রোহিঙ্গা গণহত্যার রায় গাম্বিয়ার পক্ষে গেলে আন্তর্জাতিক চাপে পড়বে মিয়ানমার


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মিয়ানমার। দেশটির রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার বিচার শুরু হয়েছে। নৃশংস এই গণহত্যার বিচার চেয়ে জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) বা আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। বিশ্বে বহুল আলোচিত এই গণহত্যা মামলার শুনানি ১২ জানুয়ারি ২০২৬ শুরু হয়েছে, চলবে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। শুনানি শেষে এই গণহত্যা মামলার যুগান্তকারী রায় দেবে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ আদালত।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এই আদালতটি ‘ওয়ার্ল্ড কোর্ট’ নামেও বিশেষ পরিচিত। এই আদালতের রায়ের প্রতি কৌতুহল জাতিসংঘভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের। আইসিজে’র রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় গাম্বিয়ার পক্ষে গেলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপে পড়বে মিয়ানমার। তাই ১২ জানুয়ারির শুনানিতে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ।
২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়া প্রায় ৫০ পাতার ওই আবেদনে রোহিঙ্গারা রাখাইনে বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছে এবং এর ফলে গণহত্যার মতো অপরাধ সংগঠিত হয়েছে উল্লেখ করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তথ্য উপাত্ত বা প্রমাণাদির যথাযথ উত্থাপনে এ ধরনের মামলা এই আদালতে অনেকদিন ধরে চলে। বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের ভয়াবহ সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এই গণহত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলা দায়েরের বিষয়টিকে শুরু থেকেই স্বাগত ও সমর্থন জানিয়ে আসছে।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের আহ্বান অব্যাহত রেখেছে। থেমে নেই জাতিসংঘের উদ্যোগ। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলো রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানির লাইভ সম্প্রচার করছে। যা রোহিঙ্গাদের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হচ্ছে।
২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
আইসিজেতে ১২ জানুয়ারির শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাওদা জালো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতাকে ‘পরিকল্পিত’ মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে মিয়ানমার।
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে দমন–পীড়নের সময় মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ গাম্বিয়ার। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে।
২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদে নিষিদ্ধ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিলেও তাতে থামেনি মিয়ানমার। বরং তারা রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পাশবিক ও অমানবিক সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়েছে, হত্যা, গুম, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তূচ্যুত করেছে।
আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যা মামলার শুনানি ও রায় এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক বিষয়। জাতিসংঘের এই বিচারিক আদালতের চূড়ান্ত রায় পেতে হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েক মাস বা তারও বেশি সময়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সংবাদমাধ্যম, জাতিসংঘ সদস্য দেশসমূহ ইতোমধ্যে এই মামলায় গাম্বিয়াকে যেভাবে সমর্থন জানিয়েছে, তাতে বিশ্বের সকল শান্তিপ্রিয় মানুষ চাইছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার যুগান্তকারী বিচার, দৃষ্টান্তমূলক রায়। যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বের কোনো দেশ বা সামরিক বাহিনী এমন মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয়। বিশ্বজুড়ে নিন্দিত এই ঘটনার আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ও তার দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চায় বাংলাদেশের শরনার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া ১৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক
















