সবার মিত্র হোক সর্বমিত্র চাকমা


ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের মতো একটি ধর্মীয় মতাদর্শী প্যানেলে সর্বমিত্র চাকমার অংশগ্রহণ আমার বেশ খটকায় ফেলেছিল। বিশেষ করে সেই প্যানেলে ভিপি ও জিএস পদে যখন দু’জন পার্বত্য বাঙালি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যাদেরকে ওরা ‘স্যাটেলার’ বলে ডাকে এবং সাদিক কায়েম ও ফরহাদ দীর্ঘদিন পার্বত্য বাঙালি আন্দোলন নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সে কারণে খটকার মাত্রা বেশি ছিল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর ডাকসু ক্যাম্পাস ভবঘুরে, হকার, বহিরাগত ও মাদকমুক্ত করার ক্ষেত্রে সর্বমিত্র চাকমার ফাটাকেষ্ট রোলটা আমার বেশ ভালো লেগেছিল। সে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ সমালোচনা হলেও আমি চুপ ছিলাম। বিচার যেখানে অত্যন্ত জটিল, ধীর ও অনেকটা অসম্ভব সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এবং সীমিত পর্যায়ে ফাটাকেষ্টের ভূমিকা মহৌষধ হিসেবে কাজ দেয়। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ও ডাকাত নিয়ন্ত্রণে ছাত্রদের ভূমিকা তার প্রমাণ।
কিছুদিন আগে (সেপ্টেম্বরে) খাগড়াছড়িতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনায় সর্বমিত্রের দায়িত্বশীল আচরণ আমাকে ওর প্রতি আকর্ষণ করতে শুরু করে। এবারের ডাকসুতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ভিপি, জিএস সহ চারটি পদে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার জন্য আনন্দের জায়গা। শিক্ষা ও নেতৃত্বে পাহাড় যে পিছিয়ে নেই, এটা তার প্রমাণ। এদিকে সর্বমিত্র ছেলেটি ধীরে ধীরে সবার মিত্র হয়ে উঠছেন সেটা দেখতে পাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম ছেলেটাকে ডেকে একদিন কথা বলব। তারেক রহমান গতকাল যেমন চট্টগ্রামে বললেন, পাহাড় ও সমতলে সবার একই পরিচয়- বাংলাদেশি। সর্বমিত্রের এই বাংলাদেশি হয়ে ওঠা, বাংলাদেশকে ওউন করতে দেখা আমার জন্য সুখের ব্যাপার।
আমি চাই পাহাড় থেকে এভাবেই আরো ছেলেমেয়েরা উঠে আসুক, কেবল ডাকসু নয়, ঢাকার নেতৃত্ব দিক। জাতীয় পর্যায়ে নেতা হয়ে উঠুক। এবারে ঢাকায় যারা সংসদ সদস্য নির্বাচন করছেন তাদের অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এভাবে পাহাড়ের কেউ হোক বাঙালি অথবা পাহাড়ি ঢাকায়, চট্টগ্রামে, রাজশাহী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোক, মেয়র হোক এটা আমি সর্বান্তকরণে চাই।
কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী নয়, অন্যান্য বড় মন্ত্রণালয়েও নিজ যোগ্যতা দিয়ে নেতৃত্ব দিক সেটাও চাই। নৃতাত্ত্বিক পরিচয় যার যাই থাকুক, নাগরিক পরিচয়ে সবাই বাংলাদেশি হোক, বাংলাদেশকে ওউন করুক, বাংলাদেশী পরিচয়ে গর্বিত হোক- এটা আমার একান্ত চাওয়া।
এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে সর্বমিত্র যেটা করেছেন সেটা যদি শিশুদের জন্য না হতো তাহলে আমি তেমন কিছু মনে করতাম না। আসলে রাজধানীতে শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠই বা কোথায়? এই শিশুরা কোথায় যাবে? কোথায় খেলাধুলা করে বেড়ে উঠবে? আমরা তো ওদের স্বতন্ত্র জায়গা দিতে পারি নি। ফলে অনধিকার চর্চা করেও ওরা মনের টানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে খেলতে গিয়েছে। হয়তো এর মধ্যে কিছু দুষ্কৃতকারী তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু শিশুদের ঢুকিয়ে দিয়ে থাকতে পারে, চুরির মতো গর্হিত কাজে। তবুও তো ওরা শিশুই। তাদের জন্য ওর এই আচরণ মেনে নিতে পারিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছিল। প্রত্যাশা ছিল সর্বমিত্র ভুল স্বীকার করে নিজেকে শুধরে নেবেন।
কিন্তু ও যেটি করল তা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ভুলের দায় নিয়ে একেবারে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বসবে এটা অনাকাঙ্ক্ষিতও বটে। ওর সিদ্ধান্তে হয়ত আবেগ থাকতে পারে, হতাশা থাকতে পারে, কিন্তু এই সিদ্ধান্তে ওর সততা, নির্লোভ ও চারিত্রিক দৃঢ়তার আভাস পাওয়া যায়। যে দেশে সুবিধাবাদিতা ও ক্ষমতা সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত এবং যেকোনো মূল্যে মানুষ এই দুই অবস্থান ত্যাগ করতে অক্ষম, সেখানে ওর এই সিদ্ধান্ত খুবই ব্যতিক্রম।
জাতীয় পর্যায়ে আমরা শত অপরাধ, অন্যায় ও বিতর্ক সৃষ্টি করে দেশের মানুষের প্রবল দাবির মুখেও এভাবে সিনিয়রদের কাউকে ক্ষমতা বা দায়িত্ব ছেড়ে দিতে দেখি না। সেখানে সর্বমিত্র অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এ কারণে ওর এই সিদ্ধান্তকে আমি শ্রদ্ধা করি। ওর এই সিদ্ধান্তের প্রতি আমি সমর্থন জানাই। সর্বমিত্র একদিন প্রকৃতপক্ষেই সবার মিত্র বা দেশের ১৮ কোটি মানুষের মিত্র হয়ে উঠুক, এই প্রত্যাশা সবসময় থাকবে ওর কাছে।
লেখক : সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ও চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্স ফাউন্ডেশন, ঢাকা। উৎস : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ লেখকের ফেইসবুক পোস্ট

















