বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া উছাইওয়াং মারমার বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের গল্প

fec-image

নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের গল্প লিখতে যাচ্ছেন বান্দরবানের আলীকদমের নয়াপাড়া ইউনিয়নের মংচাপাড়া এলাকার অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম  নেওয়া মংচাপাড়ার উছাইংওয়াং মারমা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেলো পাঁচটিতেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ই’ ইউনিটে ২৬৫তম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে ৫৫তম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গ’ ইউনিটে ১০২৪তম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ঘ’ ইউনিটে ৫০১তম এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খ’ ইউনিটে দ্বিতীয় ও ‘গ’ ইউনিটে তৃতীয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে মেধার সাক্ষর রাখলেও ভর্তি ফি জোগাড় করা নিয়ে চিন্তায় আছেন পাহাড়ের এই মেধাবী শিক্ষার্থী। মা এখনো দিনমজুরি, আর বাবা অটোরিকশা চালান। অভাব অনটনের সংসার।  এরপরেও দমে যাননি উছাইইং মারমা। মনে আছে তীব্র জোর আর পাহাড় জয়ের আত্মবিশ্বাস।

পার্বত্যনিউজের প্রতিনিধিকে বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের গল্প ও নিজের জীবনের বেদনাদায়ক দিনগুলো স্মৃতিচারণ করে উছাইংওয়াং মারমা বলেন,  বুঝতে শেখার পর থেকেই দেখছি, অভাবের অক্টোপাস আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। মা-বাবার কাছে কোনো বায়না ধরলেই অভাবের গল্প শুনতে হতো। না শুনেই বা উপায় কী? মা-বাবা দুজনই দিনমজুর।

তিন বেলা পেটপুরে ভাত খাওয়াটাই ছিল বিলাসিতার মতো। সমবয়সীদের জন্য অনেক আনন্দের উপলক্ষ নিয়ে হাজির হতো সাংগ্রাই উৎসব। কিন্তু উল্টো আমার মন খারাপ হয়ে যেত। সবার জামা রঙিন, আর আমারটা মলিন! পাড়ায় আমরা ছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের সেই উক্তির মতো ‘গরিবের মধ্যে সে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক।’ এ কারণে অনেকে বাঁকা চোখে তাকাত। কারও কারও কথায় মনে হতো আমরা বুঝি ঊনমানুষ!

বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ছিল স্কুল আলীকদম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আসা-যাওয়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হতো।

বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে আলীকদম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়। হোস্টেল সুবিধা থাকায় চতুর্থ শ্রেণির পর সেখানে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। প্রথম দিকে হোস্টেলে নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিল। এই প্রথম মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকা। ঝড়ের সময় লোডশেডিং হতো।

মোমবাতিই ছিল ভরসা। গভীর রাতে লোডশেডিং হলে খুব ভয় লাগত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন খবর পেলাম, জঙ্গলে গাছ কাটতে গিয়ে বাবা হাতে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। অপারেশন করাতে হয়েছিল। আমাদের তো দিন আনি দিন খাই অবস্থা; সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না। ফলে প্রতিবেশীদের কাছে হাত পাততে হয়েছিল। ঘরে অসুস্থ বাবা তখন তিন বেলা খাবারের জোগানই মুশকিল হয়ে পড়েছিল।

তত দিনে বুঝে গিয়েছিলাম, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় নেই। জিপিএ ৪.৩৩ পেয়ে এসএসসি পাস করলাম। শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। খুব ইচ্ছা ছিল চট্টগ্রাম শহরের ভালো কলেজে পড়ব, কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় তা সম্ভব হলো না। মা-বাবার পরামর্শে কাছাকাছি কোনো কলেজে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার সামনে দুটি বিকল্প ছিল আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মাতামুহুরী সরকারি ডিগ্রি কলেজ। দ্বিতীয়টিতে যাতায়াতের খরচ বেশি। অন্যদিকে প্রথমটি প্রায় ত্রিশ মিনিট হাঁটার পথ। তবে সেখানে যেতে মাতামুহুরী নদী পার হতে হতো। বর্ষাকালে কষ্ট হতো বেশি; খরস্রোতা নদী ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হতো। তবু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজই বেছে নিলাম। ভর্তি ফি ছিল ১০ হাজার টাকা। বাবার জন্য এটি জোগাড় করা রীতিমতো অসম্ভব ছিল। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করলাম, যেন দুই কিস্তিতে ভর্তির ফি পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়।

দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। এবারও ঋণ নিয়ে কিডনির অপারেশন করাতে হলো। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে একমাত্র ছোট ভাইটিও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ল। একদিকে অভাব, অন্যদিকে এত দুর্যোগ ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিলাম। একপর্যায়ে ভাবলাম, পড়াশোনা ছেড়ে কোনো কাজে লেগে পড়ি। বিষয়টি বুঝতে পেরে কলেজের কয়েকজন শিক্ষক সাহস জোগালেন। তাঁদের উৎসাহ ও নিজের পরিশ্রমের ফল পেলাম এইচএসসিতে জিপিএ ৫।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখলাম। কিন্তু এখানেও বাধা সেই অর্থ। কোচিংয়ে ভর্তির টাকা কোথায় পাব? পরে কলেজের রাজু বড়ুয়া ও শামীম হোসেন স্যার এগিয়ে এলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। সুযোগ পেলাম পাঁচটিতে। এখনো ভর্তির দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। তবে ভর্তি ফি জোগাড় করা নিয়ে চিন্তায় আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা কীভাবে চালাব, সেটিও বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। মা এখনো দিনমজুরি করেন, আর বাবা অটোরিকশা চালানো শুরু করেছেন। এই পর্যন্ত আসতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

উছাইংওয়াং মারমা বলেন, জীবনে যদি প্রতিষ্ঠিত হতে পারি, তবে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াব।

উছাইওয়াং মারমার গল্পটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শিশুদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সুযোগ এবং সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন