পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) বিক্রির অন্তরালে


জনগণের মতামত ছাড়াই পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ) এর ৭৫ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করে দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই নিলাম লেনদেনের অন্তরালে বহু বিতর্কের আভাস মিলছে। পাকিস্তানের জনগণ প্রশ্ন তুলছে তাদের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সম্পদ এভাবে বিক্রি করার সাংবিধানিক ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে। লোকসানের অজুহাত তুলে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণের শর্ত পূরণে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রিতে তারা বাধ্য হয়েছে। যা ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ উন্মুক্ত নিলামে অংশ নিয়ে ৪৮২ মিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে করাচিভিত্তিক আরিফ হাবিব লিমিটেডের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম।
তৎকালীন ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড জাতীয়করণের আওতায় এনে সরকার ১৯৫৫ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স কর্পোরেশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে পিআইএ প্রতিষ্ঠা করে। ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৪টি ডগলাস ডিসি-৩ ক্রয় করে বিমান সংস্থা হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কোলকাতা থেকে কার্যক্রম শুরু করে। ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের মালিক ছিলেন পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি এম এ ইস্পাহানি। ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের কার্যক্রম শুরু হওয়ার ২ মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৫৫ সালে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ জাতীয়করণ করে পাকিস্তান সরকার।
১১শ’ মাইল দ্বারা পৃথক পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্রুত ও দক্ষ বিমান পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে পড়লে এগিয়ে আসে এম এ ইস্পাহানির ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ। পাকিস্তান সরকারের অনুরোধে এম এ ইস্পাহানির ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ভাড়া করা একটি বিওএসি বিমান, ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের নিজস্ব ২টি ডিসি-3 দ্বারা অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের দুই অংশের রাজধানী করাচি এবং ঢাকার মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হয়। প্রাথমিক রুট ছিল করাচি-লাহোর-পেশোয়ার, করাচি-কোয়েটা-লাহোর এবং করাচি-দিল্লি, কোলকাতা-ঢাকা।
১৯৪৯ সালের শেষ নাগাদ ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের বহরে ১০টি ডিসি-3 এবং ৩টি কনভেয়ার-240 সংযুক্ত হয়। ১৯৫০ সালের পর পাকিস্তান সরকার উপমহাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে বেসামরিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণের উদ্যোগী হয়। সরকারের আমন্ত্রণে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড জাতীয়করণের আওতায় আসতে সম্মত হয় এবং ১৯৫৫ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স কপোরেশন বা পিআইএসি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি মালিকানায় নতুন এই বিমান সংস্থা প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের এই সরকারি বিমান সংস্থা আন্তর্জাতিক পরিষেবার উদ্বোধন করে। বিশ্বের বিভিন্ন রুটে বিমান পরিচালনা করে পিআইএ আন্তর্জাতিক পরিষেবায় যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে শুরু করে এবং যা দিয়ে একের পর এক নতুন বিমান ক্রয় করতে থাকে। ১৯৫৯ সালে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার মাত্র ৬ বছরের মধ্যেই পিআইএ বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী বিমান সংস্থা হিসেবে মর্যাদা অর্জন করে।
১৯৬০ সালের মার্চ মাসে পিআইএ লন্ডন-করাচি-ঢাকা রুটে প্রথম বোয়িং ৭০৭ জেট পরিষেবা চালু করে। এই অসাধারণ সাফল্যের ফলে পিআইএ প্রথম এশিয়ান এয়ারলাইন্স হিসেবে জেট বিমান পরিচালনা করে। ১৯৬১ সালে বিমান সংস্থাটি করাচি থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ক্রস-আটলান্টিক পরিষেবা শুরু করার বিশাল কাজ গ্রহণ করে। এই সময়ের মধ্যে পিআইএ আরও নতুন বিমানের ক্রয় করে। যার মধ্যে ছিল ফকার এফ-২৭, বোয়িং ৭২০বি এবং সিকোরস্কি হেলিকপ্টার। ১৯৬২ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে হেলিকপ্টার পরিষেবা গতিশীল হয়ে ওঠে এবং সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুমিল্লা এবং ঈশ্বরদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
১৯৬৪ সালে পিআইএ আরেকটি ঐতিহাসিক প্রথম অর্জন করে। ১৯৬৪ সালের ২৯ এপ্রিল একটি বোয়িং ৭২০বি বিমানের মাধ্যমে পিআইএ গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে বিমান চালানোর গৌরব অর্জন করে। ১৯৬৪-৬৫ সালে পিআইএ চতুর্থ বোয়িং ৭২০বি এবং ২টি ফকার এফ-২৭ বিমান যুক্ত করে বহরকে আরও সম্প্রসারিত করে। ১৯৬৭ সালে বিআইএ’র বহরে আরো ২টি ফকার এফ-২৭, দুটি বোয়িং ৭০৭ যুক্ত করা হয়।
পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাতীয় বিমান সংস্থা পিআইএ’র বিমান বহরে ৩৪টি বিমান রয়েছে। যার বেশিরভাগই বিভিন্ন ধরণের বোয়িং ৭৭৭, এয়ার বাস এ৩২০ এবং এটিআর বিমান। আইএমএফের চাপে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পাতাকাবাহী বিমান সংস্থা পিআইএ বিক্রি করে দেয়ার এই সাহসী কিংবা দুঃসাহসিক ঘটনা পাকিস্তানের রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, ই-মেইল : [email protected]

















