মিয়ানমারে নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দলের জয় দাবি, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন বিরোধীদের


মিয়ানমারে সেনাবাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) দেশটির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। দলটির একটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল পেতে চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘সেনাশাসন নতুন পর্যায়ে’ প্রবেশ করবে।
গত মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। তিন ধাপে এ নির্বাচনের ভোট হয়েছে। তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছে গত রোববার। সেনাবাহিনী ও জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন। বিতর্কিত এ নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নেয়নি।
২০২১ সালে মিয়ানমারে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া নির্বাচিত সরকারের যাত্রা অকালে মুখ থুবড়ে পড়ে। অভ্যুত্থানের অল্প দিনের মধ্যে দেশটিতে গেরিলাযুদ্ধ শুরু হয়। এতে দেশটির পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অনেকে যোগ দেয়।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও গেরিলাদের দমন করতে হিমশিম খাচ্ছে জান্তা সরকার। সেনাবাহিনী আকাশপথে হামলার জন্য ক্রমে প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করছে। সোমবার মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে করে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
নির্বাচন নিয়ে জান্তা সরকারের দাবি, এই ভোট জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, এটি একটি পাতানো নির্বাচন। আগে থেকে সেনাবাহিনী সবকিছু সাজিয়ে রেখেছে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা জনগণের হাতে ফিরবে না। বরং সামরিক শাসন আরও দৃঢ় হবে।
গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের অনেক প্রশাসনিক অঞ্চলে (টাউনশিপ) ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভোট না হওয়ায় নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সেনা-সমর্থিত দল ইউএসডিপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উচ্চপদস্থ নেতা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছি। আমরা নতুন সরকার গঠনের অবস্থানে আছি। নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় আমরা (সরকার গঠনের কাজ) এগিয়ে নেব।’
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউএসডিপি আসলে সেনাবাহিনীর নাগরিক মুখোশধারী প্রক্সি দল। অনেকে মনে করেন, নিজেদের শাসনের ‘নাগরিক বৈধতা’ দেখাতে সেনাবাহিনী এ নির্বাচনের আয়োজন করেছে।
ইয়াঙ্গুন শহরের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘তাদের জয় আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। তারা একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী এবং রেফারি। এ নির্বাচন থেকে যে সরকার গঠিত হবে, সেটার প্রতি প্রায় কোনো নাগরিকের সমর্থন থাকবে না।’
গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম দফার ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দফার ভোট হয় ১১ জানুয়ারি। তৃতীয় ও শেষ দফার ভোট হয় ২৫ জানুয়ারি। মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ার পর সব সদস্য মিলিতভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন।
ধারণা করা হচ্ছে, নতুন পার্লামেন্ট গঠিত হলে সামরিক ইউনিফর্ম খুলে মিন অং হ্লাইং নিজেই প্রেসিডেন্ট হবেন।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ টম অ্যান্ড্রুস বলেন, ‘মিয়ানমারে ভোটের ফলাফল কখনো সন্দেহের বাইরে ছিল না। কিন্তু নির্বাচনী ফলাফলের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রতারণামূলক নির্বাচনী কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়া হলে সংকটের সত্যিকার সমাধান আরও পিছিয়ে যাবে।’
















