ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাগণ

পার্বত্যাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গুটি কয়েক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও তাদের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ঠেকাতে দেশবাসীকে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

৯ আগস্ট ২০২৫ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদ, সামরিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, গবেষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য অঞ্চল-ভারত-মিয়ানমারের একটি অঞ্চল নিয়ে বৈশ্বিক শক্তির পরিকল্পনা আছে। কুকি চিনের মতো কয়েকটি ঘটনা আমাদের এবং আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীকে চিন্তিত করেছে। কারণ হচ্ছে, তার  পেছনেও অনেক কারণ আছে। যেটা আমরা সাদা চোখে দেখছি, সেটা পর্দার আড়ালে অনেক কারণ আছে। এখানে আমাদের পার্বত্য অঞ্চল, ভারত ও মিয়ানমারের একটি অঞ্চল নিয়ে বৈশ্বিক কোনো কোনো শক্তির পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই ভূখণ্ডটাকে হয়তোবা তারা অন্যভাবে সাজাতে চায়।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সেজন্য আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক এরকম পরিকল্পনা যাতে আমাদের ভূখণ্ড নিয়ে সফল হতে না পারে। এজন্য আমাদের দেশের সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বুদ্ধিজীবী মহলসহ সবাইকে সমন্বিত প্রচেষ্টা রাখতে হবে। যাতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে পারি।

সালাহউদ্দিন বলেন, সকল মানুষকে সিটিজেন হিসেবে বলতে ভালোবাসি। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এখানে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃজাতিগোষ্ঠী, উপজাতি এবং আদিবাসী সকল সত্তাকে বাংলাদেশি হতে হবে। একটি ঐক্যবদ্ধ ন্যাশন তৈরি করার জন্য- সেই ঐক্যবদ্ধ জাতি, ঐক্যবদ্ধ সমাজ, ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্যই আমরা ’৭১-এর পরে ’২৪-এ আবার রক্তদান করেছি।

তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে বাংলাদেশের সবাইকে নিয়ে সিটিজেন হিসেবে আমরা একসাথে থাকতে পারি। আমাদের সবারই পরিচয় হবে আমরা বাংলাদেশি। আমরা আমাদের ন্যাশনালিটি বাংলাদেশি। আমরা সিটিজেন হিসেবে সবাই বাংলাদেশি পরিচয় দিই এবং এই পরিচয় দিতে পারি এবং সেটাই হবে হবে আমাদের ঐক্যের মূল শক্তি। ঐক্যই হবে আমাদের ন্যাশনকে এগিয়ে নেয়ার মূল শক্তি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী প্রসঙ্গ ও জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনা- শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি তাঁর বক্তব্যে আদিবাসী বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত ধারণা দিয়ে বলেন, ‌’আদিবাসী’র যে একাডেমিক্যালি চিরাচরিত সংজ্ঞাগুলো আছে তার বাইরে গিয়ে হঠাৎ করে ১৯৭৯ সালে নতুন করে একটা সংজ্ঞা জাতিসংঘের মাধ্যমে আসে এবং সেই সংজ্ঞায় সারা বিশ্বে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এই  বিশৃঙ্খলাতার একটা প্রভাব আমাদের বাংলাদেশেও পড়েছে। যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি এই দেশে আদিবাসী বলতে যে মূল জনগোষ্ঠী বুঝায়, তা মূলত বাঙালিরাই। এর মধ্যে বাঙালি মুসলিম, বাঙালি বৈদ্য, বাঙালি খ্রিস্টান রয়েছে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. নাঈম আশফাক চৌধুরী। তিনি তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে, আজ আমরা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলবো যার সাথে আমাদের প্রাণপ্রিয় এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও ভূমির অখণ্ডতা জড়িত। বাংলাদেশে আদিবাসী কে, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব আছে কিনা, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কেউ কেউ নিজেদের এ অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে দাবি করছেন তার যৌক্তিকতা আছে কিনা, তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে দেশের কি অসুবিধা, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরাম আদিবাসী ও উপজাতি হিসেবে কাদেরকে চিহ্নিত করতে চেয়েছে, আদিবাসী হিসেবে যাদের চিহ্নিত করতে চাচ্ছে তাদের কী কী অধিকার দিতে চাচ্ছে, এর সাথে বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় আছে কিনা- সে সব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা আজ আমরা এই বৈঠকে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

তিনি আরো বলেন, এদেশে বসবাসরত সকল বৈধ নাগরিকের সমান অধিকার যা আমাদের সংবিধানে কমপক্ষে ২৭, ২৮(১), ২৮(২) এবং ২৯(৩) অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা সকল নাগরিককে, বিশেষত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চেতে যথেষ্ট কাজ করছি কিনা অথবা সদিচ্ছা আছে কিনা তা পর্যালোচনা করা। তিনি বলেন, আজকের এ আলোচনাংশে ৪টি মূল প্রতিপাদ্য আঙ্গিক জড়িত। প্রথমত ঐতিহাসিক, দ্বিতীয়ত আইনগত, তৃতীয়ত আর্থ সামাজিক এবং চতুর্থটি নিরাপত্তা বিষয়ক।

ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে, শান্তিচুক্তির পূর্বে যেখানে একটি পাহাড়ি সন্ত্রাসী দল ছিল, আজ সেখানে ছয়টি দল পাহাড়ে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। প্রতিনিয়ত হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বৈঠকে আলোচক ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর শাহজাহান চৌধুরী, ওসমানী সেন্টার ফর পিস এন্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজের চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, বিএনপি মিডিয়া সেলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আলমগীর মোহাম্মদ মওদুদ, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুল লতিফ মাসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, আমজনতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. কাজী মোহাম্মদ বরকত আলী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তারেক ফজল, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বাবু রুইথি কারবারী, সাংবাদিক ও পার্বত্য গবেষক সৈয়দ ইবনে রহমত, ইঞ্জিনিয়ার চিং মং শাক, ছাত্রনেতা পাইশিখই মারমা প্রমুখ।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমরা বাঙালিরা জন্ম থেকেই বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্যই আমাদের লড়াই করতে শিখিয়েছে। এই বৈষম্যই আমাদেরকে রক্ত দেওয়া শিখিয়েছে। এই বৈষম্যের মাধ্যমেই আমরা একাত্তরের স্বাধীনতা পেয়েছি। আবার ২০২৪ এর ৫ আগস্ট দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি। এই বৈষম্যই আমাদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে একটি শক্তিশালী জাতীয় সংহতি। আমি মনে করি এই বৈষম্য ঐক্যের প্রতীক। যখনই আমরা বৈষম্যের শিকার হই, তখনই আমরা ইউনাইটেড হই। আমরা আজ এখানে বৈঠকের শুরুতে তথ্যভিত্তিক একটা ভিডিও দেখতে পেলাম। সেখানে জানা গেল যে, দেশের ১৩টি উপজাতি রয়েছে, যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে না। তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করছে। আমরা জানি, সরকার মাইনরিটির জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা বা অধিকার দিয়েছে। এটা আমাদের সংবিধানেই দেয়া আছে। কিন্তু সেই সুবিধা বা অধিকারসমূহ আমরা সঠিকভাবে বণ্টন করতে দেখি না। ক্ষেত্র বিশেষ এ সুবিধা যাদের প্রভাব বেশি তারাই সব লুটে নিচ্ছে। এটা যদি সব জাতি, উপজাতিদের মধ্যে সমান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পৌঁছে দেয়া গেলে তাদেরকে দেশের মূলস্রোতে একীভূত করা সহজ হবে।

তিনি আরো বলেন, আজকে দেশের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক উন্নত হয়েছে। এরা কেউ যুদ্ধ করতে চায় না। সবাই তারা নতুন জীবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই নতুন প্রজন্ম- এদেরকে integrate করতে হবে। এদেরকে integrate করতে পারলে আমার মনে হয় পাহাড়ের অশান্তি আর থাকবে না। আমরা জানি, এই অশান্তি এই যুদ্ধ কত কষ্টকর। সুতরাং পাহাড়ের সাধারণ মানুষেরা বা তরুণরা ইচ্ছা করে সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত হচ্ছে না বা যুদ্ধে যাচ্ছে না। এদেরকে জোর-জবরদস্তি করে নেওয়া হয়। আমরা যদি এমন একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি, তরুণদের চাকরির ব্যবস্থা করতে পারি, তাদেরকে যদি রাষ্ট্রের মূলস্রোতে একীভূত করতে পারি, তারা অবশ্যই অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা থেকে বিমূখ হবে বলে মনে করি।

তিনি আরো বলেন, আজকে যে ইস্যুতে এখানে আলোচনা হচ্ছে, এখানে পাহাড়ের লোকজন আছে। আমি আশা করেছিলাম আরো বেশি থাকবে। যারা আজকে আদিবাসী হওয়ার দাবি তুলছে এ রকম সভা, সেমিনার বা বৈঠকে তাদেরকেও এনে বসানো উচিৎ। তাদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া উচিৎ আপনারা কোন যুক্তিতে, কেনো আদিবাসী হতে চাচ্ছেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী কোনো রাষ্ট্রে আদিবাসী স্বীকৃতি দেয় নি। তাদের সাথে আমাদের সামনা-সামনি যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে কনভিন্স বা রাজি করাতে হবে। বিশ্বের বড় বড় দেশ তারা তো তাদের সব আদিবাসীদের চিরিয়াখানায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটা মিউজিয়ামে পরিণত করেছে।

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর পাহাড়িদের আহবান জানিয়ে বলেন, আসুন, আপনারা যারা আদিবাসী দাবি করছেন, তারা মিউজিয়ামে বা চিরিয়াখানায় না গিয়ে আমরা এদেশে একসাথে বসবাস করি। বাঙালি জাতির মন পলিমাটির মতো নরম। আমরা সবাই মিলে মিলে একসাথে স্বাধীন-সমৃদ্ধ সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

বৈঠকের আলোচনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটা পাহাড়িদের জন্য নয়, উপজাতিদের জন্য নয়, এটা একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এটার মাধ্যমে আমাদের পার্বত্য এলাকাকে জম্মুল্যান্ড করতে চায়। এই জম্মুল্যান্ড করার জন্যই আজকে এই ষড়যন্ত্র। সেখানে শুধু শান্তিবাহিনীই নয়, সেখানে কুকি চিন বাহিনী, মগদের সশস্ত্র বাহিনী, অর্থাৎ সমগ্র এলাকাটা একটা অশান্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে।

শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‌‌পাহাড়িদের সাথে সমতলের মানুষের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো যারা পাহাড় নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে, গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ফায়দা লুটছে তাদের সাথে। পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের জন্য জনগণকে দোষ দিয়ে লাভ নেই । পাহাড়ি সশস্ত্র বাহিনী যারা সেখানে চাঁদাবাজি করছে, নৈরাজ্য চালাচ্ছে, অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে, তাদেরকে দমন করার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ফর্মুলার ভিত্তিতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান হতে পারে।

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সমস্যা দীর্ঘ দিন ধরে চলছে। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই সমস্যা সমাধানের জন্য অত্যন্ত বাস্তব কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সমস্যার সৃষ্টি কখন হয়েছে আপনারা মনে হয় সবাই জানেন। উল্লেখ করার দরকার নেই। আমাদের সাথে উপজাতিদের সাথে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের লোকদের সাথে একটা ওতপ্রোত সামাজিক বন্ধন ছিল। আমরা সেখানে গিয়ে ব্যবসা করতাম। ওনারাও আমাদের এখানে এসে ব্যবসা করতেন। এই সমস্যা সৃষ্টি হবার পর থেকে সমাধানের জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উদ্যোগ গ্রহণ করলেন, সমস্যা কারা সৃষ্টি করেছে।

শাহজাহান চৌধুরী আরো বলেন, পাহাড়িদের সাথে সমতলের মানুষের কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো যারা এইটা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে, গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ফায়দা লুটছে তাদের সাথে। এই সমস্যাটা সৃষ্টি করা হলো প্রথমে জম্মুল্যান্ড নামক একটি স্লোগান বের করে। বলা হলো যে এটাকে আলাদা করা হবে। এটা হবে জম্মুল্যান্ড। একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে একটা পুস্তিকা দেয়া হলো। এই পুস্তিকা সব জায়গায় বিতরণ হলো।

আলোচনায় ওসমানী সেন্টার ফর পিস এন্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজের চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে আমি ১৫ বছর পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে আমার একটা আবেগময় অনুরাগ আছে। আমি যখন আমার প্রথম জীবনে ১৯/২০ বছর বয়সে পার্বত্য এলাকায় গিয়েছি, তখন শান্তিবাহিনীর দুর্দান্ত প্রতাব। তার ভেতরেও সেখানকার মানুষের ব্যবহার আমাদের প্রতি বেশ ওয়েলকামিং ছিল। আমরা তাদের বাড়িতে গেলে তারা পানি, ফল অফার করত। আন্তরিক একটা পরিবেশ ছিল। আমি লাস্ট চাকরি করেছি ২০১২ সাল পর্যন্ত। তখন আমি পাহাড়ের ওই সমস্ত গ্রামে গিয়ে লক্ষ্য করেছি, তারা আমাদেরকে আর আগের মতো সেভাবে দেখে না। হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত এগিয়ে দিলেও হ্যান্ডশেক করতে চায় না। মুুখ ফিরিয়ে নেয়। এর কারণ হলো একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে সেখানে। বিভিন্ন স্যোসাল মিডিয়ার মাধ্যমে এই ন্যারেটিভ তৈরি হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকার কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পলিটিক্যাল স্পেসে ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতায় যাওয়া, ক্ষমতায় গিয়ে টিকে থাকা। গত ১৫ বছরে আমরা তাই দেখেছি। এটাই ঢাকার কাছে মোদ্দা বা আসল কথা। অবশ্যই পলিটিক্যাল স্পেসে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আনতে হবে। পার্বত্য এলাকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম ডিভিশনের কাছে। অর্থাৎ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কাছে। মনে রাখতে হবে ২৪ পদাতিক ডিভিশন সিকিউরিটি সিচুয়েশনকে মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু পলিটিক্যাল সিচুয়েশন মোকাবেলা করতে পারে না। জেএসএস, ইউপিডিএফ বা এ রকম সংগঠনগুলোর সাথে এরা টেক্কা দিতে পারবে না। কারণ জেএসএসের কাছে যেমন পলিটিক্যাল উইং আছে, মিডিয়া উইং আছে, ইকনোমিক উইং আছে, কালচারাল উইং আছে। তেমনি আবার প্রপাগান্ডা উইংও আছে। একটা মিলিটারি ইউনিটে তো এগুলো থাকে না। আপনাদের মনে থাকতে পারে যে, ১৯৭৫ সালে যখন শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়, তখন দিল্লি এটাকে ধরে নিয়েছিলো এলিটি ইন দ্য পলিটি বা রাজনৈতিক অবাধ্যতা।

তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, বিভাজনের ইন্ধনদাতাদের সনাক্ত করতে হবে। বিভাজন সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না। পার্বত্যবাসীর সাথে সকল পর্যায়ে সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। তাদের অভাব অভিযোগগুলো শুনতে হবে। ধৈর্যহারা হলে চলবে না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এটাকে ন্যাশনাল ইস্যু হিসেবে আলোচনায় আনতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেখতে হবে প্রাইম বিষয় হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা শক্তিকে আমাদের জাতীয় জীবনে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। সেটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে জাতি পাবে ঋতু পর্ণা কিংবা রূপা চাকমাদের মতো প্রতিভা।

বিএনপি মিডিয়া সেলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আলমগীর মোহাম্মদ মওদুদ বলেন, আমাদের ঠিকানা যেখানেই হোক পাহাড়ে কিংবা সমতলে, প্লাবন ভূমি, দ্বীপাঞ্চল কিংবা উপকূলে আমাদের সবারই পরিচয় অভিন্ন হওয়া দরকার যে আমরা সবাই বাংলাদেশী। আমরা বাংলাদেশী চাকমা হই, বাংলাদেশী মারমা হই, বাংলাদেশী গাঢ় হই, বাংলাদেশী সাঁওতাল হই, বাংলাদেশী রাজবংশী হই, বাংলাদেশী মুন্ডা হই, বাংলাদেশী খাঁসি হই- তাদের সাংস্কৃতিক যে বিকাশময়তা রয়েছে, যে ঐতিহ্য রয়েছে সেটি সংরক্ষিত হোক।

তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে যারা আপামর জনগোষ্ঠী যারা বসবাস করি তাদের মধ্যে তো ভাষাগত বা সাংস্কৃতিগত বিভাজন রয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট কিংবা উত্তরাঞ্চল, তাদের প্রত্যেকের ভিতরে যেমন একটা অভিন্ন জাতিসত্তা রয়েছে, আবার সাংস্কৃতি জগতেও ছোট ছোট নিজস্ব স্বকীয়তা বা নিজস্বতা রয়েছে। আমরা সমাধানের যত গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করব। সেখানে একটি জিনিসই প্রকৃত পক্ষে সামনে এসে দাঁড়াবে তাদের কথা শোনা, তাদের সাথে আন্তরিকভাবে মেশবার চেষ্টা করা। শক্তি দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা দিয়ে তাদের সবাইকে যদি আমরা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সাথে এক জায়গায় আনতে পারি, তাদের সংস্কৃতিকে যদি রক্ষা করি, তাহলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে।

তিনি বলেন, আমরা অগ্রাধিকার কোনটিতে দেব, শুধুমাত্র কি সেই সংজ্ঞার জটিলতার মধ্যে- যে তারা আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এই জায়গায় নাকি তাদের প্রজন্মের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, তাদের শিক্ষা, তাদের স্বাস্থ্য, তাদের অর্থনীতি, সর্বপরি তাদের দেশপ্রেমকে সামনে এনে।

মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, আমাদের দেশের বরেন্দ্র এলাকায় সাঁওতাল, মুণ্ডা, সিলেট অঞ্চলে খাসিয়ারা বাস করছে। তাছাড়া সিলেটের চা বাগানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা কাজ করে। গাঢ়দের বাস রয়েছে ময়মনসিংহ এলাকায়। এদেশে মনিপুরিরাও রয়েছে। শুধু পাহাড়ের কথাই বলা হয়, এদের কথা তো ততটা বলা হয় না। তাই বোঝা যায় যে, পাহাড়ি আদিবাসী ইস্যু রাজনৈতিক। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে আমরা শ্রদ্ধা করি ওনার দেশপ্রেমের কারণে। তিনি ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন সবাই বাংলাদেশি। সুতরাং মাইনরিটি, মেজরিটি, আদিবাসী, ইনডিজেনাস- এগুলো না বলে আমরা একজাতি এবং এক বাংলাদেশি। আমরা সাম্য, সম্প্রীতি, মমতায় ভালোবাসায় মিলেমিশে এক মহান জাতি হিসেবে বিশ্বে গড়ে উঠতে চাই। আমাদের নীতি হওয়া উচিৎ যে, আমরা সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাব। যারা পিছিয়ে পড়েছে তাদের অগ্রসর হতে সাহায্য করব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া বলেন, আজকে আমরা কথা বলছি, আমরা জানি, এদেশে জাতিগোষ্ঠী প্রায় ৫১টি। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর যারা নেতৃত্বদান করছেন, তাদেরকে এ ধরনের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানালে তাদের ভাবনাগুলো, তাদের কথাগুলো শুনলে বোঝা যাবে তারা কি ধরনের সঙ্কটে আছে। তারা কেনো বিপদগামী হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাদেরও দায়িত্ব আছে। যেহেতু আমি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তাই পার্বত্য জেলা সম্পর্কে আমি জানি। মাঝে মাঝে সেখানে যেতে হয়। আমি যেহেতু শিক্ষক, এই বিষয়ে আমি গবেষণা করি, বই প্রকাশ করি।

তিনি বলেন, আলোচনায় আমি দ্বন্ধ-সংঘাতে যাব না। আমি পক্ষ-নিরপেক্ষতা গ্রহণ করব না। এই বৈঠকে পাহাড় থেকে এসে যারা অংশ নিয়েছেন, কথা বলেছেন, তাদের কথা আমার খুব ভালো লেগেছে। তাদের কথাগুলোকে যদি আমরা সংগ্রহ করি, তাদের কথাগুলোকে যদি আমরা মূল্যায়ন করি, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একটি পাহাড়ি তরুণ তার আলোচনায় বলেছেন, আমি চাকমা বুঝি না, আমি মারমাও বুঝি না। এই দেশ আমার। তার এই যে দেশপ্রেম, তিনি তার ভালোবাসার কথাই বলেছেন।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর লোকজন আছে। নৃগোষ্ঠী শব্দের একটা সুন্দর অর্থ আছে। নৃ শব্দটি খুবই আদি বা প্রাচীন। মাটির সঙ্গে মিশে আছে। এই নৃ এর তত্ত্বগুলো আমরা যদি নিতে পারি তাহলে আমার মনে হয় এর সমাধান হয়ে যায়।

তিনি বলেন, আজকে প্রকৃত গবেষণা হচ্ছে না। আমার প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি কিংবা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কেনো গঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানগুলো সৎভাবে ব্যবহার করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্ষা করা, পার্বত্যবাসীদের রক্ষা করা। পার্বত্যাঞ্চল এদেশেরই অংশ। সমান মর্যাদা দিয়ে এই পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীকে মূলস্রোতে নিয়ে আসতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি একজন শিক্ষক এবং ৩৫ বছর ধরে গবেষণা করছি। আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে গবেষণার খুব অভাব। প্রকৃত গবেষণার আরো অভাব। যেহেতু আমি ছাত্র জীবন থেকে গবেষণা করেছি। আমি নরসিংদীর উয়ারি বটেস্বর নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছি। আমার গবেষণা অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ ছেপেছে।

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকরা গবেষণা করতেই চান না। পার্বত্য বিষয়ে গবেষণা করেন দেখেন কে ফান্ডিং করছে। প্রকৃত গবেষণা ব্যয় বহুল। সরকারের যে এগিয়ে আসতে হবে, সরকারেরই সেই মাথাব্যথা নেই। আমি উয়ারি বটেস্বর নিয়ে যে গবেষণায় দেখেছি, আড়াই হাজার বছর আগে একটা নগর ছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সিল্করুটের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এখন যে প্রশ্নটি আসছে এদেশে কে আদিবাসী, আবার কে অ-আদিবাসী। আমরা যে বাঙালি বলি, এই বাঙালি আসলে কখন থেকে। কেউ কি উত্তর দিতে পারবে? যদি আড়াই হাজার বছর আগে নগর হয়, তারা কি বাঙালি ছিলো? তাই প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা খুবই জরুরি।

লেবার পার্টি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর যখন শেখ মুজিবুর রহমান পাহাড়িদের বাঙালি হতে বললেন, তখন থেকেই পাহাড়ে এই দৃশ্যমান সংঘাত বা হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছে। এই সংঘাতের কিছুটা হলেও পরিসমাপ্তি ঘটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ফর্মুলার মাধ্যমে। আমাদেরকে একটি নতুন পরিচয় দেয়ার মধ্য দিয়ে। আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা তার প্রধান কারণ হচ্ছে ১৯৯৭ সালের কালোচুক্তি। এই কালোচুক্তির পরে সেখানে চরম বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। পাহাড়ি সমতল, ওখানে যারা আমাদের বাঙালি যারা অবস্থান করছে তারা অনেকটা চতুর্থ শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেনো থাকতে পারবেন না পার্বত্য চট্টগ্রামে। ওটা তো বাংলাদেশেরই একটা অংশ। মোট আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ। এই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি সমস্ত ষড়যন্ত্র আমরা লক্ষ্য করেছি। আমরা নতুন নুতন শব্দের বাস্তবায়ন করতে দেব না। দেশের সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দেয়ার সুযোগ কখনোই দেব না। আমরা যেকোন মূল্যে তা প্রতিহত করব, ইনশাআল্লাহ। কারণ এটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বাইরে যারা ভিন্ন চিন্তা করবে তাদের চোখ আমরা আঙ্গুল দিয়ে তুলে নেব।

ইরান বলেন, পানছড়িতে ১৯৯২ সালে সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা উপজাতি নয়, আমরা ক্ষুদ্র জাতি। তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা হচ্ছে। এটা এখন তারা মানতে চাইছে না। এটা তো তাদেরই দাবি ছিল। আজকে তারা আবার আদিবাসী সংজ্ঞা দাবি করছে। রাষ্ট্র যদি তাদেরকে আদিবাসী বলা শুরু করে তাহলে তারা আবার ক্ষুদ্র জাতেগোষ্ঠীর দাবিতে আন্দোলন শুরু করবে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কতিপয় দুষ্ট লোক পাহাড়িদেরকে রাষ্ট্রের বিপরীতে সব সময় দাঁড় করাতে চাইছে। এ বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে।

আমজনতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে কে আদিবাসী, কে অ-আদিবাসী এ নিয়ে সুচিন্তিতভাবে শয়তানি করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী প্রসঙ্গ ও জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনায় তিনি বলেন, তাহলে তো কাগজ কলম নিয়ে বসতে হবে যে, আমরা কারা কারা এক হাজার বছর ধরে আধিভূত, আর কে কে মায়ানমার থেকে আসলাম। কে কে চায়না থেকে আসলাম। যোগ-বিয়োগ করতে হবে না? আমরা সেই যোগ বিয়োগে কেনো যাচ্ছি। আমার স্পষ্ট কথা, এই জাতিগত যে ভাগ বা গোষ্ঠীগত যে ভাগ, এটা সারাদেশেই কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় আছে। আমাদের এখানে হয়ত প্রামাণিক, চৌধুরী হিসেবে বা খান হিসেবে আছে, পাহাড়ে চাকমা, মারমা, শাওতাল এইভাবে আছে। সবাইকে বাংলাদেশি বললে সমস্যা কোথায়?

