বাংলাদেশি তরুণদের চোখে : চীনের বাস্তবসম্মত সমাধান বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন জাগায়

fec-image

সাম্প্রতিক সময়ে ৩৫ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশি তরুণ ও নারী প্রতিনিধিদের একটি দল চীন সফর করেছে এবং চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সামাজিক আন্দোলনের যুব শাখার সদস্য। তারা শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যে চীনে যাননি। বরং, নিজেদের দেশের উন্নয়নের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজতে তারা চীন সফর করেছেন।

এই উদ্যমী প্রতিনিধিদল ৫ জুন থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত চংকিং ও সাংহাই সফর করে। ব্যস্ত এই সফরে তারা চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক কাছ থেকে দেখেন। চংকিংয়ে তারা অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট প্রযুক্তি দেখেন। পাশাপাশি ‘পাহাড়ি শহর’ হিসেবে পরিচিত এই শহরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা জানতে চাওতিয়ানমেন পাইকারি বাজারও ঘুরে দেখেন। তারা মিনঝু গ্রামে তৃণমূল পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানেন এবং শক্তি সাশ্রয় ও টেকসই উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহারও পর্যবেক্ষণ করেন।

সাংহাইয়ে তারা সাংহাই ইয়ুথ ম্যানেজমেন্ট কলেজ (সাংহাই কমিউনিস্ট ইয়ুথ লীগ স্কুল) এবং একটি এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চীনা মার্শাল আর্টের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। সফরজুড়ে তাদের চোখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আশা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা যায়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল নওরিন উর্মী বলেন, চীন সম্পর্কে তার আগের ধারণা মূলত দেশটির দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, “আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এই উন্নয়নের পেছনের শৃঙ্খলা।”

তিনি আরও বলেন, “মেট্রোতে প্রবেশের জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং কিউআর কোডভিত্তিক রাস্তার হকার ব্যবস্থার মতো আধুনিক প্রযুক্তি যেভাবে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছে, তা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে।”

তার মতে, সাংহাই ইয়ুথ ম্যানেজমেন্ট কলেজ সফরটি ছিল সবচেয়ে স্মরণীয়। সেখানে তিনি তরুণ রাজনৈতিক নেতা তৈরির একটি সুসংগঠিত ও আধুনিক ব্যবস্থা দেখেছেন। যেখানে সাংগঠনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সময়োপযোগী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়, পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও দক্ষ তরুণ নেতা তৈরি করা সম্ভব। শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তরুণদের শক্তিকে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে সাহায্য করে।”

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের এই তরুণ প্রতিনিধিরা পশ্চিমা কিংবা দেশীয় গণমাধ্যমে প্রচলিত ‘চীনের গতি’ বা ‘চীনের বিশালতা’র মতো পরিচিত ধারণায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বরং তারা চীনের উন্নয়নের মূল ভিত্তি—যেমন শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা—বোঝার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়নে এসব অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়েও তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন।

সফরের একটি অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি উৎপাদন পার্কে তারা দেখেন, একটি টেক্সটাইল কারখানা কীভাবে পাশের একটি ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলি কারখানার সঙ্গে লজিস্টিকস ও শক্তি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা ভাগাভাগি করছে।

জান্নাতুল নওরিন উর্মী বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। কারণ বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। তিনি বলেন, “যখন একজন কারখানা ব্যবস্থাপক জানালেন, কীভাবে তারা রিয়েল-টাইম ডেটা ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে উৎপাদন না কমিয়েই বিদ্যুতের অপচয় ১৮ শতাংশ কমিয়েছেন, তখনই আমার মনে হয়েছে—বাংলাদেশেরও এমন ব্যবস্থা দরকার।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এ ধরনের কম খরচের কার্যকর প্রযুক্তি চালু করা গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অনেক বাড়বে।”

জান্নাতুল নওরিন উর্মী আরও তিনটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন, যা তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। এগুলো হলো—বাড়ি বাড়ি গিয়ে উৎসাহ দিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক বর্জ্য পৃথকীকরণ কর্মসূচি, ডিজিটাল গ্রিড ব্যবস্থাপনা যেখানে প্রতিটি এলাকায় একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিটি অ্যাপের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান করেন এবং কমিউনিটির অংশগ্রহণে পুরোনো শিল্প এলাকায় ছোট ছোট সবুজ উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে আবর্জনা সংগ্রহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো মৌলিক সেবা উন্নত করার মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা চালু করা যেতে পারে।”

শিল্পায়ন ও নগরায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবধর্মী অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য দিক হলো তাদের শাসনব্যবস্থা, যা কম খরচে বাস্তবসম্মত সমাধান এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহকারী প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক আরাফাত বিল্লাহ খান। তিনি বলেন, চীন সফরে তিনি দেখেছেন কীভাবে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন আরও দ্রুত, নির্ভুল ও পরিবেশবান্ধব হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশেও শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই সপ্তাহব্যাপী সফরে আমি শুধু তরুণ বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের উন্নয়ন ও নগরায়ণ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাই দেখিনি, বরং চীনের বাস্তবসম্মত ও স্বল্প ব্যয়ের সমাধানের প্রতি তাদের আগ্রহও লক্ষ্য করেছি।

বৃত্তিমূলক শিক্ষা, ডিজিটাল শাসন, নারী ক্ষমতায়ন এবং শিল্প ক্লাস্টার গঠনের মতো বিষয়গুলোতে তাদের আগ্রহ প্রমাণ করে, দেশের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এখন বাস্তবসম্মত সমাধান ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

যদি চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে আদান-প্রদান “যুব, দক্ষতা ও সুশাসন”—এই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যায়, তবে তা চীন সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানে এমন একটি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি তৈরি করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার কাঠামোর আওতায় চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশের আধুনিকায়নের পথে চীনের বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

উৎস: টাইমস অফ বাংলাদেশ প্রকাশিত ( ২১ জুন ২০২৬)

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন