বান্দরবানের থানচিতে বিদ্যালয়ের ব্যয় মিটাতে নৌকা চালাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক


ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। নদীর উপর পাতলা কুয়াশা। দূরে ভেসে আসে ইঞ্জিনের শব্দ। নদীর ঘাটে একটি ছোট্ট ইঞ্জিনচালিত নৌকা বাঁধা।
নৌকার স্টিয়ারিংয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। পরনে সাদা রঙের জার্সি, মাথায় লাল টুপি আর হাফপ্যান্ট পড়ে চোখে ক্লান্তি। কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। তিনি কোনো পেশাদার মাঝি নন। তিনি তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক প্রধান শিক্ষক।
বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু ইউনিয়ন। চারদিকে পাহাড়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী।এখানে পৌঁছাতে হলে এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। বৃষ্টি নামলে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। এই প্রত্যন্ত জনপদেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। কিন্তু সেই স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে নেই পর্যাপ্ত অর্থ। শিক্ষকদের বেতন বকেয়া মাসের পর মাস। কেউ পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবুও বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।
তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন সাথে নৌকায় বসে কথা হয় প্রতিবেদকের সাথে। তিনি আবেগে জানিয়েছে, বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিয়মিত বেতন আদায় সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষকদের বেতনভাতা দেওয়া প্রতিষ্টার পর থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় থানচি উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিন চালিত বোট দিয়ে প্রতি শুক্রবার, শনিবার ও সরকারী ছুটির দিনে থানচি থেকে তিন্দু বড় পাথর,রেমাক্রী ফলস রুটে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক আরো জানিয়েছে, অন্য চালক রাখলে আলাদা মজুরি দিতে হয়, চালক অনেক সময় আয়ের টাকা গোপন রাখে। সেজন্য তিনি নিজেই চালক হলে সেই টাকাগুলো বাঁচে’ যা শিক্ষকদের সামান্য বেতন হিসেবে দিতে পারেন। আর চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং।
দুর্গম এই অঞ্চলের তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে ২০১৮সালে এমবিএ গ্রেজুয়েশন পর কক্সবাজার টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালে এলাকার কিছু শিক্ষা অনুরাগীর প্রচেষ্টায় দুর্গম এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠান লগ্নে পর থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন বামং খিয়াং মিংলেন। এরপর শুরু হয় শিক্ষকতার জীবনে চলার পথ।
তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেনীর শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমা। তিনি জানিয়েছে, তাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করছেন। তিনি সবসময় বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কথা ভাবেন। এজন্য আমরা শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
ভোর হলে এখন আর তিনি শুধু স্কুলের খাতা নিয়ে বসেন না। নদীর ঘাটে গিয়ে ধরেন বোটের স্টিয়ারিং। কারণ শিক্ষকদের বেতন জোগাড় করতে হবে। সাঙ্গু নদীর উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে তিনি যাত্রী পারাপার করেন। কখনো বাজারের মানুষ, কখনো রোগী, কখনো পাহাড়ি পরিবারের শিশু সবাইকে পৌঁছে দেন গন্তব্যে। কেননা বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যােগ নিয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সামান্য বেতন জোগাতে আর প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে নিজেই ইঞ্জিন চালিত বোটের চালক হয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করছেন।
তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা সভাপতি মংপ্রু অং মারমা বলেন, চেয়ারম্যান থাকাকালীন ইউনিয়নের টোল-টেক্সের মাধ্যমে যে অর্থ পেতাম সেসব অর্থ বিদ্যালয় তহবিলে দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া বোটে আয় থেকেই বিদ্যালয়টি কোনমতে চলছে।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৮৮কিলোমিটার এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দুরে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ট – ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছরে ৯ম শ্রেনী চালু করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছয়জন শিক্ষক অল্পবেতনে নিয়মিত পাঠদান করছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমে ৮জন শিক্ষক ও ৫ জন কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারনে ২জন শিক্ষক নন-পেমেন্ট ভিত্তিতে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদেরও বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে এই শিক্ষকের।
একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক পাওয়াই ম্রো বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়েও তাঁর মধ্যে কোন অহংকার নেই। বরং তিনি নিজেই ইঞ্জিন চালিত বোট চালিয়ে যা আয় করেন এবং সেই আয়ের অর্থ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দেন। আর এই সামান্য অর্থ দিয়েই আমরা কোনরকমে সংসার পরিচালনা করছি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
চলতি মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই বোট দিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করে ৪৯ হাজার ১০০টাকা আয় হয়েছে। এরমধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষকদের বেতন জোগানই নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া এবং সাঙ্গু নদী পারাপারেও নিজেই দায়িত্ব পালন করেন প্রধান শিক্ষক।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দরিদ্র হওয়ায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত আয় নেই। তাই টেকসই সমাধান হিসেবে তিন্দু ও রেমাক্রি এলাকায় দুটি বিদ্যালয়কে দুটি ইঞ্জিন চালিত বোট দেওয়া হয়েছিল, যাতে পর্যটক পরিবহন করে যা আয় হয় তা দিয়ে শিক্ষকদের নূন্যতম বেতন দেওয়া যায়। সামনে আরও একটি বোট প্রদান করার চিন্তাভাবনা রয়েছে এবং বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।

















