ইবোলা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ, কীভাবে ছড়ায়, লক্ষণ কী কী

fec-image

ডিআর কঙ্গো-এ নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাস নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে এমন এক অঞ্চলে, যেখানে চলমান সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এবার যে ধরনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে, সেটিও তুলনামূলক বিরল।

বিশ্বের জন্য কি বড় হুমকি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলা প্রাদুর্ভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও, বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করছেন যে, এটি কোভিড-১৯-এর মতো বিশ্বব্যাপী মহামারির রূপ নেবে না। বিশ্বজুড়ে এই ভাইরাসের বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। এমনকি ২০১৪-১৬ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের সময়েও যুক্তরাজ্যে মাত্র তিনজন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারা সবাই ছিলেন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সাইন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেন, বিশ্বব্যাপী মহামারির ঝুঁকি না থাকলেও, এই ঘোষণা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডার জন্য বড় ঝুঁকি রয়েছে। ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে উগান্ডায় এরই মধ্যে দুজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একজন মারা গেছেন।

প্রাদুর্ভাব কতটা গুরুতর?
বর্তমানে প্রায় ২৫০টি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

কোন ধরনের ইবোলা ছড়াচ্ছে?
এবারের প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে ‘বুন্ডিবুগিও’ প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস। এটি খুবই বিরল এবং আগে মাত্র দুইবার বড় প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে-২০০৭ ও ২০১২ সালে।এই ধরনের ইবোলার জন্য এখনো অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

লক্ষণ কী কী?
সংক্রমণের দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথমে সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন-জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি। পরে পরিস্থিতি গুরুতর হলে দেখা দিতে পারে- বমি, ডায়রিয়া, শরীরের অঙ্গ বিকল হওয়া, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ।

কীভাবে ছড়ায়?
ইবোলা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল-যেমন রক্ত, বমি বা অন্যান্য নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণত উপসর্গ প্রকাশের পর সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের তরল খাবার, পুষ্টি ও ব্যথানাশক সেবার (সাপোর্টিভ কেয়ার) মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।

দেরিতে শনাক্ত
কঙ্গোয় গত ২৪ এপ্রিল প্রথম এক নার্সের শরীরে লক্ষণ দেখা দিলেও প্রাদুর্ভাব নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তিন সপ্তাহ সময় লেগেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ড. অ্যান কোরি বলেন, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অলক্ষ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর পর এটি শনাক্ত হয়েছে, যা বেশ উদ্বেগজনক। ডব্লিউএইচও আশঙ্কা করছে, বর্তমানে যে সংখ্যার কথা জানা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে আক্রান্তের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

বর্তমানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশন, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতাল ও দাফন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না ছড়ায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে কঙ্গোর যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে, যেখানে আড়াই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, সেখানে এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। আক্রান্ত অঞ্চলের অনেকগুলোই খনি এলাকা, যেখানে মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি। ফলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত করা, তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানো। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ডিআর কঙ্গোর আগেও ইবোলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখনকার পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে নাকি এটি বড় আকারের সংকটে পরিণত হবে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন