ভারতের ত্রুটিপূর্ণ বাঁধে ১৭ কোটি বাংলাদেশির জন্য হুমকি, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষের প্রাক্কালে

হিমালয়ের টিকটিক করছে বাংলাদেশ বিধ্বংসী টাইম বোমা

fec-image

ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে। উজানে ভারতের বেপরোয়া ও একতরফা বাঁধ নির্মাণ, সেই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ প্রকৌশলগত মান এবং অপর্যাপ্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার কারণে ভাটির দেশ বাংলাদেশে ক্রমাগত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। ২০২৫-২৬ সালে উজানে ভারতের একতরফাভাবে চলমান হাইড্রো অবকাঠামো প্রকল্প ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার ভঙ্গুর নদী অববাহিকার বাস্তুসংস্থানকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর ফলে ১৮ কোটির বেশি বাংলাদেশি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি পরিবেশগত স্থিতিশীলতা, সুপেয় পানির সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ের জন্য সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় ভূখ- বেয়ে আসা ৫৪টি অভিন্ন নদীর ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ আইন অনুযায়ী, উজানের দেশগুলো ভাটির প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতাভিত্তিক আলোচনা, জলবায়ু ও পানিসম্পদ-সংক্রান্ত তথ্য (হাইড্রোলজিক্যাল ডাটা) বিনিময় এবং ভাটির দেশের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে না। ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই সর্বজনীন নিয়মগুলো উপেক্ষা করে একটি একচেটিয়া ও স্বার্থান্বেষী পানি শাসন মডেল অনুসরণ করে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো পূর্ব আলোচনা বা সম্মতি ছাড়াই ভারত তিস্তা, গঙ্গা, গোমতী, মহানন্দাসহ অভিন্ন নদীর প্রায় সবগুলোতে শত শত বাঁধ ও ব্যারাজ একতরফাভাবে নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করছে, যা তার অভ্যন্তরীণ কৃষি, শিল্প ও বন্দর স্বার্থরক্ষায় এবং একই সাথে আন্তঃসীমান্ত পানিসম্পদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রকল্পটি হলো সিকিমে ভারতের তিস্তা স্টেজ-৩ বাঁধের একতরফা পুনর্নির্মাণ। ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবরে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত আকস্মিক বন্যার (GLOF) কারণে মূল তিস্তা-৩ বাঁধটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, ২০২৫ সালের শুরুতে ভারতের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটির পুনর্নির্মাণের অনুমোদন দেয়। ওই ভয়াবহ বিপর্যয় ভারতের প্রকৌশল নকশা, বন্যা নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নের মারাত্মক ত্রুটিগুলো পুরোপুরি উন্মোচিত করে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পানিবিজ্ঞান সংস্থাগুলো বারবার এ মর্মে সতর্ক করে, সিকিম একটি ভূমিকম্পপ্রবণ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, যা হিমবাহ বিস্ফোরণ এবং চরম বৃষ্টিপাতের শিকার। তা সত্ত্বেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক শক্তিশালীকরণ, নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন বা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি যাচাই ছাড়াই পুনর্নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়েছে, যা স্পষ্ট প্রকৌশলগত বেপরোয়া এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন পানি আগ্রাসনের বহিঃপ্রকাশ।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত আকস্মিক বন্যায় সিকিমের তিস্তা স্টেজ-৩ বাঁধের ধ্বংসাবশেষ। মৌলিক নকশার ত্রুটিগুলো সমাধান না করেই ভারতের তড়িঘড়ি পুনর্নির্মাণ আবার দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, তড়িঘড়ি করে পুনর্নির্মিত তিস্তা-৩ বাঁধটিতে কাঠামোগত ত্রুটি রয়েই গেছে। এর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা, সেকেলে বন্যা নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং হিমবাহ বিস্ফোরণজনিত বন্যার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মোকাবিলা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা তীব্র হওয়ার পাশাপাশি হিমবাহ গলে যাওয়া ত্বরান্বিত হওয়ায় ত্রুটিপূর্ণ এই বাঁধটি ভেঙে যাওয়া বা অনিয়ন্ত্রিত পানি ছেড়ে দেয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো আকস্মিক পানির তোড় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকায় মারাত্মক আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করবে, যা রাতারাতি গ্রামগুলোকে প্লাবিত করবে, কৃষিজমি ধ্বংস করবে এবং ব্যাপক আকারে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করবে।

এই আশঙ্কা কতটা সঠিক তা প্রমাণিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর। আগের দিন তিস্তা স্টেজ-৩ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বাঁধে জমা থাকা বিপুল পানি তিস্তা নদী হয়ে পরদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে একটি অকালীন ও আকস্মিক বন্যায় তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলা যথাক্রমেÑ লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা আক্রান্ত হয়। পানির তীব্র স্রোতে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে যায়। ৩০ হাজারেরও অধিক মানুষ বন্যার শিকার হয়। নদীভাঙনের মুখে পড়ে বহু ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। ভেসে যায় ফসলের মাঠ ও মাছের খামার।

তিস্তা প্রকল্প ছাড়াও, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বেচ্ছাচারী কার্যব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ বারবার দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। তিস্তা নদীর গজলডোবা ব্যারাজ একতরফাভাবে পরিচালনা করে ভারত শুষ্ক মৌসুমে ৮০ শতাংশের বেশি পানি প্রবাহ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়, যার ফলে বাংলাদেশি কৃষকরা মৌলিক চাষাবাদের জন্যও পর্যাপ্ত পানি পায় না এবং এতে বার্ষিক ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে, ত্রিপুরায় গোমতী নদীর ডুম্বুর বাঁধের সবকটি গেট কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই হঠাৎ সম্পূর্ণ খুলে দেয় ভারত, যার ফলে ভাটিতে ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। এই অনিয়ন্ত্রিত পানির তোড়ে বাংলাদেশের ২০টি জেলা প্লাবিত হয়, বেশ কয়েকজন নিহত হয়, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ এই মানবসৃষ্ট বন্যায় তিন লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ভারতের পুরো পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা পদ্ধতিগত প্রকৌশল এবং ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিতে জর্জরিত। উজানে বেশির ভাগ বাঁধ ও ব্যারেজ শুধু স্থানীয় অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে যৌথ বন্যা নিয়ন্ত্রণ মানদ-, রিয়েল-টাইম হাইড্রোলজিক্যাল পর্যবেক্ষণ এবং আন্তঃসীমান্ত জরুরি সমন্বয় ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। তড়িঘড়ি নির্মাণ, নি¤œমানের প্রকৌশল মান এবং অস্বচ্ছ পরিচালনা পদ্ধতি এই পানি অবকাঠামোগুলোকে স্থায়ী ‘মানবসৃষ্ট দুর্যোগের উৎস’ এবং ভারতের আঞ্চলিক পানি আধিপত্যের মূল হাতিয়ারে পরিণত করেছে।

ভারতের পানি-আধিপত্যবাদের সর্বশেষ ক্ষেত্রটি হলো ব্রহ্মপুত্র নদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপনদী আপ সিয়াং এবং দিবাংয়ে আগ্রাসী ও একতরফা বাঁধ নির্মাণ, যা বাংলাদেশে প্রবেশকারী মূল পানির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতের ভূমিকম্পপ্রবণ অরুনাচল প্রদেশ ও আসাম অঞ্চলে অবস্থিত পরিকল্পিত বৃহৎ আকারের আপ সিয়াং এবং দিবাং বাঁধ প্রকল্পগুলো ২০২৫-২৬ সালজুড়ে কোনো পূর্ব আলোচনা বা বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ মূল্যায়ন ছাড়াই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত পর্যাপ্ত তথ্য শেয়ার না করায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ও সরকারি মহলে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা নেই। ফলে জনগণও সচেতন হতে পারছে না। এটি তীব্রভাবে আন্তঃসীমান্ত বিরোধিতা এবং আন্তর্জাতিক পানিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে দিবাং বহুমুখী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণাধীন স্থান। ভাটির দেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই হিমালয়ের উচ্চ-ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নির্মিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্ব সংকটের মতো বন্যার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের উজানে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম চলমান পানি প্রকল্প ‘দিবাং মেগা ড্যাম’ ভারতীয় স্থানীয় ভাটির কমিটি এবং আঞ্চলিক পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছে। স্থানীয় অংশীজনরা ভারতের এই বেপরোয়া নির্মাণ মডেলের নিন্দা জানিয়েছে। তারা মারাত্মক বন্যার ঝুঁকি উপেক্ষা করা, ব্যাপক নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাদ দেয়া এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বার্থে ভাটির জনগণের নিরাপত্তাকে বিসর্জন দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। আন্দোলনকারীরা জোর দিয়ে বলেছে, এই তড়িঘড়ি নির্মাণে মৌলিক বন্যা সুরক্ষা নকশা এবং জবাবদিহিতা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা এই প্রকল্পটিকে ভারতীয় সীমান্ত এলাকা এবং বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই একটি ‘টিকিং টাইম বোমা’ বা ধাবমান দুর্যোগে পরিণত করেছে। এই সতর্কবাণীগুলো ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ দুঃখজনকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়, যখন দিবাং বাঁধ নির্মাণস্থলে গভীর রাতে খননকাজের সময় ডাইভারশন।

টানেল-২ এর একটি ৬২ মিটার অংশ ধসে পড়ে এবং ভেতরে ৩৫ জন শ্রমিক আটকা পড়ে। ভারতীয় কর্মকর্তারা ডাইভারশন টানেল-৩ এর ‘সফল উন্মোচনকে’ একটি বড় প্রকৌশল মাইলফলক হিসেবে উদযাপনের ঠিক তিন সপ্তাহ পর এই দুর্ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এ ঘটনায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণভাবে তথ্য গোপন করে, দুর্ঘটনাস্থলের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকা সিলগালা করে দেয় এবং সাংবাদিক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের প্রবেশ ঠেকাতে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। ৭২ ঘণ্টা ধরে সরকার কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে কোনো প্রাণহানিবিহীন ‘সামান্য পাথরধস’ বলে দাবি করে। পরবর্তীতে ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, অন্তত ১৪ জন শ্রমিক নিহত এবং ২১ জন নিখোঁজ হন। মূলত ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের নির্মাণের প্রমাণ ধামাচাপা দিতে উদ্ধার তৎপরতা ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করা হয়েছিল। ধসের আগে টানেল ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটিগুলো রিপোর্ট করার চেষ্টা করায় প্রকল্প পরিচালনাকারী সংস্থা এনএইচপিসি লিমিটেড (NHPC Limited) কর্তৃক তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

গত ৪ মার্চ ভারতের অরুণাচল প্রদেশের লোয়ার দিবাং ভ্যালি জেলায় দিবাং বহুমুখী প্রকল্পের (DMP) নির্মাণাধীন স্থানে একটি স্থানীয় কাঠামোগত দুর্ঘটনা ঘটে।

পানিবিজ্ঞানী ও ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা আপ সিয়াং এবং দিবাং প্রকল্পে ভারতের ত্রুটিপূর্ণ প্রকৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোলামেলা প্রশ্ন তুলেছেন। নদী অববাহিকা দুটি হিমালয়ের অত্যন্ত ভঙ্গুর ভূমিকম্প ও ভূমিধসপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে পাহাড়ের গঠন অস্থিতিশীল এবং আবহাওয়াজনিত প্রাকৃতিক খামখেয়ালিপনা প্রায়শই দেখা যায়। তা সত্ত্বেও ভারত আঞ্চলিক ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ দ্রুত করতে সহজীকৃত প্রকৌশল মান এবং সংক্ষিপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত লোডযুক্ত বাঁধের কাঠামোগুলো বর্ষার জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্পের সময় কাঠামোগত বিকৃতি, পানি চুইয়ে পড়া এবং এমনকি সম্পূর্ণ ধসে পড়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। আপ সিয়াং এবং দিবাং নদীতে ভারতের একতরফা নির্মাণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বারবার আনুষ্ঠানিক ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই দুটি জলপথ সমগ্র ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমের মূল প্রবাহ এবং বর্ষার বন্যা নিষ্কাশনের একটি বিশাল অংশ সরবরাহ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই একতরফা পানি নিয়ন্ত্রণ ও ধরে রাখার ফলে বাংলাদেশের জন্য দুটি ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসতে পারে। প্রথমত, তীব্র শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব যা উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনকে অচল করে দেবে এবং দ্বিতীয়ত, বর্ষা মৌসুমে আটকানো পানি ছেড়ে দেয়া, যা দেশজুড়ে মারাত্মক বন্যা সৃষ্টি করবে। উজানে ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্পগুলোর ক্রমাগত স্তূপীকরণ ভাটির বাংলাদেশের পানিতাত্ত্বিক ভারসাম্যকে ধ্বংস করবে, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার অনুপ্রবেশকে তীব্র করবে এবং বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বাস্তুচ্যুতির সংকট তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সমালোচনা করে বলেছেন, ভারতের আপ সিয়াং এবং দিবাং বাঁধের নির্মাণকাজ জোরপূর্বক চালিয়ে নেয়া তার চিরচেনা পানি-আধিপত্যবাদী মানসিকতাকে পুরোপুরি উন্মোচিত করে। এটি আন্তঃসীমান্ত উজানের সম্পদকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করে, নিজস্ব জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং সমস্ত ভূতাত্ত্বিক প্রকৌশলগত ঝুঁকি ও ভাটির পরিবেশগত ও মানবিক মূল্য বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেয়, যা সমতাভিত্তিক ব্যবহার এবং বড় ধরনের ক্ষতি না করার আন্তর্জাতিক পানি আইনের মূল নীতিগুলোর গুরুতর লঙ্ঘন।