বৈঠকে তারেক রহমান আরো বলেন, আমার বগুড়াতে দুটি ক্যান্টনমেন্ট। একটা জাহাঙ্গীর নগর ক্যান্টনমেন্ট, আরেকটা মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট। আমার জন্য এই ক্যান্টনমেন্ট কোনো সময় অস্বস্তির কারণ হয় না। আমি এই ক্যান্টনমেন্ট দেখলে ভয় পাই না। আমি এই ক্যান্টনমেন্ট দেখলে নিরাপদ মনে করি। আমার প্রশ্ন যারা ক্যান্টনমেন্ট দেখে ভয় পাচ্ছেন, আপনারা কেনো এই ভয়টা পাচ্ছেন, আমরা তো ভয় পাই না। তার মানে আপনি এমন কিছু কার্যক্রম করেন যে কার্যক্রমগুলো ভয় পাওয়ার মতোই আসলে। যে সংগঠনগুলো এই কার্যক্রমগুলো করছে আদিবাসীকেন্দ্রীক সংকট, এই কার্যক্রমগুলো তাদের রুটি-রুজির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো বেঁচে খায়। এটা কাদের কাছে বেচে খায়, ওই চাকমাদের কাছে বেচে খায়, শাঁওতাল, মারমা, ম্রো, তাদের কাছে বেচে খায়। এদের কাজ নাই, এরা চাঁদাবাজি করে, মানুষকে কষ্ট দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. কাজী মোহাম্মদ বরকত আলী বলেন, আমি একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রাম আলোচনা করতে গিয়েছি। দেখেছি সেখানে গুটি কয়েক মানুষের ৬টি গোষ্ঠী আছে। জেএসএস, ইউপিডিএফ, কুকি চিন এরা সন্ত্রাসী স্টাইলে চাঁদাবাজি করছে। এই গোষ্ঠীগুলো যতনা বেশি তাদের অধিকার আদায়ের কথা বলে তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক ও নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কথা বলছে। ২ থেকে ৩ ভাগ মানুষ এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা বা নেতৃত্বের আড়ালে হাইলি ইকনোমিক্যালি ডেভেলপিং করেছে। তারা আমেরিকা, লন্ডনের মতো দেশে বাড়ি বানিয়েছেন। অর্থ কামানো ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে শীর্ষে আছেন সন্তু লারমা নিজেও। কয়েক দিন আগে আপনারা দেখেছেন জাতিসংঘের ইমরিপ অধিবেশনে তার নাতনি উদ্ধতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। উপজাতিদের মধ্যে যারা অত্যন্ত নির্লোভ, সৎ এবং অতি সাধারণ তাদেরকে ব্যবহার করছে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তারেক ফজল বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি হয়। আমার স্মরণে আছে, আমি তখন জনপ্রিয় লেখালেখিতে সময় ব্যয় করেছি। ঘটনাক্রমে ১৯৯৭ সালের ২ তারিখে আমার প্রথম কন্যার জন্ম হয়। তবে তার নাম শান্তি রাখি নি। এই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি তখন হরতাল ডেকেছিল। সেই হরতালের কারণে আমার সন্তানকে হাসপাতালে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে আমি যথেষ্ট ভূগেছি। বিএনপির পক্ষ থেকে তখন প্রফেসর বি চৌধুরী বলেছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় আসলে শান্তিচুক্তি বাতিল করবেন। আমি খুবই আগ্রহের সাথে সেই নিউজ কাটিং রেখেছিলাম। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার সময় পাননি।

তিনি বলেন, আমরা রিপাবলিক গড়ে তুলে তুলে চাই। যেখানে প্রতিজন নাগরিক তার সম্ভাব্য সব সুবিধা ভোগ করবে, সমানভাবে। নির্বিশেষে যার যতটুকু যোগ্যতা আছে। এটা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগে যারা থাকেন, তারা অবহেলা করেন। অনেক ক্ষেত্রে কম মনোযোগ দেন। কাজেই নির্বাহী কর্তৃত্ব যখন অবহেলা করেন তখন অন্যান্য কর্তৃত্ব যা কিছু আছে তখন সেগুলো অসহায় হয়ে যায়। সমাজের অন্য যত গোষ্ঠী আছে, পেশাজীবী আছে, তাদের পক্ষে কার্যকর করার কিছু থাকে না। এটি একটি বাস্তবতা। আমরা পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কথা বলছি। যারা  এ অঞ্চলের অধিবাসী, তারা সেই সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন যে, তারা উপযুক্ত ন্যায্য আচরণ চান রাষ্ট্রের কাছে। ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করে নির্বাহী বিভাগ। যেহেতু আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ এখানে আছেন, আমি জানি না ওনারা এক্ষেত্রে কতটা মনোযোগ দেবেন। আমি আশা রাখি, খুব কাছাকাছিই ওনারা নির্বাহী দায়িত্বে যাবেন এবং এ বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, পাহাড়ি, জুম্মা, উপজাতি, স্বদেশি অথবা জাতিগোষ্ঠী- এই ধরণের বিভিন্ন অভিধা আমরা দেখতে পাই। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের অংশ। তাদেরকে সেভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র বা রাজনীতি, ভূ-রাজনীতির সুযোগ নেই। তাদেরকে এক সময় বাঙালি বলা হয়েছে। আসলে তারা তো বাঙালি না, তারা বাংলাদেশি। বাংলাদেশি জাতীয়তায় তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, আমি রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দুটো পরিভাষা বা টার্ম আছে। একটি হলো স্টেট বিল্ডিং আরেকটি হলো ন্যাশন বিল্ডিং। রাষ্ট্র বললেই রাষ্ট্র হয় না। রাষ্ট্র তার নাগরিক সাধারণকে এক অভিন্ন সংহতিপূর্ণ করার জন্য ন্যাশন বিল্ডিং প্রগ্রাম পরিচালনা করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানচিত্রে একটা কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু নাগরিক সাধারণকে ঐক্য সংহতির মাধ্যমে একত্রিত করা, বিভেদ বিভাজন ভুলে গিয়ে অভিন্ন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ার চেষ্টা করা হয়নি। গায়ের জোরে বলা হলো বাঙালি হয়ে যাও।

তিনি বলেন, সাউথ সুদান স্টাইলে এখানে একটি খৃষ্টরাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্র চলছে। যখন তারা খৃষ্টরাষ্ট্র করবে, তখন তারা কেবল নামে খৃষ্টরাষ্ট্র করবে না। এইসব এলাকায় যেভাবে ধর্মান্তরিত হচ্ছে মানুষ, তাতে এই এলাকায় একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে সকলেই আমরা জানি। এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ঠেকাতে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকটায় আমাদের সতর্ক হতে হবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও একই সাথে রাজনৈতিক উপায়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ওই ভূখণ্ড রক্ষার জন্য আমাদের সেনাবাহিনীকে সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিবেদিত ভাবে জাতীয় নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক কাজ করতে হবে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, তথা কথিত আদিবাসী দিবসে দু’একটি মহল থেকে অভিযোগ উঠছে বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলে আদিবাসীরা বৈষম্যের শিকার। আমি এই অভিযোগটির সাথে পুরোপুরি সহমত পোষণ করছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিমতম অধিবাসী হলো বাঙালিরা। আর এই বাঙালিরাই নজিরবিহীন বৈষম্যের শিকার। ইনডিজেনাস কিংবা ফাস্ট ন্যাশনসহ যে ইংরেজি শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, এগুলোর কোনো উপযুক্ত বাংলা শব্দ নেই। আদিবাসী শব্দটা কখন কীভাবে কোথা থেকে আমদানি হলো এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। কারণ ইংরেজি যে শব্দগুলোর বাংলা অর্থ হিসেবে আমরা আদিবাসী শব্দটা ব্যবহার করছি, সেই শব্দগুলোরও কোনো সার্বজনিন সংজ্ঞা নেই। উপনিবেশ শুরু হবার ৬২ বছর আগে থেকে যে বাঙালি পাহাড় অঞ্চল থেকে শুরু করে মিজোরামের সীমান্ত পর্যন্ত জীবিকার সন্ধানে গিয়েছে। তাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যদি এই পরিবেশের সংশ্লিষ্টতা না থাকে তাহলে প্রকৃত আদিবাসী কারা?

তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্যটা হচ্ছে বাঙালিদের সাথে। দেখেন, তারা ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠী। অথচ তাদের জাতীয় সংসদে বা আঞ্চলিক পরিষদে কোথাও কোনো যৌক্তিক প্রতিনিধিত্ব নেই। ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই ৫০ শতাংশ লোকের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য শুধুমাত্র একজন বাঙালি খুঁজে পাই। আপনারা জানেন যে, ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি আসনে একজন বাঙালিকে নমিনেশন দেয়া হয়েছিল এবং তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাহলে এই আদিমতম অধিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে কীভাবে?

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বাবু রুইথি কারবারী  বলেন, আমি বলতে চাই, আমরা হলাম বাংলাদেশি মারমা। মারমা জনগোষ্ঠী এককালে মারমা ছিল না। সবাই ছিলো মগ। আকার নাই, ইকার নেই, শুধুই মগ। লেখা নেই, পড়া নেই, শিক্ষা নেই, দীক্ষা নেই। যাকে বলে মগ। আমি বলতে চাই, আমরা হলাম বাংলাদেশি মারমা। আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি। আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না। আমরা অশান্তি চাই না। যখন ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির পর যখন অস্ত্র সমার্পণ হলো তখন মারমা শান্তিবাহিনী কতজন ছিল? নিশ্চয়ই আপনারা তা জানেন। তাই আমি বলতে চাই, আমাদের পিছিয়ে পড়া সমাজকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা অধিকার দেয়ার জন্য অনুরোধ রাখছি।

তিনি বলেন, আমরা মারমা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। আমাদের মারমা থেকে এখনো পর্যন্ত একজন ভালো উকিল, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মি অফিসার কিংবা সেক্রেটারি হয়নি। আমাদের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে কীভাবে অগ্রসর করে আনা যায় সে লক্ষ্যে আমরা চেষ্টা করছি। আমরা বাংলাদেশি, বাংলাদেশের মারমা হিসেবে পরিচয় দিতে চাই। মারমা জাতি হিসেবে সকলের সাথে সুখে শান্তিতে এবং সকলের সাথে পাহাড়ি বাঙালি চাকমা মারমা বৈদ্য, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সবাই সম্মিলিতভাবে বসবাস করতে চাই।

বৈঠকে পার্বত্যনিউজের নির্বাহী সম্পাদক ও পার্বত্য গবেষক সৈয়দ ইবনে রহমত বলেন, বাংলাদেশে বসবাস করেন কিন্তু বাঙালি নন এমন জনগোষ্ঠিগুলোর কতিপয় চিহ্নিত ব্যক্তি ২০০৭ সালের মাঝামাঝি থেকে নিজেদের আদিবাসী দাবি করে আসছেন। আর তাদের এই দাবির পেছনে অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি কতিপয় এনজিও।

কিন্তু ইতিহাস, নৃ-তত্ত্বসহ কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা এই দেশের আদিবাসী নন। তারপরও কিছু মানুষ জেনে কিংবা না জেনে তাদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করে যাচ্ছেন। এই প্রবণতা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য খুবই স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার জন্য ‘আদিবাসী’ ইস্যুটি কেন স্পর্শকাতর সেটি বুঝতে হলে দাবিটি উত্থাপনের সময়কালের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করে। যে ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের নিজ নিজ এলাকার ভূখণ্ড, সেখানকার খনিজসহ সকল সম্পদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি তাদের ইচ্ছাধীন করা হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্র কোনো আইন বা পদক্ষেপ নিতে হলে সেটিও তাদের ইচ্ছাধীন করে দেয়া হয়েছে।

এককথায় তাদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়া হয়েছে। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়ে থাকলে তাদের নির্বিঘ্নে ও অবাধে সীমান্ত অতিক্রম করে পরস্পরের সাথে মেলামেশার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সক্রিয় আছে। বর্তমানে সেখানে ছয়টি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। যাদের অনেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের সাথে যুক্ত করার দাবিও জানাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং মায়নমারের আরাকান ও চীন রাজ্যে বহু সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

এদের অনেকেই আবার আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠীগুলোর জ্ঞাতি ভাই। এই অবস্থায় যদি আমরা তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দেই, তাহলে সেটা শুধু আমাদের জন্য সংকট তৈরি করবে না, বরং মায়ানমার এবং ভারতের জন্যও নিরাপত্তা সংকট বাড়িয়ে দেবে। এখন আমরা তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বিপন্ন করার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সংকট বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবো কি না, সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে।

বক্তব্যের শেষে এ বিষয়ে কয়েকটি উপায় তুলে ধরেন এই গবেষক। উপায়গুলো হলো-
প্রথমত, আদিবাসী ইস্যুকে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ইস্যু হিসেবে বিবেচনা না করে আমাদের জাতীয় ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং সকল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে এই ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আদিবাসী ইস্যুর পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠীর অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, সংবিধানে জাতীয়তার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ের বাইরে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ ও ‘সম্প্রদায়’সহ এই ধরনের অন্য কোনো শব্দ বা অভিধা রাখা যাবে না।

কেননা, এসব শব্দ নিয়ে বিভিন্ন সময় আপত্তি তোলা হয়েছে এবং হচ্ছে। আর সেই বিতর্ক উসকে দিয়ে কেউ কেউ নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি তোলার সুযোগ নিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ২৩ এর (ক) অনুচ্ছেদ বিলোপ করতে হবে। কেননা, সংবিধানের ২৩ এর (ক) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, অনুচ্ছেদ ২৩-এর মাধ্যমেই সেটা পূরণ করা সম্ভব। আর এর মাধ্যমেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুর সমাধান করা যাবে বলে আশা করেন সৈয়দ ইবনে রহমত।

ইঞ্জিনিয়ার চিং মং শাক বলেন, ২০০৭ সালের আগে আদিবাসী ছিল না। উপজাতি ছিল ট্রাইভাল। এই ট্রাইভাল বাংলায় অনুবাদ করে উপজাতি করা হয়। ২০০৭ সালে আনা হয় ইনডিজেনাস। এখন আমরা হয়ে গেছি আদিবাসী। কেনো ভাই, আমরা কি শাপের মতো কিংবা কাকড়ার মতো মাসে তিন বার খোলোস পাল্টাব নাকি? আমার তো একটা পরিচয় আছে। আমি বাঙালি ভাইদের প্রশ্ন করি, যদি জাতিসংঘ বলে আপনারা বাঙালি নয়, আপনারা কি জাতীয়তা পাল্টাবেন? আমার নিজের কাছে খুবই হাস্যকার লাগে যখন আমার জাতি ভাইয়েরা বলে আমরা আদিবাসী।

তিনি বলেন, যারা আমাদেরকে নিয়ে রাজনীতি করছেন, তারা কি আমাদের কাছে কখনো জানতে চাইছেন যে, আমি কোন পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাই। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশ মানুষ আদিবাসী কিনা, উপজাতি কিনা, জুম্মুল্যান্ড কিনা এই বিতর্ক মাথায় ঢুকান না। তারা চিন্তা করে কীভাবে তিনবেলা দুমোঠে খেয়ে বেঁচে থাকা যায়। যারা দাবি করছেন যে তারা পাহাড়ের ৮০ শতাংশ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন। অথচ তারাই বিতর্কিত কথা বলে সংখ্যাগরিষ্ট বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাহাড়িদের উসকে দিচ্ছেন। তাই সকলের কাছে করজোরে অনুরোধ করব, আমাদের বিতর্কে ফেলবেন না। আমরা এদেশের নাগরিক, আমরা বাংলাদেশি হিসেবে বাঁচতে চাই।

ছাত্রনেতা পাইশিখই মারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা স্বোচ্চার এবং ফেইসবুক থেকে শুরু করে অনলাইন মিডিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছি। যে কারণে তারা আমাকে টার্গেট করেছে। ৫ আগস্ট ২০২৫ গণঅভ্যুত্থান দিবসে সরকারি ছুটির দিন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাড়ি থেকে বিহারে যাই। সেখানে জেএসএস সন্তু লারমার লোকেরা আমাকে প্রচণ্ড মারধর করে আহত করে। তারা সেখানে আমাকে অপহরণ, গুম করে মেরে ফেলার চেষ্টা চালায়। যিনি আমাদের সামনে বসে আছেন পার্বত্য নিউজের সম্পাদক এবং সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশকে সেদিন ওখানে আমার লোকেশনটা জানাই। যার ফলে সাথে সাথে আমাদের কাপ্তাই জোনের বিজিবি আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করান। পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস’র সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতিবাদ করার কারণে আমরা তাদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছি।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: নজরুল ইসলাম বশির, সিএইচটিআরএফ গোলটেবিল বৈঠক ২০২৫
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন