“গুচ্ছগ্রামে বন্দী বাঙালিদের দাবি, ‘আমরা আর বন্দি জীবন চাই না। আমাদের নিজ বসতভিটা ফিরিয়ে দিন। সেখানেই চাষাবাদ করে জীবন ধারণ করবো।’ দিঘীনালার সোনামিয়া টিলা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালেক পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা গুচ্ছগ্রামে বন্দী জীবন কাটাতে চাইনা। সরকার যদি আমাদের নিজস্ব বসতভিটা ফিরিয়ে দেয় আমরা নিজেদের জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবো। আমাদের আর রেশন দরকার হবে না। আমরা রেশন খেতে চাই না।”
রেশন কার্ড- ২

রেশন নয়, নিজের জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চায় পার্বত্য বাঙালিরা

fec-image

গুচ্ছগ্রামের বসবাসকারী ৯০ ভাগ পরিবারের রেশন কার্ড সিন্ডিকেটের হাতে। যাদের হাতে কার্ড রয়েছে তাদের মাঝে রেশন বিতরণ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। নিম্নমানের চাউল নিতে বাধ্য করা, না নিলে কম দামে কিনে নেওয়ার অভিযোগ নিত্য দিনের। তবে সাম্প্রতিককালে গুচ্ছগ্রামগুলোতে প্রকল্প চেয়ারম্যানের পরিবর্তে প্রশাসনিকভাবে রেশন বিতরণ হওয়ায় কার্ডধারীরা রেশন ঠিকমত পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, গুচ্ছগ্রামের জন্য বরাদ্দ খাদ্যশস্যের ৮০/৯০ ভাগই খাগড়াছড়ি আসে না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৌশলে খাদ্যশস্য থেকে যায় চট্টগ্রামে। অথচ খাদ্যশস্য খাগড়াছড়ি আনার ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা পরিবহন খরচ লোপাট হচ্ছে।

পুনর্বাসন জটিলতা ও নিরাপত্তার অজুহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে রেশন নির্ভর ৪০ হাজার ৩শ ২৫টি পাহাড়ি-বাঙালি পরিবারের পেছনে প্রতি বছর সরকারের শত কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৬ হাজার ২শ’ ২০ পরিবার পুনর্বাসিত বাঙালি, ১২ হাজার ১শ’ ৭০টি ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ি এবং ১ হাজার ৯শ’ ৪৫ পরিবার অস্ত্র জমাদানকারী শান্তি বাহিনীর সদস্য।

এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ ধরণের রেশন ব্যবস্থার কারণে গুচ্ছগ্রামগুলোতে রেশন কার্ডের বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের জন্ম নিয়েছে। বিশেষ করে বাঙালি গুচ্ছগ্রামগুলোর রেশন কার্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি গুচ্ছগ্রামের হত-দরিদ্র মানুষগুলো। গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগেও রয়েছে কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ।


এই সিরিজের প্রথম পর্ব পড়ুন

‘পাহাড়ীরাও রেশন খায়, অথচ কেবল বাঙালিদের দিকেই আঙুল তোলা হয়’


তথ্যানুসদ্ধানে জানা গেছে, ১৯৮৬-৮৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তৎকালীন এরশাদ সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে পুনর্বাসিত ২৬ হাজার ২শ’ ২০ বাঙালি পরিবারকে ৮১টি গুচ্ছগ্রামে আনা হয়। শুরু হয় পরিবার প্রতি রেশনের ব্যবস্থা। কথা ছিল স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে এলে এ রেশন ব্যবস্থা পরবর্তী তিন বছর চালু থাকবে। কিন্তু এসব পরিবার আর নিজ বসতভিটায় ফিরে যেতে না পারায় গত দুই যুগের অধিক সময় ধরে পরিবার পিছু ৮১ কেজি করে রেশন প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

অপরদিকে ১৯৯৮ সালে ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ১শ’ ৭০ পরিবার পাহাড়ি ও অস্ত্র সমর্পণকারী শান্তিবাহিনীর ১ হাজার ৯শ’ ৪৫টি পরিবারের পরবর্তী এক বছরের জন্য রেশন দেয়ার কথা থাকলেও দেড় যুগের অধিক সময় ধরে প্রতি জন প্রাপ্তবয়স্ক ২১ দশমিক ৭০ কেজি হারে ও অপ্রাপ্তবয়স্করা মাথাপিছু ১০ দশমিক ৮৫ কেজি হারে এবং অস্ত্র জমাদানকারী শান্তিবাহিনীর ১ হাজার ৯শ’ ৪৫ পরিবার কার্ডপ্রতি ১শ’ কেজি হারে রেশন পেয়ে আসছে।

রেশন কার্ড

সূত্র মতে, গুচ্ছগ্রামের বাঙালি পরিবার, ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী ও অস্ত্র সমর্পণকারী শান্তিবাহিনীর পরিবারের পিছনে সরকারকে প্রতিমাসে খাদ্যশস্য বরাদ্দ দিতে হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৭শ’ ১২ মেট্রিক টন। সে হিসেবে প্রতিবছর বরাদ্দ দিতে হয় প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। সম্পূর্ণ অনুৎপাদন খাতে বরাদ্দ দেয়া এসব খাদ্যশস্য যার বাজার মূল্য শত কোটি টাকার উপরে।

অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের রেশন ব্যবস্থার কারণে সরকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও লাভবান হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম কেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেট। গুচ্ছগ্রামের বসবাসকারী ৯০ ভাগ পরিবারের রেশন কার্ড সিন্ডিকেটের হাতে। যাদের হাতে কার্ড রয়েছে তাদের মাঝে রেশন বিতরণ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ।

নিম্নমানের চাউল নিতে বাধ্য করা, না নিলে কম দামে কিনে নেওয়ার অভিযোগ নিত্য দিনের। তবে সাম্প্রতিককালে গুচ্ছগ্রামগুলোতে প্রকল্প চেয়ারম্যানের পরিবর্তে প্রশাসনিকভাবে রেশন বিতরণ হওয়ায় কার্ডধারীরা রেশন ঠিকমত পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, গুচ্ছগ্রামের জন্য বরাদ্দ খাদ্যশস্যের ৮০/৯০ ভাগই খাগড়াছড়ি আসে না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৌশলে খাদ্যশস্য থেকে যায় চট্টগ্রামে। অথচ খাদ্যশস্য খাগড়াছড়ি আনার ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা পরিবহন খরচ লোপাট হচ্ছে।

এদিকে গুচ্ছগ্রামে প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগে কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। গুচ্ছগ্রাম ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী স্থানীয় জনপ্রনিধিদের অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকার দলীয়ভাবে গুচ্ছগ্রামে প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে আসছে। প্রতি দুই বছর পর পর নতুন করে প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়।

অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লোভনীয় এই পদে মনোনয়ন পেতে দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন দলীয় নেতারা। এমনকি একটি প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২/৩ জনের কাছ থেকে টাকা নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিটি প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগে ৩/৪ লক্ষ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। যিনি টাকার পরিমাণ বেশি দিচ্ছেন তাকেই চূড়ান্তভাবে প্রকল্প চেয়ারম্যান মনোনয়ন দিচ্ছেন শাসক দলের নেতারা।

সম্প্রতি গুচ্ছগ্রামে প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যকে কেন্দ্র খাগড়াছড়ির পানছড়িতে শাসকদলের নেতাদের মধ্যে চমর বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে পাল্টা-পাল্টি অভিযোগ ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, গুচ্ছগ্রামগুলোতে এখন প্রশাসনিকভাবে রেশন বিতরণ করা হচ্ছে। প্রকল্প চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হলে অবশ্যই নীতিমালা অনুসরণ করা হবে। গুচ্ছগ্রাম কোন ধরনের অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি একাধিক কর্মকর্তা জানান, পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলায় ৮১টি গুচ্ছগ্রামের ২৬ সহস্রাধিক পরিবারের মধ্যে অধিকাংশ পরিবারই এখন আর রেশননির্ভর নয়। তেমনিভাবে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী ও শান্তিবাহিনীর অনেক সদস্যের বলতে গেলে এখন তেমন কোন সমস্যা নেই।

স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, এ ধরনের রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন প্রকার সুফল তো আসছেই না, বরং সরকারের আর্থিক গচ্ছার পাশাপািশ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

পাশাপাশি রেশননির্ভর পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোন পরিকল্পনা না থাকায় তারা এখন কর্মহীন অলস জীবনযাপন করছে। অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটে ভুগছে তারা।

অন্যদিকে গুচ্ছগ্রামে বন্দী বাঙালিদের দাবি, ‘আমরা আর বন্দি জীবন চাই না। আমাদের নিজ বসতভিটা ফিরিয়ে দিন। সেখানেই চাষাবাদ করে জীবন ধারণ করবো।’

দিঘীনালার সোনামিয়া টিলা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালেক পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা গুচ্ছগ্রামে বন্দী জীবন কাটাতে চাইনা। সরকার যদি আমাদের নিজস্ব বসতভিটা ফিরিয়ে দেয় আমরা নিজেদের জমি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবো। আমাদের আর রেশন দরকার হবে না। আমরা রেশন খেতে চাই না।

অপর দিকে পাহাড়ি নেতারা বলছেন, ২৬ হাজারেরও বেশি বাঙালি পরিবারের জন্য যদি সরকার রেশন ভর্তুকি দিতে পারে সেক্ষেত্রে ১৩ হাজার উপজাতীয় পরিবারের জন্য রেশন দিতে অসুবিধা কোথায়?

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের তাদের নিজ নিজ বসতভিটায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি নির্দেশনা জারী করেছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগ্রহী হতে দেখা যায় নি।

তাই স্থানীয়দের প্রশ্ন, স্থায়ী পুনর্বাসন না করে কতদিন এভাবে বছরের পর বছর সরকার ভর্তুকি দিয়ে রেশন দিয়ে যাবে?

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =

আরও পড়ুন