দিবাং ও আপ সিয়াং বাঁধসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিক্ষোভ। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই প্রকল্পগুলো আঞ্চলিক পরিবেশ এবং ভাটির দেশ বাংলাদেশের টিকে থাকা—উভয়ের জন্যই হুমকি।

ভারতের এই আধিপত্যবাদী এবং নিম্নমানের পানি শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমিক খরা ও বন্যার একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। শুষ্ক মৌসুমে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে ব্যাপক আকারে একতরফা পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে ভাটির পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, যার ফলে নদীগর্ভ শুকিয়ে যায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নেমে যায় এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক ভূমির মরুকরণ ঘটে। গত ছয় বছরে, ক্রমাগত পানি আটকে রাখার কারণে কেবল তিস্তা অববাহিকাতেই ১৭১ বর্গকিলোমিটার উর্বর জমি বিলীন হয়ে গেছে অথবা চাষের অনুপযোগী করে তুলেছে। অন্যদিকে বর্ষাকালে, ভারতের দুর্বল ব্যবস্থাপনায় নির্মিত বাঁধগুলো কোনো সমন্বয় ছাড়াই বন্যার পানি একসঙ্গে ছেড়ে দেয়, যা ক্রমাগত ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনে এবং এর ফলে মৌসুমি কৃষি ফসল ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়।

ভারতের পানি-আধিপত্য এবং ত্রুটিপূর্ণ প্রকৌশল পরিচালনার সম্মিলিত প্রভাব অপূরণীয় পরিবেশগত বিপর্যয় এবং মানবিক সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। উজানে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ তীব্র হয়েছে, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ম্যানগ্রোভ বনের ব্যাপক ধ্বংস, মাছের মজুদ কমে যাওয়া এবং জলাভূমির ক্ষয় আঞ্চলিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করেছে, বেঙ্গল টাইগারসহ বিপন্ন প্রজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঝড় সুরক্ষাকবচকে দুর্বল করে দিয়েছে; যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রতি দেশের ভঙ্গুরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিকভাবে শুধু ফারাক্কা ব্যারাজের কারণেই বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন এবং পানি সরবরাহ খাতে বার্ষিক পাঁচ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সামাজিকভাবে, বারবার মানবসৃষ্ট খরা, বন্যা এবং নদীভাঙনের ফলে লাখ লাখ মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির জন্ম দিচ্ছে, দারিদ্র্যকে বাড়িয়ে তুলছে এবং সম্ভাব্য সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ সতর্ক করেছে, ভারতের ক্রমাগত একতরফা উজান নির্মাণ এবং স্বেচ্ছাচারী পানি নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত ভাটির দেশজুড়ে একটি বড় আকারের এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটে রূপ নেবে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা পানি আগ্রাসন এবং বারবার মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের নাগরিক ও নাগরিক সমাজ দফায় দফায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। তারা ভারতের একতরফা বাঁধ নির্মাণ বন্ধ, ন্যায়সঙ্গত পানি বণ্টন পুনরায় শুরু এবং একটি স্বচ্ছ আন্তঃসীমান্ত আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা জোর দিয়ে বলছে, আন্তঃসীমান্ত নদীর সম্পদ যৌথ পাবলিক সম্পত্তি, ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের একচেটিয়া হাতিয়ার নয় এবং ভারতের ত্রুটিপূর্ণ, স্বার্থান্বেষী পানি প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক সমতা ও ক্ষতি না করার নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।

