খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামী জীবন

fec-image

বাংলাদেশের রাজনীতির আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্বস্বীকৃত। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে খালেদা জিয়ার নাম। বাংলাদেশ বিনির্মাণে খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদান কেবল ইতিহাসের পাতায় নয়, জায়গা করে নিয়েছে গণমানুষের হৃদয়ে। আপসহীন রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি সাধারণ এক সেনা গৃহবধূ থেকে হয়ে উঠেছেন গণমানুষের প্রিয় নেত্রী, বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী।

স্বাধীনতার পর দেশ-বিদেশের নানা ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে হানা দিয়েছে একের পর এক স্বৈরতন্ত্রের আপদ। যাদের নির্লজ্জ স্বৈরশাসনে বিপদে পড়েছে এদেশের মানুষ। মাটি ও মানুষের পক্ষে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার মহান ব্রত নিয়ে রাজপথের সংগ্রামে দৃঢ় সংকল্পে নেমে এসেছেন খালেদা জিয়া। দেশ, দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি থেকেছেন অবিচল। দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষ ছেড়ে তিনি থাকতে চাননি। তার নিজের ভাষায়, এই দেশ ও এই দেশের মাটিই আমার শেষ ঠিকানা।

যে মাটিকে ভালোবেসে হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করলেন, সেই মাটিতেই রচিত হলো তাঁর শেষ শয্যা। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় চির বিদায় নিলেন তিনি। চোখের পানিতে বিদায় জানালো বাংলাদেশ।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার কিংবা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন, সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ এশিয়ার আইকনিক রাজনীতিক, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েও অতি সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন তিনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুস্মরণ করে সাধারণ বাঙালি গৃহবধূর পরিমিত জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে পৌঁছে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

১৯৮৪ সালে বিএনপির দায়িত্ব নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে বেগম খালেদা জিয়া গড়ে তোলেন তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন। তাঁর আপোষহীন নেতৃত্বে নব্বইয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি পতন ঘটায় স্বৈরশাসক এরশাদের। এই সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন তিনি। গ্রেপ্তার, সেনা হেফাজত কিংবা জেল জীবনে কখনো ভয় পাননি গণমানুষের এই সাহসী নেত্রী।

এক-এগারো দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের মুখে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। সেনা সমর্থিত সরকারের ‘দেশত্যাগ’ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে এদেশের মাটিকেই বেছে নেন তিনি। সেদিন দৃঢ়কণ্ঠে খালেদা জিয়া জানালেন, কোথাও যাবেন না তিনি। বাংলাদেশের বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই। মরলে এদেশের মাটিতেই মরবেন তিনি। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। এক-এগারোয় বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয় তিনি ও তাঁর ছেলেদের ওপর।

জীবন চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রেখেও ছোট ছেলের লাশ বুকে নিয়ে কেঁদেছেন তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর আরেক ছেলের নির্বাসন জীবনের কষ্ট বুকে চেপে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের লড়াই চালান তিনি। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর এক কাপড়ে স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ৪০ বছরের বাড়ি থেকে তিনি যেদিন বেরিয়ে আসেন সেদিনে তাঁর কান্নায় নীরবে কেঁদেছে দেশ। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠায় শেখ হাসিনার সরকার। বিএনপি নেতাদের অনেকের অভিযোগ- খালেদা জিয়ার অসুস্থতার পেছনে শেখ হাসিনা দায়ী। পরিকল্পিতভাবে অসুস্থ্য করে তোলা হয়েছে তাঁকে।

১৯৮২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে আপোষহীন লড়াই ও সংগ্রামে। এক মুহূর্তের জন্যও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি। ন্যায়-সঙ্গত প্রতিটি লড়াই-সংগ্রামেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, খালেদা জিয়ার এই চির বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেখে গেলেন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। যেই অধ্যায় থেকে প্রেরণা নিয়ে এগিয়ে যাবেন তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি। সবার আগে এগিয়ে নেবেন প্রিয় বাংলাদেশকে।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক, ই-মেইল : [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, নজরুল ইসলাম বশির
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন