রেইনবো নেশন ও পাহাড়ের বাঁকবদল : অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির এক নতুন দিগন্ত


২০২৬ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র যখন এক নতুন রেখায় অঙ্কিত হচ্ছে, তখন আমাদের দৃষ্টি কেবল সমতলের জনপদে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ফলাফল আজ আমাদের সামনে উন্মোচিত হলো, তাতে সবচাইতে বড় চমক এবং একইসঙ্গে গভীর স্বস্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। দীর্ঘ কয়েক দশকের অস্থিরতা, আস্থার সংকট আর উন্নয়নের নামে প্রান্তিকীকরণের যে চোরাবালিতে পাহাড়ের রাজনীতি আটকে ছিল, আজ তার অবসান ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপির) চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতে যে ঐতিহাসিক ৩১ দফা ঘোষণা করেছিলেন, তার অন্যতম প্রাণভোমরা ছিল ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। এই দর্শনটি যে কেবল তাত্ত্বিক বিলাসিতা ছিল না, তার প্রমাণ আজ হাতেনাতে পাওয়া গেল খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের নির্বাচনী ফলাফলে। ২৯৮, ২৯৯ এবং ৩০০ নম্বর আসনে যথাক্রমে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞা, এ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এবং সাচিং প্রু জেরির বিজয় কেবল ধানের শীষের বিজয় নয়, বরং এটি একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের স্বীকৃতি। এই বিজয় বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের কেবল ভোটের পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না, বরং এর গভীরে থাকা অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতার জট খোলার প্রক্রিয়াটিও বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে যে ‘মেজরল্যাটারিয়ানিজম’ বা সংখ্যাগুরুবাদ সক্রিয় ছিল, তা পাহাড়ের মানুষের মনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করেছিল। রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক কাঠামোয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব সত্তা আর সাংবিধানিক স্বীকৃতির অভাব বছরের পর বছর ধরে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়েছিল। জনাব তারেক রহমান যখন তার ৩১ দফায় রেইনবো নেশনের ধারণাটি অন্তর্ভুক্ত করলেন, তখন তিনি আসলে সেই দেওয়াল ভাঙার হাতুড়িটিই হাতে নিয়েছিলেন। এই ধারণার মূলে রয়েছে এক এমন জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে শাড়ি, লুঙ্গি কিংবা খামির পোশাকের মধ্যে কোনো বিভেদ থাকবে না; বরং বৈচিত্র্যই হবে শক্তির উৎস। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি দেশের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মূলধারায় অংশগ্রহণের ওপর। পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় দশ শতাংশ। এই বিশাল এলাকাকে কেবল নিরাপত্তার চশমায় দেখে আমরা এতদিন যে অর্থনৈতিক ক্ষতি করেছি, তার সুযোগ ব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট ছিল আকাশচুম্বী। আজ পাহাড়ের তিনটি আসনে বিএনপির এই নিরঙ্কুশ বিজয় প্রমাণ করে যে, পাহাড়ের মানুষ শান্তি এবং উন্নয়নের এক টেকসই ও সম্মানজনক অংশীদারিত্ব চেয়েছে, যা রেইনবো নেশন কনসেপ্টের মাধ্যমে তারা খুঁজে পেয়েছে।
খাগড়াছড়ি আসনে আবদুল ওয়াদুদ ভূঁঞার বিজয় আসলে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন থাকা জরুরি, তিনি দীর্ঘকাল ধরে তার এক ধরনের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। এই আসনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম, বিশেষ করে ভারতের সাথে সীমান্ত বাণিজ্য এবং পর্যটনের প্রসারে খাগড়াছড়ি এক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে উন্নয়নের সুফল কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকার যে অভিযোগ ছিল, তার বিরুদ্ধে মানুষ আজ রায় দিয়েছে। রেইনবো নেশন দর্শনের আলোকে তিনি যখন পাহাড়ি-বাঙালি ভেদাভেদ ভুলে নাগরিকত্বের সমঅধিকারের কথা বলেছেন, তখনই মানুষের মনে বিশ্বাসের জায়গাটি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা জানেন, যখন কোনো অঞ্চলে সামাজিক পুঁজি বা সোশ্যাল ক্যাপিটাল বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে আসে। খাগড়াছড়ির এই ম্যান্ডেট স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, মানুষ এখন আর সংঘাত নয়, বরং আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ বাজার অর্থনীতি চায়।
রাঙামাটির ২৯৯ নম্বর আসনে এ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের বিজয় এই অঞ্চলের আইনগত ও সাংবিধানিক সংগ্রামের এক বড় স্বীকৃতি। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং একজন আইনজ্ঞ হিসেবে পাহাড়ের ভূমি সমস্যা এবং সাংবিধানিক জটিলতাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তারেক রহমানের ৩১ দফার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার। দীপেন দেওয়ানের মতো একজন অভিজ্ঞ মানুষকে যখন বিএনপি বেছে নিয়েছে, তখন তা পাহাড়ের মানুষের কাছে এই বার্তাই দিয়েছে যে, আগামী দিনের পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কেবল প্রথাগত আইনের বেড়াজালে আটকে থাকবে না। পাহাড়ের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেখানে কোনো বড় ধরণের বেসরকারি বিনিয়োগ আসা সম্ভব নয়। আজ রাঙামাটির মানুষ ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে আসলে সেই আইনি নিশ্চয়তাটুকুই চেয়েছে। রেইনবো নেশনের ধারণাটি এখানে কাজ করেছে এক সেতুবন্ধন হিসেবে, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক অধিকার বড় হয়ে উঠেছে। এই আসনে জয়ের ফলে কাপ্তাই হ্রদ সংলগ্ন মৎস্য শিল্প এবং রাঙামাটির হস্তশিল্পের যে রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে, তা উন্মোচনের এক বড় সুযোগ তৈরি হলো।
বান্দরবানের ৩০০ নম্বর আসনে সাচিং প্রু জেরির বিজয় আমাদের এক নতুন বার্তা দেয়। এই আসনটি সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং প্রভাবশালী প্রার্থীদের দখলে ছিল। মারমা সম্প্রদায়ের এই প্রবীণ ও জনপ্রিয় নেতার জয় এটাই প্রমাণ করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃত্ব এখন আর কেবল স্থানীয় আঞ্চলিক দলগুলোর সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে নেই। জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন জাতীয়তাবাদী আদর্শের সাথে আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছে, তখনই সাচিং প্রু জেরির মতো নেতারা জাতীয় মূলধারার রাজনীতিতে পাহাড়ের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। বান্দরবানের পর্যটন শিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে যে ধরণের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার, তা রেইনবো নেশনের চেয়ে আর কোনো ভালো মডেলে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বান্দরবানের পাহাড়ি কৃষিপণ্য বিশেষ করে আদা, হলুদ এবং ফলের একটি বিশাল বাজার ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে তৈরির সুযোগ আছে। কিন্তু এর জন্য দরকার ছিল এমন এক নেতৃত্ব যা কেন্দ্র ও প্রান্তের মধ্যে কোনো দূরত্ব রাখবে না। সাচিং প্রু জেরি সেই দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছেন।
আসলে জনাব তারেক রহমানের এই ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি কেবল নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার কোনো ইশতেহার ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশের আগামী ৫০ বছরের এক ব্লু-প্রিন্ট। বিশেষ করে রেইনবো নেশন ধারণাটি আমাদের ‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের বিতর্ককে এক সুন্দর যৌক্তিক উপসংহারে নিয়ে এসেছে। এই দর্শনের কারণে পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো মনে করছে যে, তারা আর ‘সংখ্যালঘু’ নয়, বরং এই রাষ্ট্রের মালিকানায় তাদের অংশও সমান। এই মালিকানাবোধ যখন তৈরি হয়, তখন দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা উত্তোলনের জন্য স্থানীয়দের সম্মতি ও অংশগ্রহণ অনিবার্য। গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি, উন্নয়নের নামে অনেক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও স্থানীয় মানুষ তা থেকে বিচ্যুত ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে পাহাড়ের মানুষ যে রায় দিল, তা বলে দিচ্ছে তারা এখন উন্নয়নের অংশীদার হতে চায়, কেবল সুবিধাভোগী নয়।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত হলো রাজনৈতিক ঐক্য। তারেক রহমান যখন জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন এবং সেখানে পাহাড়ের সব সংকটের সমাধানের পথ হিসেবে রেইনবো নেশনকে উপস্থাপন করেছেন, তখন তিনি আসলে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষার নামে যে বিশাল পরিমাণ অর্থ বার্ষিক বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হয়, যদি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সেই অর্থের একটি বড় অংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা সম্ভব হবে। একেই অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘পিস ডিভিডেন্ড’ বা শান্তির লভ্যাংশ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানের এই তিনটি আসন থেকে বিজয়ী প্রতিনিধিরা যখন সংসদে গিয়ে পাহাড়ের কথা বলবেন, তখন তাদের পেছনে থাকবে এই রেইনবো নেশনের শক্তিশালী দর্শন। এটি আমাদের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রেও এক বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক মহলে আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারব যে, বাংলাদেশ তার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর অধিকার নিশ্চিতে এক অনন্য মডেল তৈরি করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বিজয়ের পর আমাদের করণীয় কী? একজন গবেষক এবং বিশ্লেষক হিসেবে আমি বলব, এই বিজয় মানেই দায়িত্বের পাহাড়। পাহাড়ের ভূমি সমস্যা নিরসনে ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা এবং সেখানে রেইনবো নেশন দর্শনের প্রতিফলন ঘটানোই হবে প্রথম চ্যালেঞ্জ। তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে যদি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা যায় এবং পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে সত্যিকারের স্বায়ত্তশাসন দেওয়া যায়, তবেই এই বিজয়ের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের এখন ভাবা দরকার একটি ‘মাউন্টেন ইকোনমি’ বা পাহাড়ি অর্থনীতি গড়ার কথা। নেপাল কিংবা ভুটান যেভাবে তাদের পাহাড়কে পুঁজি করে বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়েছে, আমাদের পার্বত্য তিন জেলাও তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তবে এর জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা বিএনপির এই নতুন দর্শনে স্পষ্ট।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন আমাদের শিখিয়ে দিল যে, মানুষের আবেগকে সম্মান দিলে তারা তার প্রতিদান দেয়। তারেক রহমানের সাহসী নেতৃত্ব আর পাহাড়ের মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধের যে পরিচয় রেইনবো নেশন কনসেপ্টে ছিল, তার ফসল আজ ঘরে উঠেছে। এই বিজয় কেবল একটি দলের নয়, বরং এটি ১৮ কোটি মানুষের (এবং পাহাড়ের ১৫ লাখ মানুষের) অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বপ্নের জয়। আমরা এখন এমন এক বাংলাদেশের অপেক্ষায় আছি যেখানে রেইনবো বা রংধনুর প্রতিটি রঙের মতোই প্রতিটি জাতিসত্তা তার নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। জাতীয় ঐক্যের এই বৃহত্তর দর্শনের মাধ্যমেই আমরা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারব। পাহাড়ের তিন আসনের এই ঐতিহাসিক ফলাফল কেবল একটি শুরু মাত্র, যা সমতলের রাজনীতিকেও এক নতুন পথ দেখাবে। সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় সংহতির এই যে ধারা তৈরি হলো, তা যেন কোনোভাবেই আবার কক্ষচ্যুত না হয়, সেটাই আজ আমাদের সবার কাম্য হওয়া উচিত।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: [email protected]

