আগামী ১২ ডিসেম্বর, ২০২৬-এ ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় আঞ্চলিক পানি উত্তেজনা একটি জটিল সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নতুন চুক্তির প্রস্তাব করেছে যেখানে শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা এবং বাধ্যতামূলক আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ সতর্কীকরণ ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে ইতোমধ্যেই।

তবে ভারত একটি কঠোর একতরফা অবস্থান গ্রহণ করেছে, বহমান পানি এবং ন্যূনতম পানি প্রবাহের গ্যারান্টি ক্লজ দিতে অস্বীকার করছে এবং তাদের নিজস্ব উন্নয়ন চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তিটি সংশোধন করার চেষ্টা করছে; যেখানে বাংলাদেশের টিকে থাকার স্বার্থ এবং ভারতের নি¤œমানের প্রকৌশল প্রকল্পের কারণে ভাটির দেশের দুর্যোগের ঝুঁকিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞরা ভারতের এই পানি-আধিপত্যবাদী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তঃসীমান্ত নদী শাসনের ক্ষেত্রে উজানের দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও দায়িত্ব রয়েছে। ভারতের তড়িঘড়ি ও নি¤œমানের একতরফা নির্মাণ এবং স্বার্থান্বেষী পানি নিয়ন্ত্রণ কেবল আঞ্চলিক পরিবেশগত ভারসাম্যই নষ্ট করছে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভারতকে সমস্ত ত্রুটিপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত বাঁধের ব্যাপক নিরাপত্তা সংশোধন করতে, একটি রিয়েল-টাইম হাইড্রোলজিক্যাল ডাটা শেয়ারিং এবং বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং একতরফা পানি আধিপত্য পরিহার করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু ভাটির দেশ হওয়ায় ভারতকে আটকানো বাধ্য করার কত যথেষ্ট কার্ড বাংলাদেশের হাতে। সে কারণে বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তানের উদাহরণ সামনে নিয়ে এসেছে। অপারেশন সিন্দুরের পর ভারত ১৯৬০ সালে সম্পাদিত সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে। এক্ষেত্রে তারা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক আইন নিয়েও আপত্তি তোলে। ফলে পাকিস্তান বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের আন্তঃনদী পানি বণ্টন, ফারাক্কার পানি বণ্টন এবং উজানের একতরফা বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ উদ্ধারে বিষয়টিকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করা হলে ভারতের ওপর কার্যত একটি চাপ পড়বে। তাছাড়া এই নদীগুলো উৎস থেকে চায়না, ভুটান, নেপাল প্রভৃতি দেশ হয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। ফলে নদীর অববাহিকা ভিত্তিক বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে নদীর হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা শেয়ারিং, বণ্টন নীতিমালা তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত লাভবান হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ফারাক্কা সমস্যা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কিন্তু এই প্রকল্প বাধা বাধাগ্রস্ত করার জন্য বাংলাদেশের ভিতর নানা ধরনের অপতথ্য ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে একটি মহল। অন্যদিকে তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকার আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকার এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই চায়না তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত আন্তঃনদী সমস্যা সমাধানে নদী অববাহিকার সব দেশের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া। কোনো ধরনের চাপের কাছে বশ্যতা স্বীকার না করে দেশের এই জীবন-মরণ সমস্যা সমাধানে দৃঢ পদক্ষেপ নেয়া।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: তিস্তা প্রকল্প, পানি বন্টন চুক্তি, ভারত
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন