বে কর্মসংস্থানও। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে বিবিআইএন-মটর ভেহিকেল এগ্রিমেন্ট ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বিষয়ক একটি সংলাপ অনুষ্ঠানেও ওই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় সরকারের সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব সালমা আক্তার খুকীর বক্তব্যে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘টার্গেট চট্টগ্রাম বন্দর’। বিশেষ করে সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত ভূমিবেষ্টিত ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচলের ব্যবসায়ী ও সরকার কম সময় ও কম ব্যয়ে আমদানি রফতানি করে উপকৃত হবেন।

আর বাংলাদেশ ‘লাভবান হবে’, ‘সুফল পাবে’ এমন সব বক্তব্যকে ‘বিজ্ঞাপনী বুলি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থনীতিবিদ এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, রিজিওনাল কানেকটিভিটির নামে যা কিছুই হচ্ছে তার সবগুলোই ভারতের ট্রানজিট পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থের কিছু নেই।

তিনি আরও বলেন, দেখা যাচ্ছে ওইসব পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সড়কের উন্নয়ন করা হচ্ছে। যোগাযোগের অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। তাতে পরিবেশের ক্ষতির একটা দিক আছে, অন্যান্য আরও কিছু ঘটনা আছে। কিন্তু সরকার কখনোই এ নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেনি। গবেষণাও করেনি। নির্দিষ্ট করেও বলছেনা লাভটা কোথায় হবে এবং ক্ষতিটা কি হতে পারে।

সূত্র: সাউথএশিয়ানমনিটরডটকম

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × five =

আরও পড়ুন