লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা উদ্যোগ পাকিস্তানের

fec-image

পাকিস্তান নীরবে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা শুরু করেছে। আগে প্রকাশ না পাওয়া এই পাকিস্তানি উদ্যোগ সফল হলে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক প্রোফাইল আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। খবর লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আশরাক আল–আওসাত।

পাকিস্তানের এই সম্পৃক্ততার খবর এমন সময়ে সামনে এলো, যখন কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষকেরা লিবিয়ায় কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি প্রচেষ্টার ওপর নজর রাখছেন। ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত সামরিক সংঘাতে মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তার পর থেকেই লিবিয়া পূর্ব ও পশ্চিমভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনের মধ্যে বিভক্ত।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পৃথক মধ্যস্থতা প্রক্রিয়াতেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার সেই ভূমিকাকে কৃতিত্ব দিয়েছে। পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়া-সংক্রান্ত পাকিস্তানের ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্র ‘সম্পূর্ণভাবে অবগত এবং সম্পৃক্ত’ রয়েছে।

দুটি পাকিস্তানি সূত্রই জানিয়েছে, এই প্রচেষ্টায় সৌদি আরবও সমর্থন দিচ্ছে। তাঁরা আরও জানান, এই উদ্যোগ গত বছরের শেষ দিকে শুরু হয়েছিল এবং লিবিয়ার উভয় পক্ষই পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা চেয়েছিল। তবে আঞ্চলিক অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে পাকিস্তান কতটা সমন্বয় করে কাজ করছে, তা স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়াকে পুনরায় একীভূত করার যেকোনো সফল পরিকল্পনার জন্য বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষমতার পদ বণ্টন, নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম এবং তেলের আয় বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধও মেটাতে হবে, যা অতীতের একাধিক উদ্যোগকে ব্যর্থ করেছে।

ব্রিটেনভিত্তিক থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) সহযোগী গবেষক জালেল হারচাউই বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়া ইস্যুতে জোরালোভাবে কাজ করছে। কিন্তু তারা যে কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেটি এখনো শিথিল এবং সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা প্রস্তাবিত ‘লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনা’র সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, নামে একটি নতুন কাঠামোর অধীনে ৩৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা হবে। প্রস্তাবটি সম্পর্কে পাকিস্তানের একটি সূত্র সতর্ক করে জানিয়েছে, এটি এখনো বিস্তারিতভাবে আলোচনা হচ্ছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটির (জিএনইউ) প্রধানমন্ত্রী আবদুলহামিদ দিবেইবাহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) উপ-কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হবেন।

সাদ্দাম হাফতারের পিতা ও এলএনএর প্রধান কমান্ডার খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী লিবিয়ার বৃহত্তম তেলক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় তাঁকে জাতীয় বাজেটের ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া হবে। পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘পুরো এই ব্যবস্থাটি যাতে কার্যকরভাবে টিকে থাকে, তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।’ তবে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

গত মাসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রাওয়ালপিন্ডিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই সাদ্দাম হাফতার ওয়াশিংটন সফর করেন, যেখানে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, রুবিও লিবিয়ার নেতাদের বিভাজন কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং লিবিয়ার জাতীয় ঐক্যের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

রয়টার্স গত ডিসেম্বরে জানিয়েছিল, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা পূর্বাঞ্চলভিত্তিক এলএনএর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী পশ্চিমাঞ্চলভিত্তিক জিএনইউও সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন